ঋগ্বেদের এই স্তোত্রগুচ্ছ আমাদের নিয়ে যায় এক মহিমান্বিত যজ্ঞস্থলে, যেখানে দেবতা, ঋষি ও মানুষ একত্রে অগ্নি ও সোমকে আহ্বান করছেন। প্রথমেই, অগ্নিকে স্মরণ করা হয়—তাঁকে যিনি মায়েরা, দেবতারা ও অঙ্গিরসরা একত্রে উৎপন্ন করেছেন, যিনি ঋষি, যিনি অমর, যিনি হোমের বাহক। অগ্নি, যিনি জ্ঞানী, যিনি ঋষিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তাঁকে নির্বাচিত দূতরূপে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, যিনি সর্বদা আহুতিকে দেবতাদের কাছে বহন করেন। যজ্ঞকারী বলেন, “আমার কাছে বলি দেবার গাভী নেই, কিছু গোপন করারও কিছু নেই; তবু আমি যা পারি, তা-ই তোমাকে নিবেদন করি।” যে কাঠ আমরা তোমার জন্য জ্বালাই, হে অগ্নি, তুমি সেগুলো গ্রহণ করো, হে নবীনতম দেবতা। যে উপজিহ্বিকা খায়, বা যার ওপর পিঁপড়ে হেঁটে যায়, সেইসবও যেন তোমার জন্য ঘৃত হয়। যে মানুষ মন ও চিন্তায় অগ্নিকে প্রজ্জ্বলিত করে, সে দেবতাদের সঙ্গে অগ্নিকে প্রশংসা করে। অগ্নি—যিনি পথের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী, যাঁর মধ্যে ধর্ম স্থাপিত—তাঁর কাছে আমাদের স্তোত্র পৌঁছায়। দেবতারা, বিশেষত দিবোদাসপুত্র অগ্নি, আমাদের দিকে মনোযোগ দেন; তিনি তাঁর মাতা পৃথিবীকে বিস্তৃত করে আকাশের চূড়ায় অবস্থান করেন। তাঁর সামনে জাতিগুলো ভয়ে কাঁপে, তাঁকে যারা স্তব করে, তারা মন দিয়ে অগ্নিকে সম্মান জানায়, যিনি হাজার ধনের অধিকারী। অগ্নি যাকে ধন দিতে চান, যিনি তাঁকে সেবা করেন, তিনি বীর সন্তান, স্তোত্রগায়ক ও হাজারজনকে পালনকারী হন। তিনি দুর্গও জয় করেন, পুরস্কার জেতেন, অবিনশ্বর খ্যাতি লাভ করেন। অগ্নি, চিরযুবা দেবতা, তোমার মধ্যেই আমরা সকল কাম্য বস্তু কামনা করি। অগ্নি, যিনি সকল ধনের দাতা, যিনি জনতার প্রিয় পুরোহিত, তাঁরই প্রথম পাত্রে মধু পড়ে। আমাদের স্তোত্র তাঁর উদ্দেশে উৎসর্গিত। যেমন রথে জোতা ঘোড়া, তেমনি দেবতাসদৃশ উদার যুবকেরা তোমার স্তব শুনে উদ্দীপ্ত হয়। হে সর্বশক্তিমান, আমাদের সন্তান ও বংশ দাও, দানশীলদের ধন দাও। অগ্নি, যিনি সর্বোচ্চ, মহান, ঋতধারী ও দীপ্তিমান, তাঁর প্রশংসা করো। যিনি বীরত্বের জন্য খ্যাত, যিনি আহ্বানে আসেন, যেন তাঁর সদ্যকৃপা আমাদের ধনে ভরিয়ে দেয়। অগ্নি, যিনি প্রিয়তম অতিথি, রথের পথপ্রদর্শক, তাঁকে প্রশংসা করো। অগ্নি, যিনি উদিত ও অস্ত যান, যিনি ধন জানেন, যিনি যজ্ঞযোগ্য, তিনি অগ্রসর হন। জ্ঞানী যজ্ঞকারীর পথ সহজ হয়। হে অগ্নি, দানশীল, বহু প্রশংসিত অতিথি, তুমি