একদিন এক জ্ঞানী গুরু তাঁর শিষ্যদের কাছে চাণ্ডোগ্য উপনিষদের গভীর রহস্যময় শিক্ষা তুলে ধরলেন। তিনি বললেন, ‘‘প্রকৃত জ্ঞানী ব্যক্তি যখন অগ্নি জ্বালান, তখন তার প্রতিটি পর্যায়ে রথন্তর সামনের বিভিন্ন অংশ প্রকাশ পায়। প্রথমে ঘর্ষণ—এটাই হিঙ্কার; ধোঁয়া উঠতে থাকে—এটাই প্রস্তাব; আগুন জ্বলতে শুরু করে—এটাই উদগীথ; তখন কয়লা তৈরি হয়—এটাই প্রতিহার; শেষে আগুন নিভে যায়—এটাই নিধন। এইভাবে রথন্তর সামন অগ্নির মধ্যে গাঁথা আছে।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘যিনি এভাবে রথন্তর সামনকে অগ্নির মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি ব্রহ্মের দীপ্তিতে উজ্জ্বল হন, খাদ্যগ্রহণে সক্ষম হন, সম্পূর্ণ আয়ু লাভ করেন, দীর্ঘজীবী হন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ হন, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। তবে আগুনের সামনে জল পান বা থুতু ফেলা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ পরবর্তী অধ্যায়ে গুরু বললেন, ‘‘মানুষের দাম্পত্য জীবনও এই সামনের ধ্বনি ও পর্যায়ে গাঁথা। যখন কেউ কথা বলে—এটাই হিঙ্কার, যখন কিছু প্রকাশ করে—এটাই প্রস্তাব, যখন নারীসঙ্গ করে—এটাই উদগীথ, আবার নারীসঙ্গ করলে—এটাই প্রতিহার, সময় চলে গেলে—এটাই নিধন, জীবন পার হয়ে গেলে—এটাই নিধন। এভাবেই এই সামন দম্পতির মধ্যে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি এভাবে বামদেভ্য সামন দম্পতির মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি দাম্পত্যে একতাবদ্ধ হন; সেই একতা থেকে সন্তান জন্মায়; তিনি পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। কোনো নারীকে এড়িয়ে চলা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ এরপর গুরু সূর্যকে নিয়ে বললেন, ‘‘সূর্যোদয়—হিঙ্কার; দুপুরের পূর্বভাগ—প্রস্তাব; মধ্যাহ্ন—উদগীথ; বিকেল—প্রতিহার; সূর্যাস্ত—নিধন। এভাবেই ব্রহৎ সামন সূর্যের মধ্যে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি ব্রহৎ সামনকে সূর্যের মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি দীপ্তিমান হন, খাদ্যগ্রহণে সক্ষম হন, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। দীপ্তিমান সূর্যকে কখনো নিন্দা করা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ গুরু বললেন, ‘‘মেঘ জমা—হিঙ্কার; মেঘের জন্ম—প্রস্তাব; বৃষ্টি—উদগীথ; বজ্রপাত ও গর্জন—প্রতিহার; বৃষ্টি থেমে যাওয়া—নিধন। এভাবে বৈরূপ সামন মেঘের মধ্যে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি বৈরূপ সামনকে মেঘের মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি বিকৃত ও সুগঠিত গবাদিপশু লাভ করেন, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। বৃষ্টির মেঘকে নিন্দা করা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ তিনি ঋতুদের প্রসঙ্গে বললেন, ‘‘বসন্ত—হিঙ্কার; গ্রীষ্ম—প্রস্তাব; বর্ষা—উদগীথ; শরৎ—প্রতিহার; শীত—নিধন। এভাবে বৈরাজ সামন ঋতুর মধ্যে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি বৈরাজ সামনকে ঋতুর মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি সন্তান, গবাদিপশু ও ব্রহ্মের দীপ্তিতে উজ্জ্বল হন, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। ঋতুকে নিন্দা করা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ তিনি বললেন, ‘‘পৃথিবী—হিঙ্কার; মধ্যাকাশ—প্রস্তাব; স্বর্গ—উদগীথ; দিক—প্রতিহার; মহাসাগর—নিধন। এভাবে শাক্বরী সামন বিশ্বে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি শাক্বরী সামনকে বিশ্বে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি বিশ্বে অধিকারী হন, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। বিশ্বকে নিন্দা করা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ তিনি বললেন, ‘‘ছাগল—হিঙ্কার; ভেড়া—প্রস্তাব; গরু—উদগীথ; ঘোড়া—প্রতিহার; মানুষ—নিধন। এভাবে রেভতী সামন প্রাণীতে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি রেভতী সামনকে প্রাণীতে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি গবাদিপশু লাভ করেন, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। প্রাণীকে নিন্দা করা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ তিনি শরীরের অঙ্গ নিয়ে বললেন, ‘‘চুল—হিঙ্কার; ত্বক—প্রস্তাব; মাংস—উদগীথ; হাড়—প্রতিহার; অস্থিমজ্জা—নিধন। এভাবে যজ্ঞাযজ্ঞীয় সামন অঙ্গে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি যজ্ঞাযজ্ঞীয় সামনকে অঙ্গে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি সুস্থ অঙ্গের অধিকারী হন, কোনো অঙ্গে দুর্বলতা আসে না, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। এক বছর মজ্জা খাওয়া উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ তিনি দেবতাদের প্রসঙ্গে বললেন, ‘‘অগ্নি—হিঙ্কার; বায়ু—প্রস্তাব; সূর্য—উদগীথ; তারা—প্রতিহার; চাঁদ—নিধন। এভাবে রাজন সামন দেবতাদের মধ্যে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি রাজন সামনকে দেবতাদের মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি তাদের সঙ্গে যুক্ত হন, সৃষ্টি ও ঐক্য লাভ করেন, পূর্ণ আয়ু, দীর্ঘজীবন, সন্তান ও গবাদিপশুতে মহৎ, খ্যাতিতে উজ্জ্বল হন। ব্রাহ্মণদের নিন্দা করা উচিত নয়—এটাই আচরণবিধি।’’ তিনি বললেন, ‘‘ত্রৈবেদ্য—হিঙ্কার; তিনটি বিশ্ব—প্রস্তাব; অগ্নি, বায়ু, সূর্য—উদগীথ; তারা, পাখি, রশ্মি—প্রতিহার; সর্প, গন্ধর্ব, পূর্বপুরুষ—নিধন। এভাবে এই সামন সমস্ত কিছুর মধ্যে গাঁথা।’’ ‘‘যিনি সামনকে সব কিছুর মধ্যে গাঁথা হিসেবে জানেন, তিনি সবকিছু হয়ে যান।’’ তিনি একটি শ্লোক উচ্চারণ করলেন, ‘‘যা পাঁচভাগ, তিনের দ্বারা তিন, তার চেয়ে বড় বা উচ্চ কিছু নেই।’’ ‘‘যিনি এ জ্ঞান জানেন, তিনি সবকিছু জানেন; সব দিক থেকে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়; তাঁর ধ্যান—‘আমি এই সবকিছু’—এটাই আচরণবিধি।’’ গুরু সামনের বিনার্দি সুরের কথা বললেন, ‘‘এতে গবাদিপশুর কামনা করা হয়: দেবতাদের মধ্যে উদগীথ অগ্নির, অনিরুক্ত প্রজাপতির, নিরুক্ত সোমের, কোমল ও মসৃণ বায়ুর, মসৃণ ও শক্ত ইন্দ্রের, ক্রৌঞ্চ বৃহস্পতির, অপধ্বান্ত বরুণের। সব দেবতাকে সম্মান করা উচিত, শুধু বরুণকে এড়াতে হয়।’’ ‘‘গান গাওয়ার সময় দেবতাদের জন্য ‘আমি অমরত্ব লাভ করি’, পূর্বপুরুষদের জন্য ‘আমি স্বধা লাভ করি’, মানুষের জন্য ‘আমি আশা লাভ করি’, প্রাণীদের জন্য ‘আমি ঘাস ও জল লাভ করি’, যজ্ঞকারীর জন্য ‘আমি স্বর্গ লাভ করি’, নিজের জন্য ‘আমি খাদ্য লাভ করি’—এইভাবে মনোযোগ দিয়ে প্রশংসা করা উচিত।’’ ‘‘সব সুর ইন্দ্রের রূপ; সব তাপ প্রজাপতির রূপ; সব স্পর্শ মৃত্যুর রূপ। কেউ সুর নিয়ে প্রশ্ন করলে বলবে, ‘আমি ইন্দ্রের আশ্রয় নিয়েছি, তিনি উত্তর দেবেন।’ তাপ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলবে, ‘আমি প্রজাপতির আশ্রয় নিয়েছি, তিনি দেখাশোনা করবেন।’ স্পর্শ নিয়ে প্রশ্ন করলে বলবে, ‘আমি মৃত্যুর আশ্রয় নিয়েছি, তিনি তোমাকে গ্রহণ করবেন।’’ ‘‘সব সুরের প্রশংসা করতে হবে—‘আমি শক্তি ইন্দ্রকে উৎসর্গ করি’; সব তাপের প্রশংসা করতে হবে—‘আমি আত্মা প্রজাপতিকে উৎসর্গ করি’; সব স্পর্শের প্রশংসা করতে হবে—‘আমি আত্মা মৃত্যুর কাছ থেকে ফিরিয়ে রাখি।’’ তিনি বললেন, ‘‘ধর্মের তিন স্তম্ভ: যজ্ঞ, অধ্যয়ন ও দান—প্রথম; তপস্যা—দ্বিতীয়; এবং তৃতীয় হল গুরুগৃহে ব্রহ্মচারী হয়ে পূর্ণ মনোযোগে থাকা। এ সবই সদ্গতি দেয়, কিন্তু ব্রহ্মে প্রতিষ্ঠিত হলে অমরত্ব লাভ হয়।’’ ‘‘প্রজাপতি বিশ্বকে উত্তপ্ত করেছিলেন, উত্তপ্ত বিশ্ব থেকে ত্রৈবেদ্য জ্ঞান প্রবাহিত হয়। আবার উত্তপ্ত করলে ভু:, ভূব:, স্ব: এই অক্ষরগুলি উৎপন্ন হয়। আরও উত্তপ্ত করলে ওঁ অক্ষর উদয় হয়। যেমন একটি খুঁটি সব পাতাকে ধরে রাখে, ওঁ তেমনি সব বাক্যকে ধরে রাখে। ওঁ-ই সবকিছু; ওঁ-ই সবকিছু।’’ ব্রহ্মজ্ঞরা বলেন, ‘‘প্রাতঃকালীন সোমনিষ্পেষণ বসুদের জন্য, মধ্যাহ্নে রুদ্রদের জন্য, তৃতীয়বার আদিত্য ও সব দেবতার জন্য।’’ ‘‘তখন যজ্ঞকারীর গতি কোথায়? যদি কেউ না জানে, তাহলে কীভাবে আচরণ করবে? কিন্তু যদি জানে, তবে সে অনুযায়ী আচরণ করবে।’’ ‘‘প্রাতঃকালীন পাঠের আগে, বেদি প্রস্তুত করে, গার্হপত্য অগ্নির উত্তরে, পিঠ দিয়ে বসে, তিনি বাসব সামন গান গায়।’’ ‘‘‘হে বিশ্বদ্বারের উন্মোচক, আমরা যেন তোমাকে দেখি, হে দীপ্তিমান।’’ ‘‘এরপর তিনি অগ্নিকে অর্ঘ্য দেন—‘ভূমির ও বিশ্বের রক্ষক অগ্নিকে নমস্কার। আমি যজ্ঞকারীর জন্য বিশ্ব লাভ করি। এটাই যজ্ঞকারীর বিশ্ব; আমি এটাই।’’ ‘‘এখানে যজ্ঞকারী আয়ুর সীমা অতিক্রম করে উঠে দাঁড়ান, ‘স্বাহা, প্রতিবন্ধকতা দূর করো।’ তখন বসুরা তাঁকে প্রাতঃকালীন নিপেষণ দেন।’’ ‘‘মধ্যাহ্ন নিপেষণের আগে, বেদি প্রস্তুত করে, অগ্নীধ্র অগ্নির উত্তরে, পিঠ দিয়ে বসে, তিনি রৌদ্র সামন গান গায়।’’ ‘‘‘হে বিশ্বদ্বারের উন্মোচক, আমরা যেন তোমাকে দেখি, হে বীর।’’ ‘‘এরপর তিনি বায়ুকে অর্ঘ্য দেন—‘মধ্যাকাশ ও বিশ্বের রক্ষক বায়ুকে নমস্কার। আমি যজ্ঞকারীর জন্য বিশ্ব লাভ করি। এটাই যজ্ঞকারীর বিশ্ব; আমি এটাই।’’ ‘‘এখানে যজ্ঞকারী আয়ুর সীমা অতিক্রম করে উঠে দাঁড়ান, ‘স্বাহা, প্রতিবন্ধকতা দূর করো।’ তখন রুদ্ররা তাঁকে মধ্যাহ্ন নিপেষণ দেন।’’ এভাবেই গুরু শিষ্যদের প্রকৃত জ্ঞানের মহিমা, সামনের গাঁথা, আচরণবিধি ও যজ্ঞের গভীর অর্থ বোঝালেন।