তৃষ্ণা যেন প্রদীপের শিখা—তার অগ্রভাগ কালো কালিতে ঢাকা, দেহ দীর্ঘ তেলের মতো, দীপ্তিমান, আর তার স্পর্শ অগ্নির মতো দহন করে। এই তৃষ্ণা এমনই শক্তিশালী যে, মেরু পর্বতের মতো অচল ও স্থির জ্ঞানী, বীর, কিংবা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মানুষকেও এক মুহূর্তে খড়কুটোর মতো নিঃশেষ করে দিতে পারে। তৃষ্ণা আবার বিশাল, ঘন, ভয়ংকর বিন্ধ্যাচল অরণ্যের মতো—মেঘ ও ধূলিকণায় আচ্ছন্ন, ঘন অন্ধকার আর কুয়াশায় পরিপূর্ণ। অথচ, এই তৃষ্ণা সকলের সামনে থেকেও, সকল জগতে অনুভূত হয়েও, চেনা বড় কঠিন; সে যেন দুধের সমুদ্রের তরঙ্গে নেচে ওঠা অস্থির মালার মতো, বাহ্যিকভাবে মধুর, অথচ ভেতরে প্রবল। এই দেহ—ভিতরে সিক্ত, জটিল গঠনে গড়া, ক্ষণস্থায়ী, আর দুঃখে পূর্ণ—জগতে চঞ্চলভাবে ঘুরে বেড়ায়, আর কেবল যন্ত্রণারই কারণ হয়। মূঢ় হলেও, সে যেন জ্ঞানী সেজে থাকে, মিথ্যা অহংকারে ভরে ওঠে; বিচার করলে কখনো সে মহৎ, কখনো নীচ বলে মনে হয়, সে না জড়, না চেতন। জড়তা আর চেতনার মাঝখানে ঝুলে থাকে, অনিশ্চিত আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলে, না সম্পূর্ণ জ্ঞানী, না মূঢ়—শুধু মোহ সৃষ্টি করে চলে। এই দেহ সামান্য আনন্দ ও সামান্য দুঃখ অনুভব করে; এর মতো করুণ, অধম ও গুণহীন আর কিছু নেই। বারবার জন্ম-মৃত্যুর পথিক, দাঁত ও চুলে সজ্জিত, প্রতিক্ষণে প্রস্ফুটিত ফুলের হাসিতে শোভিত। এর বাহু ডালের মতো, হাড়ের স্তম্ভে ভর করে দাঁড়িয়ে, মাথা যেন গলায় বসানো বড় ফল, চোখ যেন মৌমাছির ঝাঁক। হাত-পা কোমল কুঁড়ির মতো, শিরা রক্ত ও রসের ধারা, গোড়ালি আছে, আর কর্মপাখিদের আশ্রয়স্থল। এই দেহরূপ বৃক্ষ ও তার ছায়া, অসংখ্য জীবাত্মার আশ্রয়—কিন্তু কার আপন, কার পর? এখানে কে সত্যিই আত্মীয়, কে অপর? এই দেহ শুধু বোঝা বহনের জন্য বারবার গ্রহণ করা হয়—তবু কে কখনো নিজেকে দেহ বলে মনে করে? যেমন কেউ নিজেকে নৌকা বা লতা বলে না। এই দেহ নামক শূন্য অরণ্যে, যেখানে অসংখ্য গর্ত, অসংখ্য চুলের বৃক্ষ, সেখানে কে-ই বা ভরসা খুঁজে পাবে? ত্বক, মাংসপেশী, হাড়ে গাঁথা এই দেহের ভিতরে আমি বিড়ালের মতো বাস করি না, যেখানে চিরন্তন শব্দ ওঠে। সংসারের জঙ্গলে উন্মত্ত হয়ে ওঠা মনের বানর, দুঃখের কৃমিতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে, চিন্তার ঝাঁক ধারণ করে। এই দেহ বাসস্থান—তৃষ্ণার সাপের, ক্রোধের কাকের; হাসি তার ফুল, বৃক্ষটি শোভাময়, পাপ-পুণ্যের মহাফল ধরে। তার কাণ্ড দৃঢ়, বাহুর জাল সুন্দর, হাতে কুঞ্জ, অঙ্গ সব কোমল কুঁড়ি, বাতাসে দুলছে। ইন্দ্রিয়পাখিরা তাকে ধারণ করে, হাঁটু