একদিন এক পবিত্র যজ্ঞের আসরে ঋষি ও যজমানগণ গভীর ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবতাদের আহ্বান করলেন। তাঁরা প্রথমে ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করলেন—“হে ইন্দ্র, তোমার শক্তি যেন আমার মধ্যে স্থাপিত হয়, তুমি যেন আমাদের ধন-সম্পদ দান করো। আমাদের আশীর্বাদ সত্য হোক, আমাদের আশীর্বাদ সত্য হোক।” তাঁরা মায়ের মতো ধরিত্রীকে আহ্বান করলেন—“হে পৃথিবী, আমাদের মা, তুমি যেন আমাদের কাছে আসো, আমাদের ডাকো।” তখন অগ্নিদেবের উদ্দেশে আহুতি নিবেদন করা হলো। এরপর ঋষিরা স্বর্গ, আমাদের পিতার নিকটেও আহ্বান জানালেন—“হে স্বর্গ, আমাদের পিতা, তুমি আমাদের কাছে এসো, আমাদের ডাকো।” আবার অগ্নিদেবকে আহুতি দেওয়া হলো। তাঁরা বললেন—“হে দেবতাদের সৃষ্টিকর্তা সাবিতৃ, তোমার প্রেরণায়, অশ্বিনীদের বাহু ও পুষণের হস্তে আমি তোমাকে গ্রহণ করি। অগ্নি, আমি তোমাকে জিহ্বা দিয়ে আস্বাদন করি।” এই যজ্ঞকে তাঁরা দেবতা সাবিতৃ, বৃহস্পতি ও ব্রহ্মার উদ্দেশে নিবেদন করলেন—“এই যজ্ঞের দ্বারা যজ্ঞকে, যজ্ঞপতিকে এবং আমাকেও রক্ষা করো।” তাঁরা কামনা করলেন—“মনোর আলো যেন ঘৃত আস্বাদন করে, বৃহস্পতি যেন এই যজ্ঞ বিস্তৃত করেন। যজ্ঞ যেন অক্ষত থাকে, সকল দেবতা এখানে আনন্দিত হোন। ওম, অগ্রসর হও।” অগ্নিকে উদ্দেশ করে তাঁরা বললেন—“এটাই তোমার জ্বালানি, অগ্নি; এর দ্বারা তুমি বৃদ্ধি পাও, পরিপূর্ণ হও। আমরাও যেন বৃদ্ধি পাই, পরিপূর্ণ হই। শক্তির বিজয়ী অগ্নি, তোমাকে আমি অভিষিক্ত করি, তুমি চলার পথে বিজয়ী হও।” তাঁরা প্রতিজ্ঞা করলেন—“আমি অগ্নি ও সোমের সমৃদ্ধিকে প্রত্যাখ্যান করি না, আমার কর্মে তা যেন দূরে না যায়। অগ্নি ও সোম, আমাদের শত্রু ও যাকে আমরা অপছন্দ করি, তাকে দূরে সরিয়ে দাও; শক্তির দ্বারা আমি তাকে দূরে করি। একইভাবে, ইন্দ্র ও অগ্নির সমৃদ্ধি আমি প্রত্যাখ্যান করি না, আমার কর্মে তা যেন দূরে না যায়। ইন্দ্র ও অগ্নি, আমাদের শত্রুকে দূরে সরিয়ে দাও; শক্তির দ্বারা আমি তাকে দূরে করি।” তাঁরা উৎসর্গ করলেন—“বসুগণের জন্য, রুদ্রগণের জন্য, আদিত্যদের জন্য এই উৎসর্গ। স্বর্গ ও পৃথিবী যেন একত্রিত হন। মিত্র ও বরুণ যেন বৃষ্টি বর্ষণ করেন। পাখিরা যেন ডানা ঝেড়ে উড়ে যায়। মারুদের পৃষতী রথগণ, তোমরা স্বর্গে গিয়ে বৃষ্টি