হে পাঠক, শোনো এক মহিমান্বিত কাহিনি, ঋগ্বেদের পবিত্র স্তোত্রসমূহ থেকে বর্ণিত। ইন্দ্র দেবতা, তুমি তোমার অসীম শক্তিতে নামুচি ও মক্ষস্যুকে পরাস্ত করেছিলে—সে দাস, যে ঋষির বিরুদ্ধে কপটতা করেছিল। তুমি মনুর জন্য পথ মসৃণ করেছিলে, যেন রথের জন্য পথ সমতল করা হয়। তোমার নাম ও শক্তিতে তুমি সকলকে অতিক্রম করেছ, হে ইন্দ্র, এবং রাজ্যকে তোমার করায়ত্ত করেছ। দেবতারা তোমার শক্তিতে আনন্দিত, আর তুমি গভীর অরণ্যকেও বশীভূত করেছ। যখন তোমার চক্র জলে স্থাপিত হয়েছিল, তখন তার জন্য মধুর আবরণ বিস্তার করা হয়েছিল। পৃথিবীতে যা কিছু স্থির, গাভীর দুধ, সবকিছু তুমি উদ্ভিদে স্থাপন করেছিলে। মানুষ বলে, কেউ বলে ‘সে অশ্ব থেকে এসেছে’, কেউ বলে ‘সে শক্তি থেকে জন্মেছে’; কেউ কেউ তাকে এভাবে কল্পনা করে। সেই বাসস্থানে ক্রোধ উৎপন্ন হয়েছিল, যেখান থেকে ইন্দ্র জন্ম নিয়েছিলেন এবং নিজের উৎস জানতেন। ডানাওয়ালা পাখিরা, মহৎচিত্ত ঋষিরা, ইন্দ্রের নিকট এসেছিল, তাদের ভক্তি কখনো ব্যর্থ হয়নি। তারা প্রার্থনা করেছিল, ‘অন্ধকার দূর করো, দৃষ্টি দাও, আমাদের মুক্ত করো, যেমন কেউ বাঁধা ধনভাণ্ডার থেকে মুক্তি দেয়।’ আমি যখন ধনসম্পদ স্তব করি, বা চিন্তা করি, বা যজ্ঞের দ্বারা দুই জগতের সন্ধান করি; যখন আমি যুদ্ধে ধনসম্পদশালী দ্রুতগামীদের আহ্বান করি, বা যারা শ্রুতিময় তাদের ডাকি—তাদের মধ্যে মহাশক্তিমান আকাশকে আহ্বান করেন, গৌরবময় চিত্তে পৃথিবীর দিকে আসেন। যেখানে দেবতারা মঙ্গলার্থে কার্য করেন, স্বর্গ তার শক্তিতে স্থান করে দেয়। এই স্তোত্র তাদের জন্য, যারা নম্রদের ধন দান করেন, যারা চিন্তা ও যজ্ঞ সম্পাদন করেন, তারা যেন আমাদের বাসুদের ধন দান করেন। সেই দূর দেশে, ইন্দ্রপুত্ররা প্রয়াসী হয়, যারা বিশাল, গোসমৃদ্ধ বিস্তৃতি পার হতে চায়। বহু পুত্র একযোগে প্রচেষ্টায়, মহৎ, সহস্রধারা বিশাল গাভীকে দোহন করতে চায়। তোমরা শচীর মতো ইন্দ্রকে তোমাদের সহায়ক করো—অজেয়, শত্রুদের যুদ্ধে দমনকারী, দানশীল, প্রশংসিত মঘবন, যিনি বজ্রধারী। যখনই ইন্দ্র, বৃত্রনাশক, প্রাচীন গৌরবময় নাম ধারণ করেন, পুরুপুত্র, শক্তিশালী প্রভু, তখন আমরা তাকে এই কর্মে আহ্বান করি। এখন কবি সূর্যের গৃহে জলের পরম মহিমা ঘোষণা করেন। সাত নদী ত্রিবিধ পথে প্রবাহিত হয়েছে, সিন্দু তাদের সবার মধ্যে বেগে শ্রেষ্ঠ। বরুণ তোমার জন্য পথ উন্মুক্ত করেছেন, হে সিন্দু, যখন তুমি তোমার তরঙ্গে ছুটে চল। তুমি