বাতাসে এলোমেলো মুকুট আর অস্থির মৌমাছির ঝাঁকে ঘেরা, সেই গাছগুলো যেন তাদের পাতার হাত দিয়ে আকাশের মুখ মুছে দিচ্ছে। তাদের ঘন, হলদেটে ফুলের থোকা—যেন নতুন পানপাতায় সাজানো মুখ—মৌমাছির ভিড়ে হাসছে বলে মনে হয়। লতার খেলাচ্ছলে ঝরে পড়া পরাগের ধুলোর বৃত্তে, পরিবেশটা যেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো দীপ্তিময় হয়ে উঠেছে। শাখার সারিতে ঘন, ঝোপে চটুল তিতিরের কুহুতান আর কিন্নরদের গানে মুখরিত সেই অরণ্য, সিদ্ধপুরুষদের স্বর্গীয় পথে উঠে গেছে বলে মনে হয়। পাতার আসনে বসা, নিচে ঝুলে থাকা ময়ূরের ঝাঁকে সাজানো, আকাশ যেন ইন্দ্রধনু আর মেঘে শোভিত হয়ে উঠেছে। প্রতিটি ঢালে সাদা চামরার আলো-আঁধারি ও পূর্ণিমার চাঁদের মতো উজ্জ্বলতায়, তিতিরের ছায়ায় যেন বছরজুড়ে চাঁদের আলোয় ভরে উঠেছে। ভিন্ন ভিন্ন পাখির কলতানে, কোকিলের মধুর ডাকে আর জীবাজীব পাখির গম্ভীর সুরে, সেই স্থানে যেন প্রাণভরে গান গাওয়া হচ্ছে। কদম্ব পাখির দল বাসায় খেলছে, আকাশের গহ্বরে সিদ্ধরা বিশ্রাম নিচ্ছে—এ যেন গোটা পৃথিবীকে ঘিরে রেখেছে তারা। এখানে-সেখানে প্রবালরাঙা ডাঁটা ও মৌমাছি-চোখ ফুলের থোকায় জড়িয়ে, যেন অপ্সরাদের পরিবেষ্টিত স্বর্গ। ফুলের স্তূপের অস্থির পরাগে, যেন ইন্দ্রধনু ধারণ করেছে; গাঢ় ফুলের মেঘ বিদ্যুৎসহ বৃষ্টির মেঘের মতো। হাজার বাহু-সম শাখা আকাশ জুড়ে ছড়িয়ে, যেন বিশ্বরূপ নিজেই চাঁদ-সূর্য কুন্ডলে নৃত্য করছে। গাছের গোড়ায় মহাপর্বতের রাজা, ওপরে নক্ষত্রভরা আকাশ; মাঝখানে যেন আরেকটি পৃথিবী, ফুলের লতায় গাঁথা। সব বৃক্ষ ও অরণ্যের পিতামহের মতো, এ ছিল পৃথিবীর একমাত্র ফল, কুঁড়ি ও ফুলের ভাণ্ডার। ফুলের ধুলায় ঢাকা কুঁড়ির থোকা, যেন নদীর তীরে সূর্যকিরণ ও তারার জালে ঢাকা আকাশ। শাখাগুলো দুলছে পাখির ভিড়ে, বাসার ভিড়ে, যেন পৃথিবী প্রাণবন্ত মানুষের পল্লীতে ভরে গেছে। ফুলের পতাকা ও লতার মালায় সজ্জিত, সাদা ফুলের স্তূপে ঝকঝকে, অজস্র ফুলে ভরা। তিতির, কৃষ্ণসার, টিয়া, কোকিল, শালিকের ডাকে মুখর, ঘন ফুলের নিচে তাদের বাসার গহ্বর যেন গোপন জানালা। গহ্বরগুলো পাখিদের নেশায় ঢলে পড়া, যেন অরণ্যদেবীদের শ্রেষ্ঠ অন্দরমহল। মৌমাছির ঝাঁক, সুবাসের ঢেউ, ফুলের পরাগের স্তূপ—সব মিলিয়ে যেন পাহাড়ি ঝরনা গড়িয়ে পড়ছে। পাপড়ির ঝরায় ঘেরা, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে, সে বৃক্ষ যেন শুভ্র মেঘে ঢাকা পাহাড়। গোড়ায় হাতি তাদের