নিয়ে এসো। অগ্নি, তুমি দৃষ্টির রক্ষক, আমার দৃষ্টি রক্ষা করো।” ঋষি অগ্নিকে নিবেদন করলেন—“হে অগ্নি, তোমার হাতে ঘেরা, গোপন আবরণের ভিতর যা আছে, সেই কৃপা আমি ভক্তিসহকারে তোমাকে অ捐র্গ করি; কেউ যেন তোমার সেই কৃপা থেকে বঞ্চিত না করে। অগ্নির প্রিয় পথ পান করা হয়েছে।” তাঁরা দেখলেন, যজ্ঞের অংশগুলো একত্রিত হয়েছে, তা মহান, তা কুশে স্থাপিত, দেবতারা তার পরিবেষ্টক। সকল দেবতা সেই বাণীর প্রশংসা করলেন; তাঁরা কুশাসনে বসে আনন্দিত হলেন। পরিবেষ্টককে স্বাহা নিবেদন করা হলো। ঋষি বললেন—“তোমরা দুইজন ঘৃতাচী, জোয়ারে যুক্ত; পান করো, সদয় হও, সদয়তা আমার মধ্যে স্থাপন করো। যজ্ঞের প্রতি শ্রদ্ধা ও নমস্কারসহ এগিয়ে এসো; যজ্ঞের শুভ অংশে, আমার শুভ অংশে দৃঢ়ভাবে অবস্থান করো।” অগ্নির উদ্দেশে তাঁরা প্রার্থনা করলেন—“হে অগ্নি, অব্যর্থ, অজর, আমাকে রক্ষা করো; বজ্রাঘাতে যেন ক্ষতি না হয়। সমৃদ্ধির জন্য রক্ষা করো, অশুভ থেকে রক্ষা করো, কু-ইচ্ছা থেকে রক্ষা করো; আমাদের নির্ভয় করো। শুভ আসনে, পরিবেষ্টককে স্বাহা। সভার অধিপতি অগ্নিকে স্বাহা। কীর্তিদাত্রী সরস্বতীকে স্বাহা।” তাঁরা বললেন—“তুমি জ্ঞান, যার দ্বারা তুমি, হে দেব, জানো; তুমি দেবতাদের জন্য জ্ঞান হয়ে ওঠো; সেই জ্ঞানের দ্বারা তুমি আমার জন্যও জ্ঞান হও। দেবতারা পথ জেনে পথে চলেন। হে মনঃপটু, এই যজ্ঞ বহন করো, স্বাহা; তা বায়ুতে স্থাপন করো।” তাঁরা কামনা করলেন—“বরিসহ, ঘৃতসহ, আদিত্য, বসু ও মারুদের সঙ্গে বারিহি অভিষিক্ত হোক। ইন্দ্র ও সকল দেবতা যেন তা অভিষিক্ত করেন; তা স্বর্গীয় আকাশে যাক, স্বাহা।” তাঁরা বললেন—“কে তোমাকে মুক্তি দেয়? তিনি দেন। কাকে মুক্তি দেন? তাকেই দেন। সমৃদ্ধির জন্য। তুমি রাক্ষসদের অংশ।” তাঁরা প্রার্থনা করলেন—“আমরা যেন দীপ্তি, পুষ্টি, বলিষ্ঠ দেহ ও শুভবুদ্ধিসহ একত্রিত হই। সদয় ত্বষ্টা আমাদের ধন দান করুন; আমাদের দেহ থেকে যা অপবিত্র তা দূর করুন।” তাঁরা দেখলেন, বিষ্ণু জগত্ ছন্দে আকাশে পদক্ষেপ করেন; সেখান থেকে তিনি আমাদের শত্রুকে দূর করুন। তিনি মধ্যলোকে, পৃথিবীতেও পদক্ষেপ করেন; সেখান থেকেও শত্রুকে দূর করুন। এই অন্ন থেকে, এই ভিত্তিতে আমরা স্বর্গে পৌঁছেছি; আমরা আলোতে একত্রিত হয়েছি। তাঁরা বললেন—“তুমি স্বয়ম্ভূ, সর্বোচ্চ রশ্মি, দীপ্তিদাতা; আমাকে