সুন্দর, ত্বক মসৃণ ও উঁচু, নিজের হ্রদের ছায়ায় শোভিত, কামনাপথিকরা এখানে বিচরণ করে। মাথায় ঘাসের মতো চুলের ঝাঁক, ভিতরে অহংকারের বৃদ্ধ শকুনের বাসা। এই দেহবৃক্ষ দুর্বল, উদীয়মান প্রবৃত্তির জালে গেঁথে, বলহীন, আমার সুখের কারণ নয়। এই দেহই অহংকার নামক গৃহস্থের বিশাল গৃহ—সে ভেঙে পড়ুক বা অটল থাকুক, তার স্থিতি আমার কী আসে যায়, হে মুনি? এই দেহের গৃহ, যেখানে ইন্দ্রিয়গুলো গরুর সারির মতো, কামনার কুঠুরি চঞ্চল, সমস্ত অঙ্গ আসক্তিতে কলুষিত—এটা আমার কাছে আকর্ষণীয় নয়। হাড় ও কাঠের সন্ধিতে ঠাসা, নাড়ির বন্ধনে বাঁধা এই দেহের গৃহ আমার কাছে প্রিয় নয়। মাংসপেশী ও স্নায়ুতে টান, রক্তের লাল তরলে মলিন, বার্ধক্যের ছাইয়ে সাদা—এই দেহের গৃহ আমার কাছে প্রিয় নয়। অসংখ্য আচরণ ও ভঙ্গিতে পূর্ণ, মিথ্যা মোহে দৃঢ়, মায়ার স্তম্ভে ভর—এও আমার কাছে আকর্ষণীয় নয়। ক্ষুধা ও তৃষ্ণার যন্ত্রণায় কান্নায় মুখর, অন্তরে কামনার দাসী দগ্ধ, বাহ্যিকভাবে সুখের শয্যার মতো মনে হলেও, এই দেহের গৃহ আমার কাছে আকর্ষণীয় নয়। ইন্দ্রিয়বিষয়ে ভরা পাত্র ও সামগ্রীতে ঠাসা, অজ্ঞানতার বিষে ডুবে—এও আমার কাছে প্রিয় নয়। গোড়ালিতে ভর, হাঁটু স্তম্ভ, মাথা চূড়া, লম্বা কাঠের মতো বলিষ্ঠ বাহু—এ দেহ আমার কাছে প্রিয় নয়। হে ব্রাহ্মণ, চোখ জানালার মতো, বুদ্ধি-প্রাঙ্গণে চিন্তার খেলা, দুশ্চিন্তা তার কন্যা—এ গৃহও আমার কাছে প্রিয় নয়। চুল ছাদের মতো, কানে চাঁদ-সদৃশ মিনার, আঙুল কাঠের বিমের মতো—এ দেহ আমার কাছে প্রিয় নয়। সমস্ত দেয়ালে ঘন চুলের কুঁড়ি, পিছনে ফাঁকা আসন—এ গৃহও আমার কাছে প্রিয় নয়। নখ, হাড়, নাভি ভিত্তি, নাড়ি তার কাঠ, বাতাস নানান শব্দ তোলে—এ দেহ আমার কাছে প্রিয় নয়। চোখ জানালার মতো চির খোলা, নিশ্বাসের বাতাস সারাক্ষণ আসা-যাওয়া করে—এ গৃহ আমার কাছে প্রিয় নয়। মুখ ভয়ংকর দরজা, জিহ্বা বানরের মতো, দাঁত ও হাড়ের টুকরো দৃশ্যমান—এ দেহ আমার কাছে প্রিয় নয়। ত্বক মসৃণ প্লাস্টার, দেহ চঞ্চল, মন কামনার কোপে চির খোঁড়া—এ গৃহ আমার কাছে প্রিয় নয়। কখনো হাস্যোজ্জ্বল দীপ্তিতে দেহ আলোকিত হয়, কখনো আনন্দের ঝলকে সুন্দর লাগে, তবুও এই মাংসের গৃহ আমাকে আকর্ষণ করে না। আমার দেহ সকল রোগের আবাস, কুঞ্চিত রেখা ও পাকা চুলের নগরী, দুঃখে ভরা অরণ্য—এটা আমার কাছে প্রিয় নয়। এটি ফাঁপা, শূন্য গহ্বর, ইন্দ্রিয়ের দ্বারা বিঘ্নিত, অন্তরে অন্ধকারের ঝোপ—এই দেহবন আমার কাছে আকর্ষণীয় নয়। হে পূজনীয় ঋষিগণ, আমি এই দেহের বাসগৃহ ধারণ করতে অপারগ—যেমন দুর্বল ব্যক্তি কাদা-ফাঁসানো হাতিকে তুলতে পারে না।