হাঁটু ও পিঠ চেপে ধরেছে, গাছটি অটল—নিজ ঢালে নিজেকে ধারণ করা মহাপর্বতের মতো। রঙিন ডানার পাখির ঝাঁকে ভরা, শাখার গহ্বরে চলাফেরা করছে তারা, যেন শৃঙ্গধারী পাহাড় নানা প্রাণীতে পূর্ণ। ডালের জালের অস্থিরতায়, যেন অরণ্যবাতাস লতাদের নৃত্য করাচ্ছে। যে কামনা-রহিত, সে-ই সন্তুষ্টভাবে বিদায় নেয়; ফুলের মালা ঘুরে ঘুরে, গাছটি যেন নৃত্য করছে। শুধু লতাদের ভালোবাসায় পূর্ণ, প্রেমের স্বাদে উথলে উঠেছে, যেন মাতাল মৌমাছির গুঞ্জনে সুরেলা গান গাইছে। দূর থেকে নবফুলে ভরা, আকাশ-যাত্রী সিদ্ধদের স্বাগত জানাচ্ছে, কোকিলের ডাক আর মৌমাছির ঝাঁকে। গাছগুলো ফল ও ফুলে ভরা, কুঁড়ি-ফুলের দীপ্তিতে যেন হাসছে আনন্দে। পারিজাত বৃক্ষের মতো, শাখা ও থোকা আকাশে উঠছে, কাণ্ড উঁচু করে যেন আকাশ ছুঁতে চায়। মৌমাছির গুঞ্জন আর ঘন পাপড়ির থোকায়, ইন্দ্রের হাজার-চোখের শোভাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। উজ্জ্বল ফুলের থোকায় সাপের রত্নমুকুটের মতো, পৃথিবী থেকে উঠে শেষনাগের মতো আকাশ দেখতে চায়। ধুলায় ঢাকা রূপ, যেন দ্বিতীয় শংকর; ফল-ছায়ার মহিমায় ঋষিদের বিস্ময়ে ভরিয়ে দেয়, যেমন শংকর করেন। ঘন পাতার প্রাকৃতিক প্রাচীর, ফুলে ঢাকা লতার মণ্ডপে, কদম্ব বৃক্ষ যেন আকাশে এক নগরী, পাখির ঝাঁকে নাগরিক পূর্ণ। এভাবেই সেই জ্ঞানী, আনন্দে মন শান্ত হয়ে, ফল ও কচি পাতায় ভরা, ফুলের পাহাড়ের মতো মহিমাময় গাছটি দেখলেন। তিনি কদম্ব বৃক্ষে উঠলেন, অরণ্যের স্তম্ভ, পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে, যেমন বিষ্ণু সমুদ্র থেকে উঠে ইচ্ছা-বর বৃক্ষে আরোহণ করেন। তারপর, আকাশ ছোঁয়া শাখার ডগায়, তিনি প্রবেশ করলেন মুক্ত আকাশে, যেমন বানরের মন শাখার শেষপ্রান্তে চলে যায়। নরম, সতেজ পাতার বিছানায় বসে, চারদিক বিস্ময়ে এক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন। তিনি দেখতে পেলেন সুন্দর তীরে সাজানো নদীর সারি, পাহাড়ের চূড়া—মহাপর্বতের স্তনদ্বয়ের মতো, মেঘে ঢাকা নির্মল আকাশ, দুলতে থাকা নীলপদ্ম। নীল-সবুজ ঘাসে ঢাকা, ফুলের মতো ফ্যাকাসে অঙ্গ, সমুদ্রজলভরা কলস হাতে, তারা নগরীকে সাজিয়েছে। ফুল ফোটা পদ্ম হাতে, সুবাসিত বাতাস মুখে, গ্রামের মাঝে কাকের ডাক, জলপ্রপাতের ধ্বনি যেন নূপুরের ঝঙ্কার। আকাশ তাদের মুকুট, পৃথিবী তাদের পা, অরণ্য চুলের রেখা, বন্যপ্রান্তর প্রশস্ত নিতম্ব, চাঁদ-সূর্য কুন্ডল—এইভাবে প্রকৃতির মহাশোভা বিস্তৃত হয়ে উঠেছে।