পুরুষসূক্তের কাহিনি শুরু হয় এক মহাবিশ্বব্যাপী পুরুষের বর্ণনা দিয়ে। এই পুরুষের সহস্র মস্তক, সহস্র চোখ, সহস্র পদ; তিনি পৃথিবীকে চারদিকে ছড়িয়ে রেখেছেন এবং তার দশ আঙুলের পরিমাণ তিনি পৃথিবীর বাইরে বিস্তৃত। এই সমগ্র জগৎ—যা কিছু অতীত, যা কিছু বর্তমান—সবই পুরুষ। তিনি অমরত্বের অধিপতি, এবং সেই অমরত্ব খাদ্য দ্বারা বৃদ্ধি পায়। পুরুষের এই মহত্ত্বই সবকিছু নয়; তিনি এরও চেয়ে অধিক মহান। সমস্ত জীব মাত্র তার একাংশ, আর তার তিন অংশ রয়েছে স্বর্গে, অমরত্বে। পুরুষের তিন ভাগ উপরে উঠে গেল, আর এক ভাগ এই পৃথিবীতে রয়ে গেল। এই এক ভাগ থেকেই তিনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লেন—ভোজনযোগ্য ও অবোজনযোগ্য সকলের মধ্যে। এই অংশ থেকেই বিরাজের জন্ম হলো; বিরাজ থেকে আদিপুরুষের সৃষ্টি। জন্মের পর তিনি জলকে সামনে ও পিছনে অতিক্রম করে বিস্তৃত হলেন। তখন দেবতারা আদিপুরুষকে বলি হিসেবে রেখে যজ্ঞ সম্পাদন করলেন। বসন্ত ছিল ঘৃত, গ্রীষ্ম ছিল ইন্ধন, আর শরৎ ছিল আহুতি। দেবতারা, সাধ্যরা, এবং ঋষিরা সেই প্রথম জন্মানো মানবকে যজ্ঞের কুশে স্থাপন করে যজ্ঞ সম্পাদন করলেন। সেই যজ্ঞে সমস্ত কিছু উৎসর্গ করা হয়েছিল। সেই যজ্ঞ থেকে ঘৃতের সঞ্চয় জন্ম নিল, এবং তিনি আকাশের পশু, অরণ্যের পশু, ও গ্রাম্য পশুদের সৃষ্টি করলেন। এই যজ্ঞ থেকেই ঋক, সাম, ও যজুর বেদের জন্ম হলো; ছন্দও জন্ম নিল। এখান থেকেই ঘোড়া ও দ্বি-দন্ত প্রাণীদের উৎপত্তি হলো; গরু, ছাগল ও ভেড়ারও সৃষ্টি হলো। যখন দেবতারা পুরুষকে বিভক্ত করলেন, তখন তারা তাকে কত ভাগে ভাগ করলেন? তার মুখ কী হলো, বাহু কী হলো, উরু ও পদ কী নামে পরিচিত হলো? তার মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য, এবং পদ থেকে শূদ্রের জন্ম হলো। পুরুষের মন থেকে চন্দ্রের, চোখ থেকে সূর্যের সৃষ্টি হলো। মুখ থেকে ইন্দ্র ও অগ্নির, শ্বাস থেকে বায়ুর উৎপত্তি হলো। নাভি থেকে মধ্যলোক, মাথা থেকে স্বর্গ, পদ থেকে পৃথিবী, আর কানের থেকে দিক—এভাবে তারা বিশ্বজগৎ গঠন করলেন। তার যজ্ঞের সাতটি ঘের, আর তিনবার সাতটি ইন্ধন কাঠ সাজানো হলো। দেবতারা যজ্ঞ সম্পাদন করে পুরুষকে যজ্ঞ পশু হিসেবে বেঁধে রাখলেন। দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে যজ্ঞকে উৎসর্গ করলেন; এটাই ছিল প্রথম ধর্মীয় আচরণ। সেই শক্তিশালী দেবতারা স্বর্গীয় উচ্চতায় পৌঁছলেন, যেখানে প্রাচীন সাধ্যরা ও দেবতারা বাস করেন। এইভাবেই পুরুষসূক্তের কাহিনি এক মহাজাগতিক সৃষ্টি ও যজ্ঞের মধ্য দিয়ে শেষ হয়, যেখানে পুরুষের বিস্তৃতি, তার অংশ থেকে সৃষ্টির উৎপত্তি, এবং দেবতাদের যজ্ঞের মাধ্যমে বিশ্বজগৎ ও সমাজের প্রতিষ্ঠা ঘটে।