এই মহাজগতে যা কিছু দৃশ্যমান, ঘন বা সূক্ষ্ম, সবকিছুই একমাত্র সেই মহাসত্তারই প্রকাশ—যিনি চৈতন্যের অতি সূক্ষ্ম সার, নির্মল, সর্বত্র বিরাজমান এবং ইন্দ্রিয়-গোচর নন। তিনি ছাড়া আর কিছুই নেই; তিনি সকল কালের, সকল স্থানের ঊর্ধ্বে, কলঙ্কহীন, শুদ্ধ ও চিরন্তন। তিনি এক, কিন্তু আবার বহু, কারণ তিনি সকল জীবের অন্তরাত্মা। তিনিই এই বিশ্ব ও অসংখ্য জগতকে ধারণ করেন। এই তিনভুবনের সকল তরঙ্গ সেই চৈতন্য-মহাসাগরেরই সন্তান; যেমন জলের তরলতায় চাকা ঘোরে, তেমনি সকল জীব তাঁর মধ্যে চলমান। তাঁকে মন, ইন্দ্রিয় কিংবা অন্য কোনো উপায়ে ধরা যায় না; তিনি অতিসূক্ষ্ম, শূন্যের মতো, আবার আকাশের মতো রূপ ধারণ করেন। তবু আত্মজ্ঞানে তিনি উপলব্ধি হয়, তাই তিনি একদিকে শূন্য, আবার আকাশ-স্বভাবও তাঁর। দ্বৈতবোধের উদয় হলে আমি তোমার হয়ে যাই, তুমি আমার হয়ে যাও; আমি তোমার মধ্যে জন্মাই, আমার চৈতন্য বিস্তৃত রূপে তোমার মধ্যেই প্রকাশিত হয়। কিন্তু যখন 'আমি' ও 'তুমি'-র মূলে থাকা চৈতন্যে সবকিছু লীন হয়, তখন আর 'আমি', 'তুমি', বা অন্য কিছু থাকে না—কিছুই স্বতন্ত্রভাবে টিকে থাকে না। এই সূক্ষ্ম চৈতন্য, চললেও চলে না; অসংখ্য যোজন অতিক্রম করলেও সে নড়ে না, কারণ দূরত্বের ধারণা কেবল চৈতন্যের মধ্যেই বিদ্যমান। তিনি গেছেন বলে মনে হলেও, আসেন বলে মনে হলেও, আসলে তিনি কোথাও যান না, আসেনও না; নিজের চৈতন্য-আকাশেই তিনি সর্বদা অবিচলিত, স্থান ও কালের ঊর্ধ্বে। যা অর্জনের, তা যদি দেহেই বিরাজ করে, তবে সে কোথায় যাবে? যেমন শিশুটি মায়ের বক্ষে থাকলে সে মায়ের বাইরে দেখা যায় না। আর সেই বিশাল, অশেষ গন্তব্য যদি সর্বত্র বিরাজ করে, সমস্ত কর্মের মধ্যেও থাকে, তাহলে তার যাওয়া-আসার প্রশ্নই ওঠে না। যেমন বন্ধ মুখের কলস কোথাও সরালেও তার ভেতরের আকাশ নড়ে না, তেমনি আত্মার ক্ষেত্রেও তাই। যখন অভিজ্ঞতাজাত আত্মায় চৈতন্য স্থিত হয়, তখন চৈতন্য ও জড়তা—উভয়ই থাকে; এটাই দ্বৈততা। আবার যখন চৈতন্যের রূপ চেতন ও জড়ের অস্তিত্বে একীভূত হয়, তখন কেবল চৈতন্যই থাকে, যেমন পাথরে ভূতের অধিকার। সেই চরম আকাশ—যার শুরু নেই, শেষ নেই, পরম চৈতন্যের অণুতে গঠিত—তাতে এই বিস্ময়কর তিনভুবন সৃষ্টি হয়, আবার লয়ও পায়। সেই চৈতন্যেই আগুনের অস্তিত্ব থাকে, তার জ্বলন্ত রূপ কখনো নষ্ট হয় না; সে সর্বত্র থাকলেও দগ্ধ করে না, তবু জগতের দ্রব্যাদি সিদ্ধ করে। সে নিজে দগ্ধ না হয়েও, দীপ্তিমান রূপে, আকাশের চেয়েও নির্মল হয়ে যখন প্রকাশিত হয়, তখন সেখান থেকেই আগুন উৎপন্ন হয়। চৈতন্য থেকেই উৎপত্তি সেই অনাদি, সর্বোচ্চ দীপ্তির; তার মূল স্বভাব কখনো বিনষ্ট হয় না, যুগ-যুগান্তরেও নয়। চোখ দিয়ে ধরা যায় না, সে কেবল অভিজ্ঞতার স্বরূপ, হৃদয়গৃহের অন্তস্থ প্রদীপ; সকল সত্তার দাতা, অসীম, সেই আলোকই পরম। তার থেকেই এমন এক দীপ্তি উদ্ভাসিত হয়, যা মন ও ছয় ইন্দ্রিয়ের ঊর্ধ্বে; এই দীপ্তিতেই দৃশ্য ও অদৃশ্য সবকিছুর বিস্ময় প্রকাশিত হয়। লতা, গুল্ম, অঙ্কুর