একদিন ঋষিরা একত্র হয়ে চেতনার গভীরতায় প্রবেশ করলেন, সেই চিরন্তন সত্যের নাভি, চারস্তরীয় মালার কথা স্মরণ করলেন। তারা প্রার্থনা করলেন—সেই সর্বব্যাপী, বিস্তৃত সত্তা যেন আমাদের সকলকে জীবন দান করেন, পূর্ণ জীবন দান করেন। হিংসা ও ক্ষয় যেন দূর হয়, ভিন্ন ব্রতধারীর মধ্যেও, আমরা যেন একত্রিত থাকতে পারি। তারা অনুভব করলেন, এই যে তাপ—এটাই তোমার সার; এই শক্তিতে তুমি বৃদ্ধি পাও, পূর্ণ হও। আমরাও যেন বৃদ্ধি পাই, পূর্ণ হই। তারপর তারা দেখলেন—এক মহাবলবান, গৌরবর্ণ, মহাশক্তিশালী বলদ, মিত্রের মতো গর্জন করছে, সকলের দৃষ্টিগোচর; সূর্যের সাথে সে আলোকিত, সাগরের মতো, যেন এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার। ঋষিরা আবার প্রার্থনা করলেন—জল ও উদ্ভিদ যেন আমাদের প্রতি সদ্ভাবাপন্ন হয়, সুহৃদয়ের মতো; কিন্তু যারা আমাদের ঘৃণা করে, কিংবা যাদের প্রতি আমাদের বৈরিতা, তাদের প্রতি যেন এ সদ্ভাব না থাকে। তারা অনুভব করলেন, আমরা অন্ধকার থেকে আলোয় এসেছি, উচ্চতর জগৎ দেখেছি; দেবতাদের মধ্যে দেবতা, সূর্য, সেই পরম আলোয় আমরা পৌঁছেছি। তারা বললেন—আমরা যেন তোমার অগ্নি জ্বালাতে পারি; তুমি ইন্ধন, তুমি দীপ্তি—সে দীপ্তি আমাদের মধ্যে স্থাপন করো। ঋষিরা অনুভব করলেন, স্বর্গ ও পৃথিবীর মতো, সাত নদীর মতো বিস্তৃত, হে ইন্দ্র, আমি তোমার সেই অক্ষয় শক্তির পান করি, বারবার, অব্যয়ভাবে। তারা কামনা করলেন—সেই মহাশক্তি আমার মধ্যে থাকুক, দক্ষতা থাকুক, দৃঢ় সংকল্প থাকুক। তিনরূপ তেজ, ব্রহ্ম, দীপ্তি নিয়ে উদ্ভাসিত হোক। তারা দুধের নির্যাস আহরণ করলেন, বললেন—আমরা যেন তার ফল বারবার পান করি। তোমার শক্তি, ইচ্ছা, দক্ষতা, অনুগ্রহ, অগ্নিহোত্র, ইন্দ্রের পানীয়, প্রজাপতির আহার্য, যে মধুময় আহ্বান করা হয়েছে—আমি যেন তা আহার করি। তারা সমস্ত দিক, প্রাণ, পৃথিবী, অগ্নি, মধ্যকাশ, বায়ু, আকাশ, সূর্য—সবকিছুকে 'স্বাহা' উচ্চারণে অর্ঘ্য দিলেন। আবার, দিক, চন্দ্র, নক্ষত্র, জল, বরুণ, নাভি, বিশুদ্ধ সত্তাকে অর্ঘ্য দিলেন। তারা বাক্য, প্রাণ, চক্ষু, কর্ণ—সব ইন্দ্রিয়কে অর্ঘ্য দিলেন। প্রার্থনা করলেন—মনের কামনা, বাক্যের সংকল্প, বাক্যের সত্যতা যেন লাভ করি; গবাদিপশুর রূপ, খাদ্যের স্বাদ, খ্যাতি ও সমৃদ্ধি আমার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হোক। তারা বারো দিন ধরে বিভিন্ন দেবতাকে স্মরণ করলেন—প্রথম দিনে সবিতৃ, দ্বিতীয় দিনে অগ্নি, তৃতীয় দিনে বায়ু, চতুর্থ দিনে আদিত্য, পঞ্চম দিনে চন্দ্র, ষষ্ঠ দিনে ঋতু, সপ্তম দিনে মরুত, অষ্টম দিনে বृहস্পতি; নবম দিনে মিত্র, দশম দিনে বরুণ, একাদশ দিনে ইন্দ্র, দ্বাদশ দিনে সকল দেবতা। তারা স্মরণ করলেন—ভয়ংকর, ভয়াল, অন্ধকার, কম্পনকারী; বিজয়ী, আক্রমণকারী, ছড়িয়ে দেওয়া—তাদের সকলকে 'স্বাহা'। রুদ্র, ইন্দ্র, মরুত, সাধ্য, ভব, মহাদেব, শর্ব, পশুপতি—তাদের দেহের নানা অঙ্গের সঙ্গে ঐশ্বর্য ও শক্তির স্মরণ করলেন। চুল, চামড়া, রক্ত, চর্বি, মাংস, স্নায়ু, অস্থি, মজ্জা, বীজ, মল—সব কিছুকেই 'স্বাহা' অর্ঘ্য দিলেন। তারা প্রচেষ্টা, সাধনা, সংযোগ, বিচ্ছেদ, উত্থান, বিশুদ্ধতা, দীপ্তি, দীপ্তিমান, দুঃখ—সব কিছুকে অর্ঘ্য দিলেন। তপস্যা, তপস্বী, শাসিত, শাসন, তেজ, প্রায়শ্চিত্ত, সংশোধন, আরোগ্য—সবকিছুকে অর্ঘ্য দিলেন। তারা যম, অন্তক, মৃত্যু, ব্রহ্মা, ব্রহ্মহত্যা, সকল দেবতা, স্বর্গ ও পৃথিবী—সবকিছুকে অর্ঘ্য দিলেন। এরপর ঋষিরা উপলব্ধি করলেন—এই জগতে যা কিছু চলে, সবই ঈশ্বর দ্বারা পরিবেষ্টিত। ত্যাগের মাধ্যমে ভোগ করো; অন্যের ধনে লোভ কোরো না। তারা বললেন—এভাবে কর্ম করতে করতে শতবর্ষ বাঁচার আকাঙ্ক্ষা করা উচিত। এর বাইরে আর কোনো পথ নেই; এমন কর্ম করলে কর্ম লেপটে থাকে না। তারা দেখলেন—যারা আত্মহত্যা করে, তারা মৃত্যুর পরে অন্ধকারে ঢাকা অসুরীয় জগতে যায়। ঋষিরা সেই চিরন্তন সত্তাকে অনুভব করলেন—যিনি স্থির থেকেও মনে থেকেও দ্রুত, দেবতারা যাকে ধরতে পারেনি, কারণ সে তাদের আগেই চলে যায়। স্থির থেকেও সে দৌড়বিদদের অতিক্রম করে; তার মধ্যে বায়ু ও জল প্রবাহিত হয়। তিনি চলেন, আবার চলেন না; তিনি দূরে, আবার কাছে। সমস্ত কিছুর মধ্যে, আবার সমস্ত কিছুর বাইরে তিনি বিরাজমান। যে ব্যক্তি সমস্ত প্রাণীকে নিজের আত্মার মধ্যে দেখে, এবং আত্মাকে সকল প্রাণীর মধ্যে দেখে, তার কোনো সন্দেহ থাকে না। যে জানে সমস্ত প্রাণী আত্মরূপে হয়েছে, তার জন্য আর কোনো মোহ বা দুঃখ থাকতে পারে না—কারণ সে একত্ব দেখে। তিনি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, বিশুদ্ধ, দেহহীন, ক্ষতহীন, স্নায়ুহীন, কলঙ্কহীন, পাপস্পর্শহীন; তিনি দ্রষ্টা, জ্ঞানী, স্বয়ম্ভূ, চিরকাল সবকিছু যথাযথভাবে নিয়োজিত করেছেন। যারা অব্যক্তকে পূজা করে, তারা অন্ধকারে প্রবেশ করে; যারা প্রকাশ্যকে উপভোগ করে, তারা আরো গভীর অন্ধকারে যায়। জ্ঞানীরা বলেছেন—প্রকাশ্য থেকে একরকম ফল, অব্যক্ত থেকে অন্যরকম ফল জন্মে। যে ব্যক্তি প্রকাশ্য ও বিনাশ উভয়কে জানে, সে বিনাশের দ্বারা মৃত্যুকে অতিক্রম করে, প্রকাশ্যের দ্বারা অমৃতত্বে পৌঁছে। যারা অজ্ঞতাকে পূজা করে, তারা অন্ধকারে প্রবেশ করে; যারা জ্ঞানকেই উপভোগ করে, তারা আরো গভীর অন্ধকারে যায়। জ্ঞানীরা বলেছেন—জ্ঞান থেকে একরকম ফল, অজ্ঞতা থেকে অন্যরকম ফল জন্মে। যে ব্যক্তি জ্ঞান ও অজ্ঞতা উভয়কে জানে, সে অজ্ঞতার দ্বারা মৃত্যু অতিক্রম করে, জ্ঞানের দ্বারা অমৃতত্বে পৌঁছে। ঋষিরা উপলব্ধি করলেন—বায়ু অমর, এই দেহ ছাই হয়ে যায়। হে মন, স্মরণ করো! হে কর্তা, স্মরণ করো! যা কিছু করেছ, তা স্মরণ করো! তারা অগ্নিকে ডেকে বললেন—হে অগ্নি, আমাদের শুভপথে নিয়ে চলো, আমাদের সমস্ত কর্ম জানো। আমাদের পাপ দূর করো। তোমাকে আমরা সর্বাধিক শ্রদ্ধা নিবেদন করি। শেষে তারা উপলব্ধি করলেন—সত্যের মুখ স্বর্ণপাত্রে ঢাকা। যে ব্যক্তি সূর্যের মধ্যে আছেন, আমি সেই ব্যক্তি। ওঁ, আকাশ, ব্রহ্ম।