সেই বিস্ময়কর স্থানে, বায়ুর কাঁধে নদীর জালের মতো বিস্তৃত ছিল অসংখ্য জলধারা; দেবশিশুরা কৌতূহলভরে বিচিত্র সব আশ্চর্য দেখার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছিল। কখনো কখনো বজ্র, চক্র, বর্শা, খড়গ ও নানা অস্ত্রধারীদের মনে সংশয় ঘুরে বেড়াত; আবার কখনো গৃহগুলোতে তুম্বুরু ও নারদের সংগীতের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো। কোথাও কোথাও মেঘের পথে জমাটবাঁধা বিশাল মেঘের সমাবেশ, যেন যুগান্তের শেষে সৃষ্ট জলের মতো, বিচিত্র আকারে স্থির, যেন নিঃশব্দ মূক। কোনো কোনো স্থানে পাহাড়ের পাখার মতো কৃষ্ণবর্ণ সুন্দর বর্ষামেঘ, আবার কোথাও মেঘে স্বর্ণরশ্মির মতো সূর্যালোক ঝরে পড়ছে। কোথাও মেঘ চাঁদের শীতল জ্যোত্স্নায় শোভিত, কোমল আলো বর্ষণ করছে; আবার কোথাও মেঘের সমুদ্র একেবারে স্থির, বাতাসহীন, যেন শূন্যতার জাল। কোথাও বাতাস ছাদে ছাদে ঘাসের ব্লেডে বয়ে গিয়ে সেগুলোকে সজীব করে তুলছে; আবার কোথাও মেঘের চকচকে পৃষ্ঠে পাতার ঝাঁকড়া ছায়া খেলে যাচ্ছে। কোথাও ধূলিময় বাতাসে পরিবেশ যেন মেরু পর্বতের উপত্যকা; আবার কোথাও আকাশ ভরে আছে দেবালয় ও অপ্সরাদের সৌন্দর্যে। কোথাও আকাশ ফাঁকা, মাতৃগণের উন্মত্ত নৃত্যে ঘেরা; আবার কোথাও মহান যোগীদের গর্জন ও উত্তেজনায় মুখর। কোথাও মুনি-ঋষিরা ধ্যানস্থ, শান্ত ও প্রশান্ত, কল্যাণবোধী হৃদয়ে আনন্দদায়ক। কোথাও দেবী, কিন্নর, গন্ধর্ব ও দেবতাদের গান; আবার কোথাও দেবতারা দৃঢ় নগরীতে বিচরণ করছে। কোথাও প্রবেশপথ বন্ধ নগরী, কোথাও বৃহৎ নগরী আবদ্ধ; কোথাও মায়ার নগরী, আবার কোথাও এখনও গড়ে ওঠেনি এমন জনপদ। কোথাও চাঁদ ঘুরে বেড়াচ্ছে হ্রদে, কোথাও হ্রদের জল স্থির; কোথাও সিদ্ধপুরুষদের সমাবেশ, আবার কোথাও চাঁদ সদ্য উদিত। কোথাও সূর্যোদয়ের দীপ্তি, কোথাও রাতের অন্ধকার; কোথাও গোধূলির আভা, আবার কোথাও কুয়াশায় ধূসর। কোথাও স্বর্গীয় প্রাসাদের শুভ্রতায় আকাশ ভরে আছে, কোথাও মেঘে বর্ষণ হচ্ছে; কোথাও আকাশ জমিনের মতো কঠিন, যেন জগতের আশ্রয়। কোথাও দেব-অসুরেরা দ্রুত উপরে-নিচে চলাফেরা করছে; আবার কোথাও তারা চারদিকে—পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণে—ব্যস্ত। কোথাও শত শত যোজন পথও ধোঁয়ায় ঢাকা, অতিক্রম করা কঠিন; আবার কোথাও আকাশ ঘন, অবিনশ্বর অন্ধকারে পূর্ণ। কোথাও অব্যয়, বিশাল দীপ্তি, যেন সূর্য বা অগ্নি; কোথাও হিমালয়ের গহীনে, চাঁদ-সূর্যাদি গ্রহের আবাসে, প্রবল শীত। কোথাও ইচ্ছাপূরণকারী বৃক্ষের অরণ্য উঁচু নগরীর উপর নৃত্যরত; আবার কোথাও অসুরদের পরাজয়ে স্বর্গীয় নগরী আকাশ থেকে পড়ে যাচ্ছে। কোথাও দেবযান অবতরণে আগুনের রেখা আঁকা; কোথাও শত শত ধূমকেতুর সংঘর্ষে আকাশ কেঁপে উঠছে। কোথাও শুভগ্রহের সমাবেশে আকাশ অধিকারী; কোথাও আবার অন্ধকারে ঢাকা, আর কোথাও দিবালোকের দীপ্তি। কোথাও গর্জনরত মেঘের প্রচণ্ড শব্দ, কোথাও নিঃশব্দ মেঘ ভেসে যাচ্ছে; কোথাও বাতাস সাদা মেঘের টুকরো ফুলের মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে। কোথাও একেবারে ফাঁকা, কলঙ্কহীন, তাৎক্ষণিক শান্ত; কোমল, শান্ত, পরিষ্কার, যেন জ্ঞানীর হৃদয়। কোথাও তোতা ও ব্যাঙের কণ্ঠস্বরের কোলাহল; আবার শূন্যে তারারাজিতে আকাশবাসীদের ক্ষেত্র শোভিত। কোথাও সোনালী মুকুটধারী ময়ূর ও নানা পাখিতে পূর্ণ, যারা বিদ্যাধর দেবীদের বাহন ও বিশ্রামস্থল। কোথাও মেঘের মধ্যে ময়ূরের নৃত্য, কোথাও অগ্নি-তোতার কারণে ভূমি গাঢ়, যেন ঘাসের মাঠ। কোথাও যমরাজের মহিমায় মেঘ তার বাহন, কোথাও কৃষ্ণমেঘ ঘোড়া খাচ্ছে, ঘাস ভেবে। কোথাও দেবনগরী, কোথাও অসুরদের নগরী; কিছু নগরী একে অপরের জন্য অগম্য, কিছু সংকীর্ণ গলিতে পূর্ণ। কোথাও ভৈরবের ভয়ংকর নৃত্যে আকাশ, যেন পর্বতসম পরিবার; কোথাও গন্ধর্বনগরীতে অপ্সরাদের সমাবেশে মুখর। কোথাও কাঁপতে থাকা পর্বত থেকে পড়ে যাওয়া হাজারো বৃক্ষে সমুদ্র শুকিয়ে গেছে; আবার কোথাও মায়ার জলকমলে শীতল জলধারায় সমুদ্র শান্ত। কোথাও পর্বতের অধিপতি ডানায় নৃত্য করছে, বিনায়কের সাথে; আবার কোথাও প্রবল বায়ুর আঘাতে পর্বত উড়ে যাচ্ছে। কোথাও বায়ু শীতল ও মনোরম, চাঁদের কিরণে ভেজা; কোথাও জল, বৃক্ষ ও পর্বত দগ্ধ আগুনে পুড়ে যাচ্ছে। কোথাও একেবারে নিস্তব্ধ, বাতাসের লেশমাত্র নেই; কোথাও সূর্যোদয় পর্বতের সমান শিখার মতো দীপ্ত। কোথাও ঘন বর্ষামেঘের গর্জনে বর্ষা মত্ত; আবার কোথাও দেব-অসুরদের যুদ্ধে পথ অতিক্রম অযোগ্য। কোথাও স্বর্গ-হ্রদের রাজহাঁস সুমধুর ডাক শুনে ডাকে সাড়া দিচ্ছে; কোথাও মন্দাকিনীর তীরে বায়ু পদ্ম লুটে নিচ্ছে। গঙ্গা প্রভৃতি নদী ও দেহধারী জীবের কারণে, কোথাও গহ্বরের মধ্যে মাছ, শঙ্কু ও কুমিরে পূর্ণ, তারা লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। কোথাও পাতালসম গহ্বর, পৃথিবীর ছায়া, বা কাকের অন্ধকার গর্তের মতো; আবার কোথাও চাঁদ-সূর্য গ্রাসিত হচ্ছে। কোথাও স্বর্গীয় পুষ্পবন, স্বর্গীয় বাতাসে দুলছে; সেখানে অপ্সরারা ঝরে পড়া ফুল বা তুষারবৃষ্টিতে চমকে উঠছে। অঞ্জীর গাছের গহ্বর পেরিয়ে, যেখানে মশা ও পতঙ্গ ভরে আছে এবং তিন জগতের জীবসমূহে পূর্ণ, সেই মহান নারী সব পেরিয়ে, আকাশ ছেড়ে, আবার পৃথিবীতে অবতরণের প্রস্তুতি নিলেন। এরপর, দুই নারী যখন জ্ঞান ও মন সংহত করে আকাশ থেকে এক পর্বতগ্রামের দিকে অবতরণ করছিলেন, তখন তারা নিচের পৃথিবী দেখলেন। তারা দেখলেন, এক পুরুষের হৃদয়-পদ্ম, যা ব্রহ্মাণ্ডের মতো বিশাল, আটটি দিকমুখী পাপড়িতে ভরা, পর্বতের মতো গর্ভরজ্জুতে ভরা, এবং স্বীয় আনন্দে পূর্ণ হয়ে অপরূপ শোভা পাচ্ছে।