একদিন, এক জ্যোতির্ময় প্রভাতে, এক ঋষি তাঁর হৃদয়ের গভীর থেকে প্রার্থনা করলেন—তিনি কামনা করলেন, যেন পিতামাতার জ্ঞান তাঁদের পুত্রের মাঝে বিস্ময়করভাবে উদিত হয়, যেন সেই শিক্ষা সকল বিস্ময়ের চেয়েও আশ্চর্য হয়। তিনি দেখলেন, উৎসাহী স্ত্রী তাঁর স্বামীকে ভালোবাসা ও যত্নে ধারণ করেন, আর সেই সজ্জিত, মহৎ দম্পতি যেন সৌভাগ্যকে সঙ্গে নিয়ে চলে। ঋষি অনুভব করলেন, চারিদিকে এক উজ্জ্বল আসন—যেখানে গাভীরা, দুধ দেওয়া গাভীর মতো, জোয়াল নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখন গো-সমূহের জননী, সেই প্রাচীনতমা, সাতরূপী বাক্ বা শব্দকে জন্ম দিলেন। ঋষি বললেন, “আমি তোমাদের দেবতাদের উপযুক্ত আবাস জানালাম; তুর্বণি একা রুদ্রদের সঙ্গে চলেছেন। তাদের মাঝে বৃদ্ধাবস্থা কিংবা মৃত্যু থাকলেও, এই অগ্নিশিখাগুলোর জন্য মধু বর্ষিত হোক।” তিনি স্মরণ করলেন, দেবতাদের ঋত বা নিয়মের রক্ষক, যিনি জলে গোপনে অবস্থান করেন, তাঁকে কথা শুনিয়েছেন। ইন্দ্র, সব জেনে, সেই জ্ঞান ব্যাখ্যা করেছেন; সেই শিক্ষার দ্বারা, হে অগ্নি, আমি এসেছি। ঋষি উপলব্ধি করলেন, কেউ যদি ক্ষেত্র না চিনে, কিন্তু যিনি জানেন, তাঁর দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে সে সঠিক পথ খুঁজে পায়। এটাই শিক্ষার কল্যাণ—জ্ঞানীর নির্দেশনায় সোজা পথ পাওয়া যায়। আজ, জীবিত ব্যক্তি এই আহার গ্রহণ করেছে; তৃপ্ত হয়ে, সে বড় হয়েছে, মায়ের দুধে পুষ্ট হয়েছে। সে যুবক হয়েও বার্ধক্যে পৌঁছেছে; উদারচিত্ত, শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সেই ব্যক্তি ক্লান্ত। ঋষি আবার বললেন, “এসো, হে কুরুশ্রবণ, আমরা এই শুভ যজ্ঞ সম্পাদন করি, প্রচুর দান দিই। দাতারা যেন সদা দানশীল হন; আমার হৃদয়ে ধারণ করা সোম যেন তেমনই হয়।” এরপর ঋষি অনুভব করলেন, “আমাকে কেউই মানুষের মাঝে বেঁধে রাখেনি; পুষণের সহায়তা ছাড়াই আমি এগিয়ে চলেছি। এখন, সমস্ত দেবতারা আমাকে রক্ষা করুন; অধর্মীদের আর্তনাদ উঠেছে।” চারিদিকে শত্রুরা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে, যেন প্রতিদ্বন্দ্বী স্ত্রীরা তাঁর শরীরের পাঁজরকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। অসহায়ত্ব তাঁকে গ্রাস করছে; নগ্নতা লজ্জা দিচ্ছে, আর তাঁর মন কাঁপছে, কাঁপা ঘোড়ার মতো। ঋষি আবার প্রার্থনা করেন, “হে শতশক্তিমান, ইঁদুরের মতো যারা আপনার গায়ককে কষ্ট দিচ্ছে, একবার, হে দানবীর ইন্দ্র, আমাদের প্রতি কৃপা করুন; পিতার মতো আমাদের রক্ষা করুন।” তিনি বেছে নিলেন কুরুশ্রবণ, রাজা ত্রাসদস্যুকে, দানশীলদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, জ্ঞানী হিসেবে। তাঁর রথ তিনটি বাদামী ঘোড়ায় টানা, সুপরিচালিত; তাঁর প্রশংসা হয় হাজার দানবিশিষ্ট যজ্ঞে। যার মধুর গান তাঁর পিতা