দেবী-মাহাত্ম্যের এই মহান কাহিনিতে তখন দেবতাদের শত্রুদের সৈন্যরা ভয়ংকর রূপধারিণী মাতৃগণের ক্রোধে একের পর এক ধ্বংস হতে লাগল। দেবী ও মাতৃগণ নানা উপায়ে অসুরদের নিধন করছিলেন। এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে, যখন অসুররা প্রাণ বাঁচাতে পালাতে শুরু করল, তখন মহাবলশালী রক্তবীজ প্রবল ক্রোধে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে এল। রক্তবীজের এক আশ্চর্য শক্তি ছিল—তার দেহ থেকে যতবার রক্তের ফোঁটা মাটিতে পড়ত, ঠিক ততবার সেই স্থান থেকে তারই সমান শক্তিশালী আরেকটি অসুর জন্ম নিত। সে ছিল গদাধারী, আর তখন ইন্দ্রাণী তার বর্শা নিয়ে তার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেন। ইন্দ্রাণী যখন রক্তবীজকে বজ্রাঘাতে আঘাত করলেন, তখন তার দেহ থেকে প্রচুর রক্ত প্রবাহিত হতে লাগল, আর সেই রক্ত থেকে তারই রূপ ও শক্তিসম্পন্ন অসংখ্য যোদ্ধা জন্ম নিতে লাগল। রক্তবীজের শরীর থেকে যত রক্ত পড়ছিল, ঠিক তত অসুর জন্ম নিচ্ছিল, এবং তারা মাতৃগণের সঙ্গে ভয়ংকর যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছিল। আবার যখনই তার মাথায় বজ্রাঘাত হতো, তখনও রক্ত ঝরত এবং হাজারে হাজারে অসুর জন্ম নিত। বৈষ্ণবী তার চক্র দিয়ে আঘাত করলেন, আর ঐন্দ্রী তার গদা দিয়ে। বৈষ্ণবীর চক্রের আঘাতে রক্তবীজের দেহ থেকে যে রক্তধারা গড়িয়ে পড়ল, তা থেকে অসংখ্য রক্তবীজ সদৃশ অসুর জন্ম নিয়ে পৃথিবী ভরে গেল। কুমারী তার বর্শা দিয়ে, বারাহী তার খড়্গ দিয়ে, আর মাহেশ্বরী তার ত্রিশূল দিয়ে রক্তবীজকে আঘাত করলেন। কিন্তু রক্তবীজ ক্রুদ্ধ হয়ে প্রত্যেক মাতৃগণকে তার গদা দিয়ে আঘাত করল। যতবার অস্ত্রের আঘাতে তার দেহ থেকে রক্ত ঝরল, সেই রক্ত মাটিতে পড়ে অসংখ্য অসুর জন্ম নিতে লাগল। এইভাবে তার রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া অসুরে পৃথিবী ভরে উঠল, আর দেবতারা চরম ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়লেন। তখন দেবতাদের বিমর্ষ দেখে চণ্ডিকা দেবী দ্রুত কালীকে বললেন, “ও চামুণ্ডা, তোমার মুখ বড় করো। আমার অস্ত্রের আঘাতে রক্তবীজের দেহ থেকে যে রক্ত ঝরে, তা থেকে যে অসুর জন্ম নেয়, তাদের দ্রুত তোমার মুখে গ্রহণ করো। যুদ্ধক্ষেত্রে তার রক্ত থেকে জন্ম নেওয়া অসুরদের গিলে ফেলো; এভাবে তার রক্ত নিঃশেষ হলে সে নিধন হবে, আর যাদের তুমি খেয়ে নেবে, তারা আর ফিরে আসবে না।” এভাবে দেবী বলার পর তিনি নিজের বর্শা দিয়ে রক্তবীজকে আঘাত করলেন, আর কালী তার ঝরা রক্ত মুখে ধরে ফেলতে লাগলেন। তখন রক্তবীজ তার গদা দিয়ে চণ্ডিকাকে আঘাত করল, কিন্তু দেবীর সামান্যতম ব্যথাও