একদিন, যজ্ঞে নিবেদিত, দানশীল মানুষের জন্য দেবতাদের কাছে প্রার্থনা করা হলো—তাদের যেন শুভ বুদ্ধি ও সঠিক পথনির্দেশ লাভ হয়, যেন দুধ ও ঘৃতের স্রোতধারা প্রবাহিত হয়। তখন আহ্বান জানানো হলো অশ্বিন যুগলকে—তাদের দ্রুতগামী বাজপাখি ও ঘোড়াসহ যেন তারা এই স্তবগীতিতে দ্রুত উপস্থিত হন। অশ্বিনদ্বয় সেই তিন উজ্জ্বল স্বর্গীয় ক্ষেত্র অতিক্রম করে, সমস্ত দিক-দিগন্ত পার হয়ে, মানুষের ডাকে সাড়া দেন। তাদের কাছে অনুরোধ করা হলো—তারা যেন দিব্যদাতা, প্রচুর গবাদি পশু, সমৃদ্ধি ও যাত্রাপথ উন্মুক্ত করেন। আরও চাওয়া হলো—তারা যেন গরু, বলবান পুরুষ, দ্যুতিময় রথ, বহু ঘোড়াসহ সম্পদ নিয়ে আসেন। অশ্বিনদ্বয়, যাঁরা সৌন্দর্যের অধিপতি, চমৎকার, সোনালি চাকার রথে আরোহণ করেন, তাঁদের জন্য মধুময় সোমার আহ্বান জানানো হয়। তাঁদের কাছে প্রার্থনা—তাঁরা যেন অশ্ব-সম্পদে ও দানশীলদের রক্ষা করেন, প্রশংসায় আনন্দিত হয়ে সর্বত্র সুরক্ষা দেন। অশ্বিনদ্বয়কে বারবার ডাকা হয়—তাঁরা যেন মানুষের প্রার্থনার কাছে আসেন, অন্যত্র না গিয়ে এখানে ত্বরিত উপস্থিত হন। তাঁদের বলা হয়—এই মধুময় উপহার, এই উজ্জ্বল রথের অধিপতি, তোমরা পান করো। আমাদের জন্য শতগুণ, সহস্রগুণ, সকলের উপকারে আসে—এমন সম্পদ নিয়ে এসো। মানুষ নানা স্থানে, জ্ঞানীগণ, অশ্বিনদ্বয়কে আহ্বান করেন—তাঁদের স্তবগীতিতে, অর্ঘ্য ও কুশাসনে সজ্জিত হয়ে, অশ্বিনদ্বয়কে ডাকা হয়। আজকের এই শ্রেষ্ঠ, অন্তরঙ্গ স্তব যেন তাঁদের কাছে পৌঁছায়, তাঁদের সঙ্গে থাকে। অশ্বিনদ্বয়কে আহ্বান—তাঁদের জন্য রাখা মধুর পাত্র থেকে পান করুন, মানবদের মধ্যে রথারোহী দেবতারা। তাঁদের অনুরোধ—অশ্বদানকারী দেবদ্বয় যেন গবাদি পশু, সন্তান, গাভী ও পুষ্টি নিয়ে আসেন। তাঁরা যেন স্বর্গ ও প্রবাহিত নদী থেকে আশীর্বাদ দেন, যেন দরজা খুলে তা বর্ষণ করেন। তখন প্রশ্ন ওঠে—তুগ্রপুত্র যখন সমুদ্রযাত্রায় যায়, তখন কি তাঁরা তাঁকে ত্যাগ করবেন? কিংবা তাঁদের রথ কি কখনও ভেঙে যাবে? অশ্বিনদ্বয় বরাবরই দানশীল কান্বকে তাঁর গৃহে সদা সাহায্য করেছেন। তাঁদের আহ্বান—নতুন, সর্বশ্রেষ্ঠ সাহায্য নিয়ে আসুন, যেভাবে কান্ব, অত্রি ও শিঞ্জরকে রক্ষা করেছিলেন। যেমন গাভীদের মধ্যে সোমার জন্য অগস্ত্য, পুরস্কারের প্রতিযোগিতায় সোভরিকে সাহায্য করেছিলেন, তেমন বা তার চেয়েও বেশি করুন। অশ্বিনদ্বয়ের রথের কথা বলা হয়—তার জোয়াল, লাগাম, অক্ষ, চাকা—সবই সোনার; তাঁরা সে রথে আরোহণ করে আকাশ ছুঁয়ে যান। সেই রথে, অশ্বদানকারী দেবদ্বয়, দূর থেকেও আসুন, এই শুভ স্তব গ্রহণ করুন। তাঁরা বহু উপহার, পুষ্টি নিয়ে দূর থেকে আসেন—অমর অশ্বিনদ্বয়। তাঁদের আহ্বান—জয়, খ্যাতি, ঐশ্বর্য নিয়ে, সকলের আগে দীপ্তি নিয়ে আসুন। তাঁদের ডাকা হয়—ডানা-ওয়ালা, বৃষ্টি-আনয়নকারী পক্ষী যেন তাঁদের এই পূজার আসরে নিয়ে আসে। গীতিসঙ্গীতের সঙ্গে সেই রথ চলে, তার চাকা কখনও থামে না। সোনালি রথ, দ্রুত হাত ও ঘোড়াসহ, অশ্বিনদ্বয় চিন্তিত হয়ে ছুটে আসেন। তাঁরা চঞ্চল হরিণ বা বলবান, ধনী বৃষের প্রতি আনন্দ পান; তাঁদের কাছে প্রার্থনা—পুষ্টি ও সম্পদ দিন। তাঁদের স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—যেমন উদার চৈদিয় শত উট ও দশ হাজার গাভী দান করেছিলেন, তেমন নতুন উপহার দিন। চৈদিয় দশজন স্বর্ণসম রাজা দান করেছিলেন—তাতে তাঁর কিছুই কমেনি; তাঁর অধীনে প্রজারা সুখে ছিল, বহুজন তাঁর চারপাশে সমবেত হতো। তখন বলা হয়—এই পথে যেন কেউ আমার সঙ্গে না চলে, কারণ চৈদিয়রা এগিয়ে যায়; অন্য কেউ নেতা না হলেও, যিনি অধিক দান করেন, তিনিই শ্রেষ্ঠ। এবার ইন্দ্রের কথা ওঠে—তাঁর শক্তি অপরিসীম, বৃষ্টিদাতা পার্জন্যের মতো, তিনি বাছুরের স্তবগীতে বলবান হন। অমর সন্তানদের পুষ্টি দেন, অগ্নির বাহনে সত্যের রথে যাত্রা করেন। কান্বরা যখন ইন্দ্রকে স্তবগীতে আহ্বান করেন, তিনি যজ্ঞসিদ্ধ হন, অস্ত্রকেও আত্মীয় মনে করেন। তাঁর ক্রোধে সমস্ত জাতি মাথা নত করে—নদীর মতো সমুদ্রে গিয়ে মিশে যায়। তাঁর শক্তি ও দীপ্তি এমন, তিনি আকাশ ও পৃথিবীকে চামড়ার মতো বেষ্টন করেন। তিনি শত সংযোগবিশিষ্ট বজ্র দিয়ে প্রতিরোধকারী বৃত্রর মস্তক চূর্ণ করেন—তাঁর অসীম বলের দ্বারা। এভাবেই দেবতাদের মহিমা, তাঁদের দান, তাঁদের রক্ষা এবং তাঁদের প্রতি মানুষের স্তব ও প্রার্থনা এই কাহিনিতে একাকার হয়ে ওঠে।