দীপ্তি দাও। সূর্যের আবৃত অংশ আমি ফিরিয়ে দিই।” অগ্নিকে গৃহস্থের অধিপতি রূপে আহ্বান করে বললেন—“তুমি উত্তম গৃহস্থ হও; তোমার সঙ্গে আমিও উত্তম গৃহস্থ হই। আমাদের গৃহ্যাগ্নি শতশীত পর্যন্ত স্থায়ী হোক। সূর্যের আবৃত অংশ আমি ফিরিয়ে দিই।” তাঁরা বললেন—“হে অগ্নি, ব্রতপতি, আমি ব্রত পালন করেছি, তা সম্পন্ন করেছি—আমাকে তা দাও। আমি যেমন, তেমনই আছি।” অগ্নি, পিতৃপুরুষের আহুতি বহনকারী, ও সোম, পিতৃপুরুষের অধিপতি—তাঁদের উদ্দেশে স্বাহা নিবেদন করলেন। তাঁরা প্রার্থনা করলেন—“যে অসুর ও কুশলবৃদ্ধি এখানে অবস্থান করে, তাদের দূর করে দাও।” তাঁরা বললেন—“যে সব রূপ ধারণ করে অসুরেরা নিজের শক্তিতে বিচরণ করে, যারা বাধা সৃষ্টি করে, অপহরণ করে, তাদের এই অগ্নির জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দাও।” ঋষিগণ বললেন—“হে পিতৃপুরুষগণ, তোমরা তোমাদের অংশ অনুযায়ী আনন্দিত হও, শক্তিতে পূর্ণ হও। তোমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশে আনন্দিত হয়েছ, শক্তিতে পূর্ণ হয়েছ।” তাঁরা নমস্কার করলেন—“পিতৃপুরুষগণ, রসের জন্য নমস্কার; শুষ্কতার জন্য নমস্কার; জীবনের জন্য নমস্কার; আহুতির জন্য নমস্কার; তেজের জন্য নমস্কার; ক্রোধের জন্য নমস্কার; পিতৃপুরুষদের জন্য নমস্কার; আমাদের আহার দাও, এই বর দাও, বস্ত্র দাও।” তাঁরা বললেন—“হে পিতৃপুরুষগণ, ভ্রূণ, পদ্মমাল্য ধারণ করা বালককে গ্রহণ করো, যেমন এখানে মানুষ গ্রহণ করে।” তাঁরা বললেন—“বল, অমৃত, ঘৃত, দুধ, মধুপান ও প্রবাহিত তরল—এই আহুতি হোক, আমার পিতৃপুরুষদের তৃপ্ত করো।” এরপর ঋষিগণ অগ্নিকে জ্বালিয়ে পূজা করলেন, অতিথিকে ঘৃত-আহুতি দিয়ে জাগ্রত করলেন, এখানে আহুতি দিলেন। তাঁরা বললেন—“উজ্জ্বল অগ্নিতে বলিষ্ঠ ঘৃত দাও; অগ্নি, যিনি সকল জন্ম জানেন, তাঁকে দাও।” তাঁরা অঙ্গিরসের উদ্দেশে বললেন—“জ্বালানি কাঠ ও ঘৃত দিয়ে, হে অগ্নি, তোমাকে বৃদ্ধি করি, তুমি মহাদীপ্ত, সর্বকনিষ্ঠ।” তাঁরা কামনা করলেন—“ঘৃতবাহী, আহুতি-সমৃদ্ধ অর্ঘ্য তোমার কাছে আসুক, অগ্নি; আমার জ্বালানি কাঠ গ্রহণ করো।” তাঁরা বললেন—“ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ। যেমন আকাশ তার বিশালতায়, পৃথিবী তার প্রশস্ততায়—তোমার পৃষ্ঠে, হে পৃথিবী, দেবতাদের জন্য জন্মানো, আমি অগ্নিকে