একদিন, ঋষি বসিষ্ঠ এবং তাঁর সঙ্গীরা এক মহাসমারোহে যজ্ঞে বসে দেবীদের উদ্দেশ্যে ভক্তিপূর্ণ নিবেদন করলেন। প্রথমেই তাঁরা কৃপাময়ী, প্রসিদ্ধা ও ধনদায়িনী সরস্বতীর প্রতি নিবেদন জানালেন। তাঁরা বললেন, “হে সরস্বতী, যাঁরা যথাযথভাবে পূজা জানেন, তাঁদের সঙ্গে আমাদের এই শ্রদ্ধাভরা আহ্বান গ্রহণ করুন। আপনার কৃপায় আমাদের এমন ঐশ্বর্য দিন, যা আমাদের বন্ধুদেরও ছাড়িয়ে যায়।” তাঁরা আরও বললেন, “আমরা যে শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিয়ে এই অর্ঘ্য নিবেদন করছি, সরস্বতী, আপনি আমাদের প্রশংসা গ্রহণ করুন। আপনার প্রিয়তম আশ্রয় আমাদের উপর রাখুন, যেন আমরা বৃক্ষতলে আশ্রয় নেওয়ার মতো আপনার সান্নিধ্য লাভ করি।” বসিষ্ঠ তখন সরস্বতীর প্রশস্তির দ্বার খুলে দিলেন। তিনি বললেন, “হে বিশুদ্ধা, আপনি যিনি প্রশংসিত হন, আমাদের শক্তি দিন, সর্বদা আশীর্বাদ দিয়ে আমাদের রক্ষা করুন।” এরপর বসিষ্ঠ সরস্বতীর উদ্দেশ্যে এক মহান স্তোত্র গাইলেন—তিনি নদীর দেবী, মহাশক্তিময়ী। বসিষ্ঠ, পৃথিবী ও আকাশের প্রশংসাসহ, সরস্বতীকে সুন্দর স্তবক দিয়ে সম্মান জানালেন। তাঁরা বললেন, “হে বিশুদ্ধা, আপনার দুই রাজ্য—জল ও স্থলে—মহত্বে পরিপূর্ণ, সেখানে মানবগণ বাস করে। আপনি মারুৎদের বন্ধু, দানশীলদের মধ্যে দানবৃদ্ধি করুন, আমাদের সহায় হোন।” তাঁরা প্রার্থনা করলেন, “হে শুভদায়িনী সরস্বতী, আমাদের সৌভাগ্য দিন। আপনি সদা মনোযোগী, বলশালী। আমরা যেমন যমদগ্নি ও বসিষ্ঠ আপনাকে প্রশংসা করেন, তেমনি আপনাকে বন্দনা করি।” তাঁরা ডাকলেন, “যাঁরা জন্মেছেন, শক্তিশালী, দানশীল—সেইসব সন্তানের জন্য আমরা সরস্বতীকে আহ্বান করি।” “হে সরস্বতী, আপনার মধুময়, ঘৃতস্রাবী তরঙ্গ আমাদের রক্ষা করুক। আমরা যেন আপনার পুষ্টিকর দুধ পান করি, যা সকলের জন্য উন্মুক্ত, আমাদের সন্তানের খাদ্যরূপে।” এরপর যজ্ঞস্থলে, যেখানে মহাপুরুষেরা আনন্দ পান, যেখানে ইন্দ্রের জন্য সোম রস নিঃসৃত হয়, সেখানে বসিষ্ঠ বললেন, “আমরা দেবতাদের আশ্রয় চয়ন করি। ব্রিহস্পতি ও আমাদের সঙ্গীরা যেন আমাদের মহত্ত্ব দান করেন, যেন আমরা দানশীলদের কাছে নির্দোষ থাকি, দূর থেকে দানকারী পিতার মতো।” তাঁরা প্রাচীনতম, শুভ ব্রহ্মণস্পতিকে ভক্তি ও অর্ঘ্য দিয়ে প্রশংসা করলেন। তাঁরা বললেন, “দেবগণ যিনি পুরোহিত, সেই ইন্দ্রকে এই স্তব acclaim করুক। হে ব্রিহস্পতি, আপনি আমাদের উৎপত্তি প্রতিষ্ঠা করুন, আমাদের ধন-ইচ্ছা ও বীর্য দিন, বিপদ থেকে নিরাপদে এগিয়ে দিন।” তাঁরা অবিনশ্বর, প্রাচীন, গৃহস্থদের