এই জ্ঞানগর্ভ কাহিনীতে বলা হচ্ছে—স্বপ্নে যেমন পাহাড় দেখা যায়, কিন্তু সেখানে কোনো বাস্তব মাপ বা পরিমাপ থাকে না, ঠিক তেমনি এই বিশ্বে আমরা যেসব দৃশ্যমান রূপ দেখি, সেগুলো আসলে শুধু শূন্যস্থান, কল্পনার দ্বারা পূর্ণ, কোনো বাস্তব পদার্থ নয়। ‘বিশ্ব’, ‘ব্রহ্ম’ এবং ‘শূন্য’—এই শব্দগুলোর অর্থে প্রকৃতপক্ষে কোনো পার্থক্য নেই, শুধু অজ্ঞরা তাদের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্ত হয়। এই যে দীপ্তি, চেতনা ও অচেতনার মধ্যে যে শুধু জ্যোতি, তা শূন্যের সঙ্গে এত সূক্ষ্মভাবে যুক্ত, যেমন কল্পনার মেঘের সঙ্গে বাস্তব মেঘের সম্পর্ক। যেমন স্বপ্নের নগর জাগতিক নগরের তুলনায় স্পষ্ট মনে হয়, তেমনি এই বিশ্বও কল্পিত জগতের তুলনায় স্পষ্ট। সুতরাং এই জগৎ, যা কখনো স্থূল, কখনো সচেতন, আসলে বিশুদ্ধ শূন্য; ‘শূন্য’ এবং ‘শূন্য-জগৎ’—এই শব্দদ্বয় একই অর্থে ব্যবহৃত, দুটোই চেতনার প্রকৃতি। এখানে কিছুই জন্মেনি—না বিশ্ব, না তার সূচনা, না কোনো দৃশ্যমান বস্তু; সবকিছু নিজের মতোই আছে, অজ্ঞেয় ও অব্যক্ত। এই বিশ্বই মহা শূন্য, চেতনার শূন্য, কোনো বিভাজন নেই; এটি যেমন পরমাণুর আকারের অঞ্চল, তেমনি এমন এক স্কেল যা কখনো পূর্ণ হয় না। এটি শুধু শূন্যের প্রকৃতি, বিশুদ্ধ, কোনো রূপ ধারণে মুক্ত; শূন্যের মধ্যে শূন্য-নির্মিত এক চমৎকার দৃশ্য দাঁড়িয়ে আছে, যেমন কল্পনার দ্বারা গঠিত কোনো নগর। এখন শোনো, সেই সুবর্ণ মণ্ডপের কাহিনী, যা শ্রবণের অলংকার; যার মাধ্যমে এই অর্থ নির্দ্বিধায় তোমার মনে শান্তি এনে দেবে। ও ব্রহ্মন, সত্য জ্ঞানের বিকাশের জন্য, দ্রুত সংক্ষেপে আমাকে সেই মণ্ডপের কাহিনী বলো, যাতে জ্ঞান বৃদ্ধি পায়। এই পৃথিবীতে ছিল এক মহৎ পদ্মবংশ, পূর্ণ বিকশিত—এক রাজা, নাম পদ্ম, যিনি কীর্তিমান, বহু পুত্র ও বিপুল সম্পদের অধিকারী। সীমা রক্ষায় তিনি ছিলেন এক মহাসাগর; শত্রুদের কাছে তিনি সূর্য, অন্ধকার দূর করেন; প্রিয়জনদের কাছে তিনি চাঁদ, রাত্রির পদ্মকে আনন্দ দেন; দোষের প্রতি তিনি আগুন, ঘাস পোড়ান। জ্ঞানীদের সভায় তিনি ছিলেন মেরু পর্বত; তার খ্যাতির চাঁদ ওঠে তার সাগর থেকে; মহৎ গুণের রাজহাঁসের জন্য তিনি হ্রদ; শিল্পের পদ্মের জন্য তিনি সূর্য। শত্রুদের সাগরকে তিনি বায়ুর মতো ছড়িয়ে দেন; অহংকারী হাতিদের মধ্যে তিনি সিংহ; সব জ্ঞানের শাখায় তিনি প্রিয়; সব বিস্ময়কর গুণের খনি। তিনি মান্দার পর্বত, শত্রুদের সাগরকে মথান করেন; নানা প্রস্ফুটিত গুণের মধু; সৌভাগ্যের ফুলে সজ্জিত প্রেমের দেবতা। ক্রীড়ার লতায় তিনি বাতাস; সাহসের উৎসবে তিনি বীর; মহত্ত্বের রাত্রি-পদ্মে তিনি চাঁদ; বিরল ক্রীড়ার লতায় তিনি আগুন। তার ভাগ্যবতী স্ত্রী ছিল লীলা, সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ, সকল শুভ গুণে ভূষিত, যিনি পৃথিবীতে সদ্য বিকশিত পদ্মের মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন। তিনি সমস্ত সৌভাগ্যে সজ্জিত, ক্রীড়ায় মধুর ভাষায় কথা বলেন, আনন্দে মৃদু দীপ্তি ছড়ান, তার হাসি যেন দ্বিতীয় চাঁদের উদয়। তার পদ্ম-মুখ আলকার বাসিন্দাদের মন আকর্ষণ করত; তার দেহ শীতল, অন্তর বিশুদ্ধ, যেন পদ্মের হৃদয়—পদ্মের জীবন্ত রূপ। তিনি হাসতেন, যেন জুঁইয়ের গুচ্ছের দীপ্তি লতার খেলায়; স্বাদে পূর্ণ, তার হাত নব কুঁড়ির মতো কোমল, ফুলে সজ্জিত, মানব রূপে লক্ষ্মী। তার দেহ দীপ্তিময়, বিশুদ্ধ, শুভ, সকলের আনন্দের উৎস; তিনি পৃথিবীতে প্রবেশ করেন, যেন গঙ্গা নদী, রাজহাঁসের সঙ্গ উপভোগ করেন। রাজা পদ্মের জন্য আরেকটি আনন্দের উৎস জাগে—নতুন প্রিয়ার মতো, দীর্ঘকাল ধরে পৃথিবীর ফুলের সেবা করেন, যা সকল আনন্দ দেয়। যখন তিনি উদ্বিগ্ন, স্ত্রীও উদ্বিগ্ন; যখন তিনি আনন্দিত, স্ত্রীও আনন্দিত; যখন তিনি অস্থির, স্ত্রীও অস্থির; যেন প্রতিফলন, প্রিয়ার ভয় কেবল তখনই, যখন তিনি ক্রুদ্ধ। এই পৃথিবীর দেবীসমা কন্যার সঙ্গে, যার আর কোনো স্ত্রী ছিল না, রাজা পদ্ম অকৃত্রিম প্রেমের স্বাদ উপভোগ করতেন। বাগানে, বন-ঝোপে, তামাল বৃক্ষের ঘন গাছে, ফুলে ছাওয়া বিছানায়, লতায় জড়ানো গৃহে— ফুলে সজ্জিত প্রাসাদে, ফুলের অলংকারে সাজানো পথে, বসন্তবাগানে দোলায়, পদ্ম-পুকুরের খেলায়— চন্দনবন, সন্তানা বৃক্ষের ছায়ায়, কদম্ব ও নিমের গৃহে, পরিভদ্র বৃক্ষের ফাঁকে— পর্বতের গুহা ও উপত্যকায়, জানালা-ঘরে, নদীর তীরে টেরাসে, হাতির পিঠে প্রাসাদে— গ্রীষ্মে শীতল প্রাসাদে, লতায় জড়ানো বাওয়ারে, সুবর্ণ প্রাসাদ ও বৃক্ষে, মুক্তা ও রুবিতে সাজানো দেয়ালে— যেখানে জুঁই ও পারিজাত বৃক্ষ প্রস্ফুটিত, তাদের পরাগ সুগন্ধ, বসন্তবাগানে কোকিলের কলরব— নরম, দীপ্তিময় ঘাসে ঢাকা ভূমিতে, ঝর্ণার ঝরায় ঝকমকে জলের ধারা— সোনার ও রুবিতে সজ্জিত পর্বতশিলা, দেব ঋষিদের গৃহে, দূরবর্তী পুণ্য আশ্রমে— শ্বেতপদ্মের প্রস্ফুটিত পুকুরে, হাস্যোজ্জ্বল শাপলা, প্রস্ফুটিত বন-প্রান্তরে, নীলপদ্মের পূর্ণ বিছানায়— ধাঁধা, গল্প, অক্ষরের খেলা, নানা রকম বোর্ড-গেম, গোপন পাশার খেলায়— নাটক ও কাহিনী, কবিতা ও বিন্দুর জটিল নকশা, আঞ্চলিক ভাষা, নগর ও গ্রামের রীতিতে— মালার, পুষ্প-গুচ্ছ, ফুলের শৃঙ্খল, নানা অলংকারে, ক্রীড়ার কৌশলে, নানা আনন্দের পাত্রে— নরম পান, সুপারি, কর্পূরের চিবানো, ক্রীড়ার আলিঙ্গন, দোলায় ওঠার আনন্দ— গৃহে, ফুলে সাজানো দোলায়, একে অপরকে দোলানোর ছন্দে, ফুলে ছাওয়া লতায় শরীর লুকিয়ে— নৌকা, রথ, হাতি, ঘোড়া, উটের যাত্রায়, জলে ক্রীড়া, একে অপরকে ছিটিয়ে— নৃত্য, গান, শিল্পের প্রদর্শনী, জোরালো তাণ্ডব নৃত্য, সঙ্গীত, আলাপ, বীণা ও মৃদঙ্গের বাজনায়— রাজা পদ্ম ও লীলা, এইভাবে প্রেম, আনন্দ ও সৌন্দর্যে ভরা জীবন কাটাতেন, প্রকৃতি ও কল্পনার অপার মণ্ডপে।