পৃথিবীর ঢাল বেয়ে, শিখরে, গমন করো, তুমি চলমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আকাশে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়, পৃথিবীর ওপরে উঠে; সে তার দীপ্তিতে অপরিমেয় শক্তি প্রকাশ করে। মেঘ থেকে বৃষ্টির গর্জনের মতো, নদী যখন আসে, সে ষাঁড়ের মতো গর্জন করে। তোমার কাছে, হে নদী, মাতারা বাছুরের ন্যায় ছুটে আসে, গাভীর মতো দুধের জন্য ডাকে। রণাঙ্গনে রাজার মতো, তুমি তাদের পথ দেখাও; যখন তুমি ছুটো, কাউকে পিছনে ফেলে দাও না। গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, শতদ্রু ও পরুষ্ণি আমার এই স্তবের অংশীদার হোক; আমাকে শুনো, অসিক্নী, মরুদ্বৃধা, বিতস্তা, অর্জিকীয়া ও সুশোমা। ত্রিষ্টামা, সুষার্তু, রসা, শ্বেতা, কুভা, গোমতী ও ক্রুমু—তোমরা, মহাশক্তিধর নদীগণ, তোমাদের রথে অগ্রসর হও। তুমি, নদী, দ্রুতগামী ও দীপ্তিময়, মহিমায় মহান, পুরাতনকে বহন করো, ভূমিকে আন্দোলিত করো। অব্যর্থ নদী, তুমি বাধা দূর করো, অপূর্ব রূপ প্রকাশ করো, দীপ্তিময় অশ্বের মতো। নদী অশ্বে সমৃদ্ধ, রথে শোভিত, সৌন্দর্যে অলংকৃত, সোনার মতো দীপ্ত, বলশালী। সে কুন্তলা, নবীন, সদাচারী, সত্যিই সে মধুর সমৃদ্ধি বহন করে। নদী অশ্বিনদের জন্য মসৃণ রথ জুড়ে দেয়; সেই রথে সে প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়। আজ তার মহিমা স্তবিত—অব্যর্থ, গৌরবময়, দীপ্তিময়। হে মরুৎগণ, শক্তির প্রভাতে এসো; ইন্দ্র, মরুৎগণ, তোমরা দুই জগতকে আচ্ছাদিত করো। দিবা ও রাত্রির মতো আমাদের সঙ্গে থেকো, আমাদের আসন, গৃহ ও আলোকপথ দাও। সেই উৎকৃষ্ট সুরা প্রস্তুত করো; দক্ষ রথচালকের মতো পাথর রস নিংড়ে দেয়। হে মহারথী, বিজয়, বীর্য, মহাধন ও দ্রুতগামীদের জ্ঞান দাও। সেই সুরা তার জন্য ঢালা হয়েছে, পূর্বের মতো, মনুর জন্য পথের মতো। গোশালায়, অশ্বগৃহে, যজ্ঞস্থলে, উপাসকরা তাকে খুঁজে পায়। অশুভ শক্তি দূর করো, বিনাশকারীকে চূর্ণ করো, অমঙ্গল প্রতিহত করো, অজ্ঞানতা অপসারিত করো। আমাদের জন্য বীরসহ ধন ঢেলে দাও, হে দেবগণ; হে পাথরগণ, ভারতগণের জন্য গীত আনো। আকাশ থেকেও তোমরা অধিক শক্তিশালী; দীপ্তিমানদের মধ্যেও তোমরা শ্রেষ্ঠ। বায়ু, সোম, অগ্নি, পিতৃদের থেকেও তোমরা শ্রেষ্ঠ। গৌরব ও শক্তিতে পূর্ণ পাথর আমাদের জন্য আন্দোলিত হোক; তাদের কণ্ঠে স্বর্গে ধ্বনি উঠুক। যেখানে মানুষ চাহিত মধু আহরণ করে, উচ্চস্বরে ঘোষণা করে, একত্রে প্রয়াসী