মধ্যে পূজিত, অপরাজেয় ব্রিহস্পতিকে আহ্বান করলেন। তাঁকে বর্ণনা করলেন—তাঁর লাল ঘোড়ারা দ্রুতগামী, তাঁর আসন নীলাকাশের মতো গম্ভীর, তাঁর রূপ দীপ্তিময়, সোনালী কেশর, শতপত্র বিশিষ্ট, শক্তিশালী, বহু বন্ধুকে ঐশ্বর্য প্রদানকারী। স্বর্গ ও পৃথিবী, সৃষ্টিকর্তা যুগল, ব্রিহস্পতির মহত্ত্ব বৃদ্ধি করেছেন। কুশলতা ও বন্ধুত্বে পুরোহিত বাক্যকে গভীর করেছেন। তাঁরা বললেন, “হে ব্রহ্মণস্পতি, এই স্তব ইন্দ্রের জন্য, বজ্রধারী; আমাদের রক্ষা করুন, আমাদের চিন্তা ধারণ করুন, শত্রুর বিদ্বেষ বিনষ্ট করুন।” ব্রিহস্পতি ও ইন্দ্র স্বর্গ ও পৃথিবীর ঐশ্বর্যের অধিপতি—তাঁরা যেন প্রশংসাকারী ও গায়ককে ধন দেন, সর্বদা কল্যাণে আমাদের রক্ষা করেন। এরপর, যজ্ঞে পুরোহিতেরা বললেন, “হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, আপনাকে লাল বর্ণের দুধ অর্ঘ্য দিচ্ছি; গাভী থেকে ইন্দ্রের জন্য পানীয় দান করছি, যিনি সমস্ত সোম রস কামনা করেন।” তাঁরা বললেন, “আপনি আকাশে যে আনন্দদায়ক আহার রেখেছেন, প্রতিদিন তার পুষ্টি দেন; মন ও হৃদয়ে গ্রহণ করে, ইন্দ্র, প্রস্তুত সোম পান করুন।” সোম শক্তির জন্য জন্মেছে, তার মাতাও তার মহত্ত্ব ঘোষণা করেছেন। ইন্দ্র, আপনি পৃথিবী ও আকাশের বিস্তীর্ণ স্থান পূর্ণ করেছেন, যুদ্ধে দেবতাদের জন্য পথ সৃষ্টি করেছেন। আপনি যখন অহংকারী শক্তিশালীদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, আপনার বাহুতে প্রতিরোধকারীদের দমন করেছিলেন; ইন্দ্র, মানুষের সঙ্গে যুদ্ধেও আপনি বিখ্যাত বিজয় এনে দিয়েছেন। তাঁরা বললেন, “আমি ইন্দ্রের প্রাচীন কীর্তি এবং বর্তমানে মঘবানের নতুন কর্ম বলছি; দেবীরা যখন তাঁর শক্তি সহ্য করতে পারেননি, তখন সোম একান্ত তাঁরই হয়ে গেল।” এই বিশ্বই আপনার চারণভূমি, সূর্যের দৃষ্টিতে যা কিছু দেখা যায়; আপনি গাভীর রাখাল, একমাত্র অধিপতি; আমরা যেন আপনার দানভোগী হই। ব্রিহস্পতি ও ইন্দ্র স্বর্গ ও পৃথিবীর ধনের অধিপতি; প্রশংসাকারী ও গায়ককে ধন দিন, সর্বদা কল্যাণে আমাদের রক্ষা করুন। এরপর, বিষ্ণুর প্রতি স্তব শুরু হল। তাঁরা বললেন, “আপনি মাপ ও দেহ ছাড়িয়ে বৃদ্ধি পান, কেউ আপনার পরম মহত্ত্ব ছুঁতে পারে না। আমরা আপনার দুই রাজ্য জানি, হে বিষ্ণু, আপনি সর্বোচ্চ বিস্তার জানেন।” “কেউ জন্মের আগে বা পরে আপনার সীমা অতিক্রম করতে পারেনি। আপনি উচ্চ, বিস্তৃত স্বর্গ ধারণ করেছেন, পূর্বদিকে পৃথিবীর প্রান্ত স্থাপন করেছেন। পৃথিবী যেন পুষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়, দুধে