উপমশ্রবণের মতো, সেই ক্ষেত্রকে সমৃদ্ধ ঘোষণা করেছে। ঋষি উপমশ্রবণ, মিত্রাতিথির বংশধর, তাঁর প্রতি আহ্বান জানালেন; তিনি বললেন, “আমি তোমার পিতারও সম্মান করি।” ঋষি কামনা করলেন, “যদি আমি অমর কিংবা মর্ত্যদের ওপর শাসন করতে পারি, তবে দানশীল সেই ব্যক্তি আমার জন্য দীর্ঘজীবী হোক।” তিনি উপলব্ধি করলেন, শত প্রাণ থাকলেও কেউই দেবতাদের বিধির বাইরে যেতে পারে না; সেই নিয়মেই সবাই বাঁধা। এবার এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা আসল। ঋষির সামনে উপস্থিত হলো শক্তিশালী বিভীদক ফলের তৈরি পাশা। শুকনো মাটিতে গড়িয়ে, এগুলো তাঁকে আনন্দ দিল। মুজবত সোমের মতোই সুস্বাদু, প্রাণবন্ত পাশাগুলো তাঁকে উদ্দীপ্ত করল। ঋষি অনুভব করলেন, “সে কখনো আমাকে তিরস্কার করেনি, প্রত্যাখ্যানও করেনি; আমার বন্ধুদের এবং আমাকেও সদয় থেকেছে। কিন্তু এক পাশার জন্য, আমি আমার অনুগত স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়েছি, আর সে কেঁদেছে।” শ্বাশুড়ি তাঁর পুত্রবধূকে অপছন্দ করেন, তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করেন; নিঃস্ব মানুষ খুঁজে পায় না কোনো সান্ত্বনা। সেবায় ক্লান্ত বৃদ্ধ ঘোড়ার মতো, জুয়াড়ির জয়ে ঋষি কোনো আনন্দ পান না। অন্যেরা সেই উদগ্রীব জুয়াড়ির স্ত্রীকে স্পর্শ করে, সে পাশার জন্য আকুল। পিতা, মাতা, ভাইয়েরা বলে—“আমরা তাকে চিনি না; তাকে নিয়ে যাও, সে বাঁধা।” ঋষি বললেন, “আমি সংকল্প করলেও, অন্যদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করিনি; যারা চলে গেছে, তাদের থেকে পিছিয়ে পড়েছি। বাদামী পাশা কথা বলেছে; আমি তাদের আসরে যাই, যেন স্ত্রী তার প্রেমিকের কাছে যায়।” জুয়াড়ি সভায় প্রবেশ করে, জিজ্ঞেস করে—“আমি কি জিতব?”—তাঁর শরীর কাঁপে। কিন্তু পাশা তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে চলে; জয় অন্যের হাতে তুলে দেয়। পাশাগুলো, তাদের কাঁটা ও শলাকা দিয়ে, মানুষকে যন্ত্রণা দেয়, জ্বালায়; প্রতারক, দহনকারী, তারা পোড়ায়। খেলোয়াড় ছেলেদের মতো, তারা পরাজিতকে নিয়ে হাসে; মধু-লেপিত, তারা জুয়াড়িকে মহিমান্বিত করে। তিপ্পান্নটি পাশা, একসঙ্গে খেলে, দেবতা সবিতার মতো নিজ নিজ নিয়মে চলে; কঠোররাও জুয়াড়িকে মাথা নোয়ায় না, কিন্তু রাজাও তাদের সম্মান করে। তারা নিচে চলে, ওপরে লাফায়; হাত না থাকলেও, তারা হস্তধারীকে জয় করে। দেবীয় পাশা, শীতল হয়েও, শুকনো মাটিতে পড়লে হৃদয় পোড়ায়। জুয়াড়ির স্ত্রী কষ্ট পায়, পরিত্যক্ত; তাঁর মা জিজ্ঞেস করেন—“সে কোথায়?” ঋণে, ভয়ে, ধনলাভের আশায়, সে রাতে অন্যের কাছে যায়। নারীকে দেখলে, জুয়াড়ি উত্তেজিত হয়; সে অন্যের স্ত্রী ও সৌভাগ্য কামনা করে। সকালে সে নিজের বাদামী ঘোড়া সাজায়, কিন্তু খেলার শেষে, সমাজবহির্ভূত আগুনের সামনে লুটিয়ে পড়ে। ঋষি একদিন বললেন, “তোমাদের মধ্যে যে প্রধান, সেই নেতার কাছে আমি বলি—আমি তোমার ধন চাই না, দাবি করি না; দশ দিন ধরে আমি পূর্বদিকে মুখ করে এই সত্য বলি।” তিনি উপদেশ দিলেন, “পাশা নিয়ে খেলো না; ক্ষেত চাষ করো, ধনে আনন্দ পাও, নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবো। সেখানে গবাদি পশু আছে, জুয়াড়ি, আছে তোমার স্ত্রী; এইভাবেই সবিতা, মহৎ দেবতা, আমাকে দেখান।” ঋষি আবার বললেন, “বন্ধুত্ব করো, আমাদের প্রতি সদয় হও; কঠোর মন নিয়ে এসো না। তোমার ক্রোধ বা শত্রুতা যেন আমাদের স্পর্শ না করে; পাশার প্রতি অন্যের আসক্তি আমাদের থেকে দূরে থাকুক।” এরপর ঋষি প্রার্থনা করলেন—“ইন্দ্রশক্তিসম্পন্ন অগ্নিরা, প্রভাতের আলো বহন করে আসো। মহান স্বর্গ ও পৃথিবী, শোনো; আজ আমরা দেবতাদের কৃপা চাই।” “স্বর্গ ও পৃথিবী, মাতৃসম নদী, পর্বত, আশ্রয়স্থল থেকে আমরা কৃপা চাই। সূর্য ও উষা থেকে নির্দোষতা কামনা করি; আজ যে সোম নিঙড়ানো হয়েছে, তা আমাদের মঙ্গল করুক।” “স্বর্গ ও পৃথিবী, আমাদের মহান মাতৃসম, আজ আমাদের রক্ষা করো, কল্যাণের জন্য। উষা উদিত হয়ে অশুভ দূর করুক; অগ্নিকে আহ্বান করি, কল্যাণের জন্য জ্বালানো হোক।” “এই প্রথম, দ্যুতিময়, আশীর্বাদপুষ্ট প্রভাত আমাদের জন্য উদিত হোক, দানশীলদের জন্য উপহারসমৃদ্ধ। দুষ্টদের ক্রোধ যেন আমরা দূরে রাখি; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” “যারা সূর্যের কিরণে প্রবাহিত, প্রভাতের আলো বহন করে—তারা আজ আমাদের গৌরবের জন্য দীপ্ত হোক; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” “উষাগুলো আমাদের জন্য অসুখমুক্ত হয়ে চলুক; অগ্নিগুলো মহাজ্যোতিতে জ্বলে উঠুক। অশ্বিনরা দীর্ঘজীবনের জন্য তাঁদের রথ সাজাক; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” “হে সবিতা, আজ আমাদের সর্বোত্তম, শ্রেষ্ঠ অংশ দাও, কারণ তুমি ধনদাতা। ধিষণা, ধনের জননীকে ডাকছি; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” “দেবতাদের সত্য বাক্য, যা আমরা মনুষ্যরা অবহেলা করেছি, তা যেন আমাদের ক্ষতি না করে। সকল উষা উদিত, সূর্য জাগে; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” “আজ আমরা শত্রুমুক্ত হয়ে কুশ বিছাই; পাথরের সভায় আমরা মন দিয়ে চেষ্টা করি। আদিত্যদের আশ্রয়ে দৃঢ় থাকো; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” “হে দেবতারা, আমাদের কুশাসনে এসো, সভায় সাত পুরোহিতকে বসাও। ইন্দ্র, মিত্র, বরুণ, ভাগকে আহ্বান করি; কল্যাণের জন্য অগ্নিকে আহ্বান করি।” এইভাবে, ঋষি তাঁর অন্তরের কথা, জীবনযাত্রার শিক্ষা, দুঃখ-সুখ, উপদেশ আর দেবতার প্রতি নিবেদন এক মহান ধারায় প্রবাহিত করলেন—যাতে মানুষ সত্য, কল্যাণ ও দেবতার আশীর্বাদে জীবন পরিচালিত করতে পারে।