স্থাপন করি, অন্নের জন্য।” তাঁরা দেখলেন, চিতাবর্ণা গাভী এগিয়ে এসেছে; সে প্রথমে তার মায়ের কাছে, তারপর পিতার কাছে গিয়েছে, তাদের খুঁজে। তাঁরা অনুভব করলেন—তিনি উজ্জ্বল লোকগুলিতে বিচরণ করেন; তাঁর নিঃশ্বাস থেকে প্রশ্বাস উদ্ভূত হয়। মহান বলদ আকাশের ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁরা বললেন—“বাক্ ত্রিশটি স্থানে দীপ্তি ছড়ায়; তা দীপ্তিমান অগ্নিকে নিবেদিত; প্রতিদিন, প্রতিটি উজ্জ্বলতার সঙ্গে।” তাঁরা ঘোষণা করলেন—“অগ্নি আলো, আলো অগ্নি, স্বাহা। সূর্য আলো, আলো সূর্য, স্বাহা। অগ্নি তেজ, আলো তেজ, স্বাহা। সূর্য তেজ, আলো তেজ, স্বাহা। আলো সূর্য, সূর্য আলো, স্বাহা।” তাঁরা বললেন—“দেবতা সাবিতার সঙ্গে, ইন্দ্র-সমৃদ্ধ রাত্রির সঙ্গে, অগ্নি যেন গ্রহণ করে এখানে আসেন, স্বাহা। দেবতা সাবিতার সঙ্গে, ইন্দ্র-সমৃদ্ধ উষার সঙ্গে, সূর্য যেন গ্রহণ করে এখানে আসেন, স্বাহা।” তাঁরা বললেন—“আমরা যজ্ঞের কাছে এগিয়ে গিয়ে অগ্নিকে মন্ত্র উচ্চারণ করি; তিনি যেন আমাদের প্রতি সদয় হন।” তাঁরা জানালেন—“অগ্নি স্বর্গের শিরস্ত্রাণ, চূড়া, পৃথিবীর অধিপতি; তিনি জলের বীজ সঞ্চার করেন।” তাঁরা আহ্বান করলেন—“ইন্দ্র ও অগ্নি, তোমাদের ডাকছি; তোমাদের ঐশ্বর্যে আমাদের আনন্দ দাও। আহার ও ধনের দাতা, শক্তি অর্জনের জন্য তোমাদের ডাকছি।” তাঁরা বললেন—“এটাই তোমার আসন, হে ঋতুকাল, যেখান থেকে তুমি জন্মেছিলে ও দীপ্ত হয়েছিলে। তা জেনে, হে অগ্নি, আরোহণ করো; আমাদের ধন বৃদ্ধি করো।” শেষে তাঁরা বললেন—“এখানে, দাতাদের মধ্যে প্রথম, হোত্রি স্থাপিত, যিনি যজ্ঞে সর্বাধিক যোগ্য, যাঁর স্তব করা হয়; যাঁকে ভৃগুগণ, আপ্নবানপুত্ররা, অরণ্যে প্রকাশ করেছিলেন, তিনি আশ্চর্য, বহুরূপী, প্রতিটি গোত্রে বিদ্যমান।” এভাবেই, যজ্ঞের আসরে দেবতাদের উদ্দেশে, পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে, অগ্নি, ইন্দ্র, সোম, বৃহস্পতি, সরস্বতী, ত্বষ্টা, বিষ্ণু, মিত্র, বরুণ, মারুত, আদিত্য, বসু—সবাইকে আহ্বান, প্রার্থনা ও স্তব করা হলো। ঋষিগণ ও যজমানগণ তাঁদের কৃপা, রক্ষা, সমৃদ্ধি, দীপ্তি ও কল্যাণ কামনা করলেন, অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার জন্য নিবেদন করলেন; যজ্ঞের মাধ্যমে জগতের কল্যাণ ও আত্মার উন্নতি কামনা করলেন।