হয়। পাথরগণ সোম নিংড়ে দেয়, রথচালকরা প্রতিযোগিতার জন্য রস আহরণ করে। তারা দুধের বাট দোহন করে ঢালার জন্য; পুরুষেরা হাতে হাতে আহুতি প্রস্তুত করে। এই যজ্ঞকুশল পুরুষেরা হয়ে উঠেছে; তোমরা, পাথরগণ, ইন্দ্রের জন্য সোম নিংড়াও। প্রত্যেকে, দেবালয় ও পৃথিবীর জন্য, যিনি আহুতি দেন তাঁর জন্য ধন নিংড়াও। মেঘ থেকে যেমন বৃষ্টি পড়ে, তাদের বাক্য তেমনি ধন বর্ষণ করে; যজ্ঞে দক্ষ পুরোহিতের মতো। মরুৎগণের স্তোত্রের মতো, তুমি প্রশংসার যোগ্য; আমি তাদের সঙ্গ প্রশংসা করি, তুমি তাদের মধ্যে দীপ্তিমান। যুবকেরা গৌরবের জন্য সাজে, মরুৎদের মতো, বহু দীপ্তিময় রাত্রির জন্য। স্বর্গপুত্র, তারা বাধাহীন; আদিত্যরা কখনো ক্লান্ত হয় না। যারা সূর্যের মতো স্বর্গ ও পৃথিবী থেকে দীপ্তি ছড়ায়, স্বশক্তিতে, সূর্য মেঘ সরানোর মতো। নায়কের মতো বলশালী, গৌরবময়, যুবকের মতো নির্দোষ, সদা অগ্রসর। তোমার গভীরে, জলের শয্যায়, কিছু ছিন্ন হয় না, মহৎ কিছু ভাঙে না; সর্বব্যাপী যজ্ঞ তোমার কাছে আসে, আহুতি নিয়ে, যেমন সঙ্গীরা সভায় একত্র হয়। তোমরা জোয়াড়ে জুড়ে দাও, দীপ্তিময়, প্রভাতে; ঈগলের মতো, স্বপ্রভ, তীব্র, পথিকের মতো দ্রুত, সর্বব্যাপী। যখন তোমরা, হে মরুৎগণ, দূর থেকে সাম্বরণের মহাধন আনো, দানশীলের ধন জানো, তখনো ঘৃণা দূর করো। যে ব্যক্তি যজ্ঞাগ্নি জ্বালানোর সময় মরুৎদের আহুতি দেয়, সে মানুষ নয়; সে ধনবান, শক্তিশালী সন্তান লাভ করে; সে দেবতাদের আশ্রয়ে থাকে। তারা যজ্ঞে যোগ্য, আদিত্য নামে সর্বদয়; তারা আমাদের রথাকাঙ্ক্ষী চিন্তা রক্ষা করুক, যজ্ঞে মহিমায় চলুক, আনন্দিত। তারা অনুপ্রাণিত ঋষির মতো, স্বনিয়ন্ত্রিত, দেবতাদের মতো যজ্ঞে জাগ্রত; দীপ্তিমান রাজাদের মতো, সুপ্রতিষ্ঠিত, নির্দোষ যুবকের মতো। অগ্নির মতো দীপ্তিমান, সোনার বক্ষবিশিষ্ট; বায়ুর মতো স্বয়ংযুক্ত, চিরসক্রিয়; জ্ঞানী বৃদ্ধের মতো, উত্তম পথপ্রদর্শক, উত্তম আশ্রয়, সত্যের জন্য প্রয়াসী সোমের মতো। বাতাসের মতো দ্রুত, আন্দোলিত, গমনশীল; অগ্নিশিখার মতো দীপ্তিমান; সজ্জিত বীরের মতো বলশালী; পূর্বপুরুষদের স্তোত্রের মতো দানশীল। রথের চক্র ও দণ্ডের মতো স্থিতিশীল; বীরের মতো যুদ্ধে জয়ী; নির্বাচিত যুবকের মতো ঘৃতসিক্ত; গায়কগণের মতো সুরে স্তোত্র গাওয়া। এভাবেই ঋগ্বেদের এই স্তোত্রসমূহে দেবতাদের মহিমা, নদীর গৌরব, যজ্ঞের শুভাশিস এবং মানবজীবনের আশীর্বাদ এক অখণ্ড ধারায় প্রবাহিত হয়।