বিদেহের রাজা জনক এক মহাযজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন, যেখানে তিনি অগণিত দান প্রদান করেন। সেই যজ্ঞে কুরু ও পাঁচাল দেশের বহু বিদ্বান ব্রাহ্মণ সমবেত হন। তখন জনকের মনে কৌতূহল জাগে—এই ব্রাহ্মণদের মধ্যে কে সর্বাধিক ব্রহ্মজ্ঞানে পারদর্শী? তিনি এক হাজার গাভীকে পৃথকভাবে বেঁধে রাখলেন, প্রত্যেক গাভীর শিঙে দশটি স্বর্ণমুদ্রা বেঁধে দেওয়া হলো। জনক ব্রাহ্মণদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলেন, ‘‘হে মান্যগণ, তোমাদের মধ্যে যিনি ব্রহ্মজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ, তিনি যেন এগুলি নিয়ে যান।’’ কিন্তু কোনো ব্রাহ্মণই সাহস করলেন না এগুলি নিতে। তখন যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর শিষ্য সমাশ্রবকে বললেন, ‘‘প্রিয়, তুমি এই গাভীগুলি নিয়ে যাও।’’ সমাশ্রব গাভীগুলি নিয়ে যান। তখন অন্যান্য ব্রাহ্মণেরা ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, ‘‘তিনি কীভাবে দাবি করেন যে তিনিই আমাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী?’’ এরপর জনকের পৌরোহিত্যের প্রধান আস্বল যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘নিশ্চয়ই, যাজ্ঞবল্ক্য, আপনি আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ?’’ যাজ্ঞবল্ক্য নম্রভাবে উত্তর দিলেন, ‘‘আমরা শ্রেষ্ঠকে প্রণাম করি; আমরা তো শুধু গাভী চেয়েছি।’’ তখন আস্বল তাঁকে আরও প্রশ্ন করতে প্রস্তুত হলেন। প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘‘যেহেতু এই সমস্ত কিছু মৃত্যুর অধীন, যজ্ঞকারী মৃত্যুর গ্রাস থেকে কীভাবে মুক্ত হন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘যজ্ঞের হোত্র্, বাক্ ও অগ্নির দ্বারা; কারণ বাক্-ই হোত্র্। এই বাক্, এই অগ্নি, এই হোত্র্—এটাই মুক্তির পথ।’’ পরবর্তী প্রশ্ন, ‘‘যেহেতু সবকিছু দিন ও রাত্রির দ্বারা গ্রাসিত, যজ্ঞকারী দিন-রাত্রির বন্ধন থেকে কীভাবে মুক্ত হন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘যজ্ঞের অধ্যার্যু, চক্ষু ও সূর্যের দ্বারা; চক্ষুই অধ্যার্যু। এই চক্ষু, এই সূর্য, এই অধ্যার্যু—এটাই সম্পূর্ণ মুক্তির পথ।’’ আবার প্রশ্ন, ‘‘ক্ষয় ও বৃদ্ধি পক্ষ দ্বারা সবকিছু আবদ্ধ, যজ্ঞকারী এদের বন্ধন থেকে কীভাবে মুক্ত হন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘যজ্ঞের ব্রাহ্মণ, মন ও চন্দ্রের দ্বারা; মনই ব্রাহ্মণ। এই মন, এই চন্দ্র, এই ব্রাহ্মণ—এটাই মুক্তির পথ।’’ আস্বল জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘মধ্যবর্তী স্থানটি তো নির্ভরহীন, যজ্ঞকারী স্বর্গলোকে কীভাবে আরোহণ করেন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘উদ্গাতৃ, পদ্ধতি ও প্রাণের দ্বারা; কারণ প্রাণই উদ্গাতৃ। এই প্রাণই বায়ু, এই উদ্গাতৃর উচ্চারণ, এটাই চরম মুক্তি।’’ এরপর আস্বল জানতে চাইলেন, ‘‘আজ হোত্র্ কয়টি স্তোত্র পাঠ করেন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘তিনটি—পুরোণুবাক্য, যাজ্য এবং শস্য। এগুলোর দ্বারা পৃথিবী, মধ্যলোক ও স্বর্গলোকে অধিকার লাভ হয়।’’ আবার প্রশ্ন, ‘‘আজ অধ্যার্যু কয়টি আহুতি দেন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘তিনটি—যা দীপ্তি দেয়, যা উপচে পড়ে, যা স্থির হয়। দীপ্তিতে দেবলোক, উপচে পড়ায় মনুষ্যলোক, স্থিরতায় পিতৃলোক লাভ হয়।’’ আবার জানতে চাওয়া হলো, ‘‘আজ ব্রাহ্মণ পুরোহিত দক্ষিণ দিকে কয়টি দেবতার দ্বারা যজ্ঞ রক্ষা করেন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘একটি—মন। মন অসীম, দেবতাগণও অসীম। অসীমের দ্বারা সত্যলোক লাভ হয়।’’ আবার প্রশ্ন, ‘‘আজ উদ্গাতৃ কয়টি স্তোত্র পাঠ করেন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘তিনটি—পুরোণুবাক্য, যাজ্য, শস্য; এদের দেবতা ও আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত। আত্মার সঙ্গে কোনগুলি?—পুরোণুবাক্য প্রাণ, যাজ্য অপান, শস্য ব্যান। এদের দ্বারা যে কিছুর প্রাণ আছে, তা লাভ হয়।’’ এরপর আস্বল প্রশ্ন বন্ধ করেন। এরপর জারত্কারব আর্তভাগ যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘কয়টি গ্রহ ও অতিগ্রহ আছে?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘আটটি গ্রহ ও আটটি অতিগ্রহ।’’ তিনি ব্যাখ্যা করলেন—প্রাণ গ্রহ, অপান অতিগ্রহ; জিহ্বা গ্রহ, রস অতিগ্রহ; বাক্ গ্রহ, নাম অতিগ্রহ; চক্ষু গ্রহ, রূপ অতিগ্রহ; কর্ণ গ্রহ, শব্দ অতিগ্রহ; মন গ্রহ, কাম অতিগ্রহ; হস্ত গ্রহ, কর্ম অতিগ্রহ; ত্বক গ্রহ, স্পর্শ অতিগ্রহ। এরপর আর্তভাগ জানতে চাইলেন, ‘‘যেহেতু সবই মৃত্যুর আহার্য, এমন কোনো দেবতা আছে যার জন্য মৃত্যু আহার্য?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘অগ্নিই মৃত্যু; আহার গ্রহণ করে সে আবার মৃত্যুকে জয় করে।’’ আরও জানতে চাওয়া হলো, ‘‘মানুষ মরলে কী তার সঙ্গে যায় না?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘নাম। নাম অসীম, তাই অসীমের দ্বারা সত্যলোক লাভ হয়।’’ প্রশ্ন, ‘‘মৃত্যুর সময় প্রাণসমূহ চলে যায় কি?’’—‘‘না, তারা এখানেই একত্র হয়; দেহ স্ফীত হয়ে পড়ে থাকে।’’ আরও প্রশ্ন, ‘‘মৃত ব্যক্তির বাক্ অগ্নিতে, প্রাণ বায়ুতে, চক্ষু সূর্যে, মন চন্দ্রে, দিক কর্ণে, পৃথিবী দেহে, আকাশ আত্মায়, উদ্ভিদ কেশে, বৃক্ষ মস্তককেশে, রক্ত ও শুক্র জলে স্থাপিত হলে, তখন সে কী হয়?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘হাত বাড়াও, প্রিয়।’’ এরপর তাঁরা একত্রে চিন্তা করলেন—যা কিছু করা হয়, তা কর্ম; যা কিছু প্রশংসা করা হয়, তাও কর্ম। সৎকর্মে সৎ, দুষ্কর্মে দুষ্ট হয় মানুষ। এরপর আর্তভাগ প্রশ্ন বন্ধ করেন। এরপর ভুজ্যু লাহ্যায়নি যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘আমরা মাদ্রদেশে ভিক্ষু হয়ে ঘুরছিলাম, পতঞ্চল কাপ্যর ঘরে গিয়েছিলাম; তাঁর কন্যায় গন্ধর্ব প্রবিষ্ট ছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তুমি কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি শুদ্ধন্ব আঙ্গিরস।’ আমরা যখন জগতের সীমা জানতে চাইলাম, তিনি বললেন, ‘যেখানে পারীক্ষিত গিয়েছিলেন।’ আমি আপনাকে জিজ্ঞাসা করছি, পারীক্ষিত কোথায় গিয়েছিলেন?’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘তাঁরা সেই স্থানে গিয়েছিলেন, যেখানে অশ্বমেধ যজ্ঞকারীরা যান। প্রতিদিন বিদেহদের বত্রিশটি রথ পৃথিবী প্রদক্ষিণ করে; সমুদ্র পৃথিবীকে দ্বিগুণ পরিবেষ্টন করে। মাঝখানের স্থান অত্যন্ত সূক্ষ্ম। ইন্দ্র বৃহৎ পক্ষী হয়ে তাঁদের বায়ুর কাছে নিয়ে যান, বায়ু তাঁদের নিজের মধ্যে ধারণ করে পারীক্ষিতের স্থানে পৌঁছে দেয়। তাই বায়ুই ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক; যিনি জানেন, তিনি মৃত্যুকে জয় করেন ও সমস্ত জীবন লাভ করেন।’’ এরপর ভুজ্যু প্রশ্ন বন্ধ করেন। এরপর কহোদ কৌশীতকেয় যাজ্ঞবল্ক্যকে বললেন, ‘‘আমাকে সেই ব্রহ্ম ব্যাখ্যা করুন, যা প্রত্যক্ষ, অপ্রত্যক্ষ নয়, সেই অন্তর্হিত আত্মা।’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘এই আত্মাই সর্বাধিক অন্তর্হিত।’’ ‘‘কোনটি?’’—‘‘যা ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুঃখ, মোহ, বার্ধক্য ও মৃত্যুর অতীত। এই আত্মা জানলে ব্রাহ্মণরা পুত্র, অর্থ, লোকের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে ভিক্ষু হয়। পুত্রের ইচ্ছা মানে অর্থের ইচ্ছা, অর্থের ইচ্ছা মানে লোকের ইচ্ছা—সবই ইচ্ছা। জ্ঞানী জ্ঞান অর্জন করে শিশুর মতো হয়, শিশুত্ব ও জ্ঞান ত্যাগ করে মুনি হয়; বাক্ ও মৌন ত্যাগ করে ব্রাহ্মণ হয়।’’ এরপর কহোদ প্রশ্ন বন্ধ করেন। এরপর উষ্ট চাক্রায়ণ প্রশ্ন করলেন, ‘‘আমাকে সেই ব্রহ্ম ব্যাখ্যা করুন, যা প্রত্যক্ষ, অপ্রত্যক্ষ নয়, সেই অন্তর্হিত আত্মা।’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘এই আত্মাই সর্বাধিক অন্তর্হিত।’’ ‘‘কোনটি?’’—‘‘যা প্রাণপ্রবাহে শ্বাস নেয়, অপানে শ্বাস নেয়, ব্যানে শ্বাস নেয়, উদানে শ্বাস নেয়, সমানে শ্বাস নেয়—এটাই অন্তর্হিত আত্মা।’’ উষ্ট আবার বললেন, ‘‘যেমন বলা যায়, ওটা গাভী, ওটা ঘোড়া, তেমন স্পষ্ট করে বলুন।’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘তুমি দর্শনের দর্শককে দেখতে পারো না, শ্রবণের শ্রোতাকে শুনতে পারো না, চিন্তার চিন্তককে ভাবতে পারো না, জ্ঞানের জ্ঞানীকে জানতে পারো না। এই আত্মাই সর্বাধিক অন্তর্হিত; অন্য সব দুঃখভোগী।’’ এরপর উষ্ট প্রশ্ন বন্ধ করেন। এরপর গার্গী বাচকনবী যাজ্ঞবল্ক্যকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘যাজ্ঞবল্ক্য, যেটিতে এই সমস্ত কিছু আড়া-উড়ি বোনা, সেই জলে কী বোনা?’’ তিনি বললেন, ‘‘বায়ুতে, গার্গী।’’ ‘‘বায়ুতে কী?’’—‘‘আকাশে।’’ ‘‘আকাশে কী?’’—‘‘মধ্যলোকে।’’ ‘‘মধ্যলোকে কী?’’—‘‘স্বর্গলোকে।’’ ‘‘স্বর্গলোকে কী?’’—‘‘সূর্যলোকে।’’ ‘‘সূর্যলোকে কী?’’—‘‘চন্দ্রলোকে।’’ ‘‘চন্দ্রলোকে কী?’’—‘‘নক্ষত্রলোকে।’’ ‘‘নক্ষত্রলোকে কী?’’—‘‘দেবলোকে।’’ ‘‘দেবলোকে কী?’’—‘‘গন্ধর্বলোকে।’’ ‘‘গন্ধর্বলোকে কী?’’—‘‘প্রজাপতিলোকে।’’ ‘‘প্রজাপতিলোকে কী?’’—‘‘ব্রহ্মলোকে।’’ ‘‘ব্রহ্মলোকে কী?’’—তখন যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘আর প্রশ্ন কোরো না, গার্গী, নতুবা তোমার মস্তক পতিত হবে; তুমি দেবতাতীত বিষয়ে জিজ্ঞাসা করছো।’’ এরপর গার্গী প্রশ্ন বন্ধ করেন। এরপর উদ্দালক আরুণি বললেন, ‘‘আমরা মাদ্রদেশে পতঞ্চল কাপ্যর ঘরে যজ্ঞ অধ্যয়ন করছিলাম; তাঁর পত্নীতে গন্ধর্ব প্রবিষ্ট ছিল। আমরা জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘তুমি কে?’ তিনি বললেন, ‘আমি কবন্ধ অথর্বণ।’ কবন্ধ অথর্বণ কাপ্য ও যজ্ঞকারীদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুমি কি জানো, কাপ্য, সেই সূত্র যা দিয়ে এ ও পরলোকে ও সমস্ত প্রাণী আবদ্ধ?’’ কাপ্য বললেন, ‘‘আমি জানি না, প্রভু।’’ আবার কবন্ধ বললেন, ‘‘তুমি কি জানো, কাপ্য, সেই অন্তর্যামী যিনি এ ও পরলোকে ও সমস্ত প্রাণীকে অন্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ করেন?’’ কাপ্য বললেন, ‘‘আমি তাঁকে জানি না, প্রভু।’’ কবন্ধ বললেন, ‘‘যে জানে, কাপ্য, সেই সূত্র ও অন্তর্যামী—সে ব্রহ্মজ্ঞ, লোকজ্ঞ, দেবজ্ঞ, বেদজ্ঞ, যজ্ঞজ্ঞ, প্রাণিজ্ঞ, আত্মজ্ঞ, সর্বজ্ঞ।’’ তিনি বললেন, ‘‘আমি জানি।’’ ‘‘যদি যাজ্ঞবল্ক্য তুমি না জানো, এবং নিজেকে ব্রহ্মজ্ঞ বলো, তোমার মস্তক পতিত হবে।’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘আমি জানি, গৌতম, সেই সূত্র ও অন্তর্যামী।’’ ‘‘যদি কেউ বলে, ‘আমি জানি,’ তবে সে যেন যেমন জানে, তেমনই বলে।’’ ‘‘তুমি বলো।’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘বায়ুই সেই সূত্র; বায়ুর দ্বারা এই ও পরলোকে ও সমস্ত প্রাণী আবদ্ধ। তাই মৃত্যুর সময় বলে, ‘তার অঙ্গ শিথিল হয়েছে।’ কারণ বায়ুই সূত্র।’’ এরপর গৌতম বললেন, ‘‘এবার অন্তর্যামীর কথা বলো।’’ যাজ্ঞবল্ক্য বললেন, ‘‘যিনি পৃথিবীতে অবস্থান করেন, তবু পৃথিবী নন, যাকে পৃথিবী জানে না, যার দেহ পৃথিবী, যিনি পৃথিবীকে অন্তর্যামী রূপে নিয়ন্ত্রণ করেন, তিনিই তোমার আত্মা, অন্তর্যামী, অমৃত।’’ এভাবেই সেই সম্মেলনে যাজ্ঞবল্ক্য একের পর এক গভীর প্রশ্নের উত্তর দেন, এবং উপস্থিত সকলের মনে ব্রহ্মজ্ঞানের দীপ্তি ছড়িয়ে দেন।