ও ইন্দ্রিয়বিহীন সত্তাতেও সে সূক্ষ্মভাবে বিরাজ করে; তার রূপ উৎকর্ষের চেতনা, তার দীপ্তি অভিজ্ঞতার স্বরূপ। কালের, স্থানের, কর্মের, সত্তার ও প্রকৃতির আত্মজ্ঞানে সে নিজেই কর্তা, ভোক্তা, পিতা, আবার সে-ই আকাশ-স্বভাব, অন্য কিছু নয়। তার সূক্ষ্মতা কখনো ভঙ্গ হয় না; সে জগতের ক্ষুদ্রতম রত্নবাক্স, যার সার মাপ, পরিমাপক ও পরিমেয়—এই জগৎ তার চৈতন্যেই অবস্থান করে। সে-ই সমস্ত জগতে স্পষ্টভাবে দীপ্তি ছড়ায়; যখন জগৎ তার মধ্যে ধারণ হয়, তখন সে-ই পরম রত্ন। তাকে বোঝা কঠিন বলে তাকে অন্ধকার বলা হয়; আবার সে চৈতন্য বলে সে আলোকে দর্শন করে; সে চেতনারূপে আছে, কিন্তু ইন্দ্রিয়াতীত বলে তাকে অবাস্তব মনে করা হয়। যে পর্বত ইন্দ্রিয়ের জন্য দূর, তা চৈতন্যের জন্য দূর নয়; কারণ সে সকলের দ্বারা অনুভূত, তাই সে-ই পর্বত, সে-ই অণু। যা জগত বলে মনে হয়, তা কেবল খাঁটি চৈতন্য; তাই পর্বতাদি বাস্তব নয়, মেরুর মহিমাও কেবল অণুতেই নিহিত। এক মুহূর্তের প্রকাশকে 'মুহূর্ত' বলা হয়; যুগের প্রকাশও তেমনি 'যুগ' নামে পরিচিত। একটি যুগের সৃষ্টির খেলা এক মুহূর্তেই প্রকাশ পায়, যেমন বিশাল এক নগরী মনেই বিদ্যমান। এক মুহূর্তের গর্ভে যুগের সূচনা ঘটে, যেমন নির্মল আয়নার মধ্যে এক মহানগরীর নির্মাণ। একটি অণুর মধ্যেই অসংখ্য পর্বত, সাগর, নগর, যুগ ও মুহূর্ত আছে; যেখানে সবকিছু অণুর মধ্যেই, সেখানে দ্বৈততা বা একত্বতা কেমন করে থাকবে? 'আমি আগে এটা করেছি'—এই ভাবনা মনে আসে; এক মুহূর্তেই সত্য ও মিথ্যা প্রকাশিত হয়, স্বপ্নের বিভ্রান্তির মতো। দুঃখে সময় দীর্ঘ মনে হয়, আনন্দে তা হালকা লাগে; যেমন হরিশচন্দ্রের জন্য একটি রাত বারো বছর বলে বিবেচিত হয়েছিল। অন্তরে যে বিশ্বাসই উদিত হয়—সত্য বা মিথ্যা—তা উদ্ভাসিত হয়, যেমন সোনার মধ্যে বালা বা সমুদ্রে তরঙ্গ। কোনো চোখের পলক নেই, সময়ের মাপ নেই, কাছে-দূরে কিছু নেই; চৈতন্যের প্রতিবিম্বেই এসব নানা কিছু স্থিত বলে মনে হয়। যেমন আলো-অন্ধকার, কাছে-দূরে, মুহূর্ত-যুগ, বা চৈতন্যের দুই আবরনের মধ্যে প্রকৃতপক্ষে কোনো বিভেদ নেই, তেমনি এখানে সামান্যতমও বিভাজন নেই। যা প্রত্যক্ষ, তা ইন্দ্রিয়ের কারণে; যা অপ্রত্যক্ষ, তা তার বাইরের। তবু আসলে কেবল দ্রষ্টাই বিদ্যমান, কারণ দেখা হচ্ছে বলেই দৃশ্যের উদ্ভব। যতক্ষণ বালার চেতনা থাকে, সোনার চেতনা আসে না; যতক্ষণ দৃশ্যের উপলব্ধি থাকে, সেই শিল্পও থাকে না। যখন বালার রূপ চেতনা থেকে লুপ্ত হয়, তখন কেবল সোনা বিস্তৃত থাকে; তেমনি সবকিছু মুছে গেলে কেবল নির্মল, জাগ্রত ব্রহ্মই অবশিষ্ট থাকে। কারণ সে-ই সব, তাই তাকে সত্য বলা হয়; ধরা কঠিন বলে তাকে অসত্য বলে; চৈতন্য বলে সে সচেতন; আর যেখানে জ্ঞান অসম্ভব, সেখানে তাকে জড় বলা হয়। এই আত্মাতেই, যার স্বভাব খাঁটি চৈতন্যের বিস্ময়, যার মধ্যে সবকিছু প্রতিবিম্বিত হয়, সেখানে বাতাস বা বৃক্ষের মতো জগতের কোনো পরিমাপ কীভাবে হবে, যখন সবকিছুই চৈতন্য ও তার বিষয়ের খেলায় মিশে থাকে?