এক গাঁয়ের এক গৃহবধূর কথা। তাঁর জীবনের একমাত্র চিন্তা ছিল গরুর গোবর আর জ্বালানির কাঠ সংগ্রহ করা। পরনে তাঁর ছিল মলিন, পুরনো কম্বল; ভারী বোঝা বইতে গিয়ে তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গে চাপের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। প্রতিনিয়ত তিনি নিজের কানে, চুলে, হাতে লেগে থাকা পোকা টেনে বার করতেন, আর তাড়াহুড়ো করে বনে-জঙ্গলে গিয়ে বাড়ির জন্য শাকপাতা সংগ্রহ করতেন—ঘরের কাজে তিনি সদা ব্যস্ত। তিনি গরুগুলোকে নীল নদীর ঢেউয়ে ভেজা ঘাস খাওয়াতেন, আর প্রতি মুহূর্তে চন্দনলেপন দিয়ে ঘরের দরজায় চিহ্ন আঁকতেন। ঘরের চাকর-চাকরানি ও প্রাণীদের জন্যে তিনি সদা কথা বলতেন, আর নিয়ম-শৃঙ্খলায় অটল ছিলেন—যেন সমুদ্রকে আটকে রাখা তীর। তাঁর কানে ঝুলত পুরনো পাতার রঙের দুল, আর তাঁর দেহে ছিল দুঃখ-ক্লান্তি আর ভয়ের চিহ্ন, যেন বহু কষ্টে জীর্ণ এক দাসী। এভাবে কথোপকথন করতে করতে তিনি পাহাড়ি গ্রামের গহ্বরে ঘুরে বেড়াতেন। তখন হঠাৎ স্বয়ং সরস্বতী তাঁর সামনে আবির্ভূত হলেন। সেই গৃহবধূ সরস্বতীকে দেখিয়ে বললেন, ‘‘এই ফুলবাগান, যেখানে লাল লাল বৃক্ষের গুচ্ছ, এই আমার; এই সুসজ্জিত, বাগানের মত গৃহমণ্ডপও আমার। পদ্মপুকুরের তীর, গাছপালা আর সবুজ ঘাসে জড়ানো, সেটিও আমার; এখানে ‘কর্ণিকা’ নামের তরুণী, যার পাতাগুলো খাওয়া হয়েছে, সে-ও আমার।’’ ‘‘এই দরিদ্র, শীর্ণ, জলবিহীন প্রাণীটি আমার; আজ আট দিন ধরে সে অশ্রুসজল চোখে কাঁদছে। এখানেই, দেবী, আমি কথা বলেছি, থেকেছি, ঘুমিয়েছি, সময় কাটিয়েছি, দিয়েছি এবং পেয়েছি। আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র শর্মা, সে ঘরে কাঁদছে; আমার গাভীটি মাঠে চরছে, বনে সে দুধ দিচ্ছে।’’ ‘‘ঘরে, দাহের জন্য প্রস্তুত, শুষ্ক ও ক্ষারমাখা ধুলোয় ঢাকা আমার এই দেহ—যাকে ‘পঞ্চভূত’ বলে—গুরুতর ও ঘন। এই রান্নাঘর, যেখানে তীব্র ঝিঙে-লতা জড়িয়ে আছে, আমার; রান্নাঘরের এই জায়গাটা যেন আমার আরেকটি দেহ। আমার আত্মীয়রা, যারা কাঁদতে কাঁদতে চোখ লাল করেছে, তারা সংসারের বন্ধন; আর যারা রুদ্রাক্ষের মালা পরে, তারা আগুনের জন্য কাঠ জোগাড় করে।’’ ‘‘নিরন্তর পাথর-শামুকের আঘাতে বিধ্বস্ত, উঁচু ঢেউয়ের ছোঁয়ায় তটের লতা-পাতায় জল লাগে। তীরে ছড়িয়ে আছে ফেনা, দোল খাওয়া ঘাসের ঝোপ, আর পাথর-ফল-শামুকের সংঘর্ষে ওঠা ফেনা। মধ্যাহ্নসূর্যের কিরণ যেন শিশিরের মতো ঝকমক করে, আর তীরজুড়ে গাছেরা ফুলের গুচ্ছ দান করতে উদগ্রীব।’’ ‘‘রক্তিম কিম্শুক বৃক্ষের দীপ্তিতে প্রবাহিত, ফুলের স্তূপে ভরা বাগান যেন আনন্দে ফেটে পড়েছে। গ্রামের ছেলেরা ফল তুলতে ব্যস্ত, গ্রাম্য নদীর স্রোতে তারা ঘূর্ণির টানে ভেসে চলে যায়। চারপাশে দ্রুত ঘুরতে থাকা, জলে ধোয়া তীর, আর ঘন পাতার ছায়ায় শীতল পরিবেশ। এখানে এক গৃহমণ্ডপ দেখা যায়, ফুলে-ফলে জড়ানো, জানালার উপরে শাখা ঝুলে ছায়া দিয়েছে।’’ ‘‘এখানে আমার স্বামী বাস করেন, যাঁর রূপ জীবন্ত আকাশের কণার মতো, তিনি চার সমুদ্রবেষ্টিত পৃথিবীর অধিপতি। পূর্বে, এই স্থানটি তিনি প্রবল আকাঙ্ক্ষায় চেয়েছিলেন—‘আমি যেন দ্রুত রাজা হই।’ দেবী, মাত্র আট দিনে তিনি সেই সমৃদ্ধ রাজ্য লাভ করেন, যা সাধারণত দীর্ঘ সাধনায় মেলে।’’ ‘‘এখানে, আমার গৃহে, আমার স্বামী রাজার প্রাণতত্ত্ব ছিল, যা দেখা যায় না—আকাশের বাতাস বা সুবাসের মতো। এখানেই, আঙুলের ডগার মতো ক্ষুদ্র স্থানে, সেই রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল, যেন আকাশেই; অথচ স্বামীর রাজ্য দশ কোটি যোজন জুড়ে বিস্তৃত। আমরা দু’জনই আকাশ, স্বামীর রাজ্যও আকাশ, দেবী; তবু সেখানে সহস্র পর্বতে পূর্ণ রাজ্য দেখা যায়—এ কী আশ্চর্য মায়া!’’ ‘‘দেবী, আমি আবার স্বামীর কাছে ফিরতে চাই; চলুন, আমরা সেখানে যাই—যারা দৃঢ়সংকল্প, তাদের কাছে দূরত্ব কিছু নয়।’’ এ কথা বলে ও দেবীকে প্রণাম করে, তিনি দ্রুত গৃহমণ্ডপে প্রবেশ করলেন; দেবীকে সঙ্গে নিয়ে, তরবারির মতো কৃষ্ণ আকাশে পাখির মতো উড়ে চললেন। আকাশ যেন কাজলের স্তূপে বিভক্ত, এক সমুদ্রের কোমল দীপ্তিতে সুন্দর, নারায়ণের দেহের মতো, মধুপৃষ্ঠের নির্মল কান্তিতে দীপ্ত। তাঁরা মেঘপথ পেরিয়ে, বায়ুমণ্ডল, সূর্যপথ, চন্দ্রপথও অতিক্রম করলেন। ধ্রুবতারার উত্তরপথ, সাধ্যলোক, সিদ্ধলোক, পৃথিবী ছাড়িয়ে স্বর্গলোকে পৌঁছলেন। ব্রহ্মলোকের অন্তস্থলে, তুষিতলোকেও প্রবেশ করলেন; গোলোকে, শিবলোকে, পিতৃলোকেও অতিক্রম করলেন। দেহহীন দূরবর্তী দেবতাদেরও ছাড়িয়ে, আরও দূর অতিক্রম করে, কোথাও যেন গমন কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হল। তখন তিনি পেছনে ফিরে দেখলেন—যতদূর এসেছেন, নীচে কিছুই আর দেখা যাচ্ছে না—না চাঁদ, না সূর্য, না তারা, কিছুই নয়। তিনি দেখলেন—গভীর, স্থির অন্ধকার, যেন আকাশের গহ্বর, এক সমুদ্রের পেটের মতো, পর্বতের অভ্যন্তরের মতো ঘন। তখন তিনি দেবীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘হে দেবী, বলুন তো, সূর্য-চন্দ্র-তারা—সব আলো কোথায় গেল? এই অন্ধকার, যা নড়ে না, পর্বতের পেটের মতো, হাতে ধরা যায়—এটা কেমন?’’ দেবী বললেন, ‘‘তুমি আকাশের এই পথের শেষপ্রান্তে এসেছ; সূর্য-চন্দ্র-তারা—সব আলোরই এখানে আর দেখা নেই। যেমন গভীর অন্ধকার কূপের তলা থেকে জোনাকি দেখা যায় না, তেমনি এখানে নিচের সূর্যও আর দেখা যায় না।’’ ‘‘আহা, আমরা এমন এক দূর স্থান এসেছি, যে নীচের সূর্যও কেবল বিন্দুর মতো, একেবারেই দেখা যায় না।