হলো না। আবার তার দেহ থেকে রক্ত ঝরতে লাগল, আর যেখানেই রক্ত পড়ল, চামুণ্ডা দ্রুত তা মুখে তুলে নিলেন। রক্ত থেকে যে অসুর জন্ম নিল, চামুণ্ডা তাদের গিলে খেলেন এবং রক্তও পান করলেন। এভাবে চামুণ্ডা তার রক্ত পান করার ফলে রক্তবীজ দুর্বল হয়ে পড়ল। দেবী তখন তাকে ত্রিশূল, চক্র, তীর, খড়্গ ও বর্শা দিয়ে আঘাত করলেন। অসংখ্য অস্ত্রাঘাতে রক্তবীজ রক্তে রঞ্জিত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তখন দেবতারা অপার আনন্দে উৎফুল্ল হলেন, আর মাতৃগণ রক্তপানে মত্ত হয়ে নৃত্য করতে লাগলেন। এ পর্যন্ত দেবীর রক্তবীজ বধের এই আশ্চর্য কাহিনি শুনে শ্রোতা বললেন, “ভগিনী, তুমি দেবীর গৌরবগাথা ও রক্তবীজ বধের কাহিনি সুন্দরভাবে বলেছ। এবার বলো, রক্তবীজ নিহত হলে শুম্ভ ও নিষুম্ভ এবং অন্যান্য অসুররা কী করল?” রক্তবীজ নিহত হলে, শুম্ভ, নিষুম্ভ এবং যুদ্ধে পতিত অন্যান্য অসুররা চরম ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠল। নিজের বিশাল বাহিনী ধ্বংস হতে দেখে নিষুম্ভ প্রবল রোষে প্রধান প্রধান অসুরদের নিয়ে দেবীর দিকে এগিয়ে এল। তার সামনে, পেছনে এবং চারপাশে অসংখ্য শক্তিশালী অসুর, রাগে অধীর হয়ে, দেবীকে বধ করতে উদ্যত হলো। শুম্ভও তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে চণ্ডিকাকে হত্যা করার সংকল্পে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রবেশ করল, এবং মাতৃগণের সঙ্গে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হলো। তখন চণ্ডিকা ও শুম্ভ-নিষুম্ভের মধ্যে প্রবল যুদ্ধ শুরু হলো, যেন মেঘের বৃষ্টির মতো তীব্র বাণবৃষ্টি হতে লাগল। চণ্ডিকা নিজের তীরবৃষ্টি দিয়ে তাদের বাণ কাটতে লাগলেন এবং অস্ত্রের বৃষ্টিতে শুম্ভ ও নিষুম্ভের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে আঘাত করলেন। নিষুম্ভ তখন তীক্ষ্ণ খড়্গ ও উজ্জ্বল ঢাল নিয়ে দেবীর বাহন সিংহের মাথায় আঘাত করল। কিন্তু দেবী তার খড়্গ ও ঢাল ছিন্ন করে দিলেন। তখন নিষুম্ভ বর্শা ছুঁড়ল, দেবী চক্র দিয়ে তা দ্বিখণ্ডিত করলেন। নিষুম্ভ আবার রাগে ত্রিশূল তুলে ছুঁড়ল; দেবী তা মুষ্ঠির আঘাতে粉碎 করলেন। এরপর সে গদা নিল, কিন্তু দেবী ত্রিশূল দিয়ে তা ভস্ম করে দিলেন। শেষে সে কুঠার নিয়ে এগোলো, দেবী তীরবৃষ্টিতে তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন। নিষুম্ভ, যার শক্তি ছিল ভয়ানক, মাটিতে পড়ে গেলে, তার ভাই শুম্ভ প্রবল ক্রোধে দেবী অম্বিকার দিকে এগিয়ে এল। সে রথে চড়ে, অপ্রতিম শক্তিসম্পন্ন অস্ত্র হাতে নিয়ে, তার আটটি অদ্বিতীয় বাহু দিয়ে আকাশ আচ্ছন্ন করে উজ্জ্বলতায় দীপ্ত হতে লাগল।