পরিপূর্ণ, মানুষের কল্যাণে ফলদায়ক হয়। বিষ্ণু, আপনি দুই পৃথিবী বিস্তার করেছেন, আপনার রশ্মিতে পৃথিবী স্থাপন করেছেন।” “আপনি যজ্ঞের জন্য বিস্তৃত স্থান সৃষ্টি করেছেন, সূর্য, উষা ও অগ্নিকে প্রকাশ করেছেন। দাসদের শক্ত বর্মের মায়া পর্যন্ত আপনি, হে বীরগণ, যুদ্ধে বিনষ্ট করেছেন। ইন্দ্র ও বিষ্ণু, তোমরা শম্ভরের শক্ত দুর্গ ৯৯টি ভেঙেছ; বরচির একশো ও তার হাজার যোদ্ধাকে একত্রে বধ করেছ।” এই মহিমান্বিত স্তব, আপনাদের মহাশক্তি ও পদক্ষেপের প্রশংসা করে, আপনাদের শক্তিতে বৃদ্ধি পায়। সভায় আমি আপনাদের বন্দনা করি, বিষ্ণু; আমার গান প্রতিযোগিতায় ঐশ্বর্য আনুক, ইন্দ্র। “হে বিষ্ণু, আমি আপনার জন্য ‘বষট্’ আহ্বান করি; এই অর্ঘ্য গ্রহণ করুন, বিস্তৃতগামী। আমার প্রশংসিত স্তব আপনাকে বৃদ্ধি করুক; আপনারা সকলেই সর্বদা আমাদের কল্যাণে রক্ষা করুন।” এরপর তাঁরা বললেন, “এখন মানুষ যেন বিষ্ণুকে জয় ও সেবা করতে চায়, নিষ্ঠা ও ভক্তিতে। যিনি অটল মন ও যজ্ঞে পূজা করেন, তাঁকে বিষ্ণু কখনও পরিত্যাগ করেন না।” বিষ্ণু সকল জাতিকে অনুগ্রহ দেন, তাঁর জ্ঞান অচ্যুত, সর্বদা সচল। তিনি আমাদের সমৃদ্ধ করুন, অশ্ব ও দীপ্তিমান ধন দিন। তাঁরা বললেন, “ঈশ্বর বিষ্ণু তিনবার পৃথিবী পরিক্রমা করেছেন, শতগানবিশিষ্ট তাঁর মহত্ত্বে। বিষ্ণু, মহাবল, অগ্রসর হোন; তাঁর নাম চিরন্তন ও অক্ষয়।” বিষ্ণু মানুষের কল্যাণে পৃথিবী পরিক্রমা করেছেন, তাঁর প্রশংসা অটল, তাঁর প্রজারা দৃঢ়; তিনি বিস্তৃত, সুপ্রতিষ্ঠিত আবাস গড়েছেন। “আজ আমি আপনার মহান নাম ঘোষণা করছি, আপনার কর্ম জানি। আপনাকে বন্দনা করি, হে মহাবল, বনে যিনি বাস করেন, এই রাজ্যের সুদূর বিস্তার ধারণ করেন।” তাঁরা বললেন, “বিষ্ণু, আপনার কাছে কিছুই গোপন নয়, যখন আমি, বিস্তৃতগামী, তা ঘোষণা করেছি। আমাদের থেকে আপনার রূপ লুকাবেন না—এমনকি যখন সভায় আপনি অন্য রূপে প্রকাশিত হন।” শেষে, তাঁরা আবারও বললেন, “হে বিষ্ণু, আমি আপনার জন্য ‘বষট্’ আহ্বান করি; এই অর্ঘ্য গ্রহণ করুন, বিস্তৃতগামী। আমার প্রশংসিত স্তব আপনাকে বৃদ্ধি করুক; আপনারা সকলেই সর্বদা আমাদের কল্যাণে রক্ষা করুন।” এভাবেই, ঋষিরা সরস্বতী, ব্রিহস্পতি, ইন্দ্র ও বিষ্ণুর প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভক্তি জানিয়ে, তাঁদের আশীর্বাদ, শক্তি ও কল্যাণ কামনা করলেন। তাঁদের স্তব ও যজ্ঞে দেবতারা সন্তুষ্ট হলেন, আর মানবজীবনে বর্ষিত হল ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য ও কল্যাণ।