একদা, জিজ্ঞাসুদের সামনে উপনিষদের গভীর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল। আলোচনার শুরুতেই বলা হলো—নাস্তিত্ব বলে কিছু নেই, কারণ যা কিছু উপলব্ধি করা যায়, তা অস্তিত্বশীলই। কেউ কেউ স্বপ্ন কিংবা অনুরূপ কিছু উদাহরণ টেনে এনে বললেন, “তাহলে স্বপ্নের মতো জগৎও তো মায়া হতে পারে?” কিন্তু তখন স্পষ্ট করে জানানো হলো—স্বপ্ন ও বাস্তবের স্বভাব ভিন্ন, তাই এ তুলনা চলে না। এরপর কেউ বললেন, “তাহলে কি অস্তিত্বও নেই?” কিন্তু তার উত্তর এলো—না, কারণ অস্তিত্বের অনুপলব্ধি নেই। আবার যুক্তির দিক থেকেও এ ধারণা গ্রহণযোগ্য নয়। কেউ যদি বলেন, “একটিই মাত্র আছে,” তবে সেটাও অসম্ভব, তাই গ্রহণযোগ্য নয়। এভাবে আলোচনার শেষে বলা হলো—এইভাবে আত্মার সর্বব্যাপীতা প্রতিষ্ঠিত হয়। কিছু মানুষ বললেন, “ধাপে ধাপে পরিবর্তনের মাধ্যমে হয়তো বিরোধ কাটানো যায়।” কিন্তু তখন জানানো হলো—রূপান্তর ও পরিবর্তন থাকায় তা সম্ভব নয়। আবার, চূড়ান্ত অবস্থায় যখন উভয়ই চিরন্তন, তখন কোনো পার্থক্য থাকে না। কারণ, এভাবে ভাবা ঈশ্বরের জন্যও যুক্তিসঙ্গত নয়। আবার, যে অধিষ্ঠান বা আশ্রয় ভেবেছি, সেটাও যুক্তিসঙ্গত নয়। আরও কেউ কেউ আত্মাকে যন্ত্রের মতো ভাবলেন, কিন্তু বলা হলো—না, কারণ আত্মা ভোগ, অনুভব ইত্যাদির অধিকারী। যদি আত্মা যন্ত্রের মতো হত, তাহলে হয় সীমাবদ্ধতা, নয়তো সর্বজ্ঞতার অভাব দেখা দিত। আবার, উৎপত্তিও অসম্ভব। যন্ত্র তো কর্মফলদাতা নয়। কেউ বললেন, “জ্ঞান বা চেতনা থাকলে তো অস্বীকার করা যায় না।” তাতে বলা হলো—তাতে কোনো সমস্যা নেই, কারণ তা স্বীকারযোগ্য। কিন্তু এসব ধারণা পরস্পরবিরোধী। এরপর প্রশ্ন উঠল, “আকাশ থেকে কি কিছু উৎপন্ন হয়?”—না, কারণ শাস্ত্রে তা বলা হয়নি। তবে, অস্তিত্ব আছে। শব্দ ও পারিভাষিক অর্থের সম্ভাবনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায়। যেমন ‘ব্রহ্মণ’ শব্দের দ্বৈত অর্থ থাকে, তেমনই। কোনো প্রস্তাব লঙ্ঘন হয় না, কারণ কিছুই বিচ্ছিন্ন নয়। সবই শব্দ থেকে উদ্ভূত। তবে, এই পার্থক্য কেবল পরিবর্তন যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণই থাকে—জগতে যেমন দেখা যায়। এভাবে বায়ুরও ব্যাখ্যা হয়ে যায়। তবে, সবকিছুর অস্তিত্ব মানানো যায় না, তাই অস্বীকার করা হয়। তারপরে বলা হলো—তাহলে অগ্নি; শাস্ত্রে এভাবেই বলা হয়েছে। তারপর জল, তারপর পৃথিবী। অন্যান্য শব্দ থেকেও প্রসঙ্গ অনুযায়ী তাদের স্বরূপ বোঝা যায়। তবে, ধ্যানের মাধ্যমেই এই উপলব্ধি সম্ভব, কারণ তার চিহ্ন আছে। কখনো কখনো উল্টো ক্রমেও এই ক্রম মানানসই। কেউ কেউ বলেন, “চেতনা ও মন মাঝখানে আসে, কারণ তার চিহ্ন আছে।” কিন্তু না, এখানে কোনো প্রকৃত পার্থক্য নেই। বরং, সচল ও স্থির—এই দুইয়ের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি অনুসারে নামকরণ কেবল রূপক অর্থে হয়েছে। আত্মা উৎপন্ন নয়, কারণ শাস্ত্র তাই বলে এবং আত্মা চিরন্তন—অন্যদের মতো নয়। তাই জ্ঞানী আত্মা এইরূপই। এরপর আসে—প্রস্থান, গমন, এবং প্রত্যাবর্তন। পরের দুটি নিজস্ব স্বরূপেই ঘটে। কেউ যদি বলেন, “সূক্ষ্ম নয়, কারণ শাস্ত্র তা বলে,” তবে তা নয়, কারণ প্রসঙ্গ ভিন্ন। আবার, নিজস্ব শব্দ ও পরিমাপ থেকেও তা বোঝা যায়। এতে কোনো বিরোধ নেই, যেমন চন্দনে নানা রকম গন্ধ থাকলেও মূল বস্তু এক। এভাবেই, শাস্ত্রের গভীর তত্ত্ব একে একে উদ্ভাসিত হলো, আর আত্মার চিরন্তন, সর্বব্যাপী, অবিভাজ্য স্বরূপ ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।