আমাদের কিছু কেড়ে নিও না—তুমি উত্তম পুরোহিত, সঠিক আচরণকারী। আমাদের সত্যবাক্য থেকে, এমনকি অন্য দেবতা থেকেও, তোমার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, হে অগ্নি। দরিদ্র মানুষও তোমাকে বার্তাবাহক হিসেবে আহ্বান করে, কারণ তুমি সঠিক আচরণ করো। অগ্নি, মারুৎ ও রুদ্রদের সঙ্গে এসে সোম পান করো, আমাদের শুভ স্তোত্রে আনন্দিত হও, তোমার পরিবারসহ। এবার সোমের দিকে দৃষ্টি যায়। সোম, তুমি প্রবাহিত হও আনন্দদায়ক, উৎফুল্ল ধারায়, ইন্দ্রের পান করার জন্য পেষিত হয়ে। তুমি অসুরনাশক, মানুষের মধ্যে সর্বব্যাপী, নিজের উৎসে পৌঁছেছ এবং কাঠের পাত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছ। তুমি প্রশস্ত ও শক্তিশালী হও, বৃত্রনাশক, দানশীলদের ধন দাও। তুমি প্রবাহিত হও মহাদেবতাদের সভায়, আমাদের শক্তি ও খ্যাতি দাও। ইন্দু, আমরা প্রতিদিন তোমার কাছে আসি, আমাদের আশা তোমাতেই। সূর্যকন্যা তোমার প্রবাহমান সোমকে চিরস্থায়ী বস্ত্র দিয়ে বিশুদ্ধ করেন। দশ কুমারী, বোনের মতো, আকাশে দূরে তোমাকে ধারণ করে। কঠিনরা তোমাকে পেষণ করে, তারা মধুময় ত্রিস্তর রস প্রবাহিত করে। অব্যক্ত গাভীগুলো তোমাকে ছেঁকে, ইন্দ্রের জন্য বাছুর সোমকে প্রস্তুত করে। ইন্দ্র, উৎসাহে সমস্ত শত্রু বিনাশ করেন; বীর উপহার পেয়ে আনন্দিত হন। সোম, তুমি দেবশক্তিতে প্রবাহিত হও, ছাঁকনি দিয়ে, ইন্দ্রের সঙ্গে এসো। মহাশক্তিশালী সোম, তোমার মহান ধারা প্রবাহিত করো, চিরস্থায়ী গৃহে প্রবেশ করো। পেষিত, প্রেরিত সোমের ধারা প্রিয় মধু দোহন করেছে; তুমি, জ্ঞানী, জলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছ। বৃহৎ নদীগুলো তোমার পেছনে চলে, যখন তুমি গাভীতে সজ্জিত হও। সমুদ্র নিজেকে জলে বিশুদ্ধ করেছে, আকাশের স্তম্ভ ও সমর্থন; ছাঁকনিতে বিশুদ্ধ সোম উৎসুক হয়ে ওঠে। মহাশক্তিশালী, হলুদ সোম গর্জন করে, মিত্রের মতো অদৃশ্য, সূর্যের সঙ্গে দীপ্তি ছড়ায়। তোমার শক্তিতে, হে ইন্দু, স্তোত্রসমূহ বিশুদ্ধ হয়, সেই শক্তিতে তুমি নিজেকে অলংকৃত করো। তোমার উৎফুল্লতার জন্য আমরা তোমাকে খুঁজি, দ্রুতগামী, জগতের স্রষ্টা, তোমার স্তোত্র মহান। আমাদের জন্য, ইন্দু, তোমার ধারায় ইন্দ্রের জন্য মধুময় রস বর্ষা-মেঘের মতো ঢেলে দাও। তুমি, ইন্দু, গাভী, মানুষ, ঘোড়া, বল—সবকিছুতে সমৃদ্ধ; তুমি যজ্ঞের চিরন্তন আত্মা। এইভাবে, অগ্নি ও সোমের প্রশস্তিতে যজ্ঞস্থল মুখরিত হয়, দেবতা ও মানুষ একত্রে তাঁদের কৃপা ও ধন লাভের আশায় স্তোত্র পাঠ করেন।