ঋষি বসিষ্ঠ মহর্ষি, দেবতাদের উদ্দেশ্যে এক অপূর্ব অষ্টপদী স্তোত্র রচনা করলেন ইন্দ্র ও বরুণের জন্য, যেন তাঁর সন্তান-সন্ততির মঙ্গল ও সমৃদ্ধি হয়। তিনি প্রার্থনা করলেন—তাঁরা যেন দেবযজ্ঞে সদা অভিষিক্ত হয়ে মহাদানের দ্বারা অলঙ্কৃত হন এবং দেবতারা আশীর্বাদ দিয়ে তাঁদের সর্বদা রক্ষা করেন। তিনি অনুভব করলেন, বরুণ তাঁর মহিমায় সমস্ত সৃষ্টিকে বিস্তার করেছেন; বিরাট স্বর্গ ও পৃথিবীকে তিনি ধারণ করেছেন, আকাশকে উঁচু করেছেন এবং অসংখ্য নক্ষত্রকে বিস্তৃত করেছেন। তাঁর নিজের রূপেই তিনি সব কথা বলেন। তখন বসিষ্ঠ ভাবলেন—কবে আমি বরুণের আশ্রয়ে থাকব? আমার কোন অর্ঘ্য তিনি গ্রহণ করবেন? কবে করুণাময় বরুণ আমার প্রতি স্নেহদৃষ্টি দিবেন? তিনি বরুণের দর্শনের আকাঙ্ক্ষায় নিকটবর্তী হয়ে প্রশ্ন করলেন—যাঁরা জ্ঞানী, তাঁরাও বলেন, বরুণই পাপকে নিজের মধ্যে গ্রহণ করেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, “হে বরুণ, সেই প্রাচীন অপরাধটি কী, যার জন্য আপনি আপনার ভক্ত, আপনার বন্ধুকে কষ্ট দিতে চান? হে সহজ-উপাস্য দেব, আমাকে বলুন, কী সে অপরাধ? আমি ভক্তি নিয়ে আপনার কাছে এসেছি।” তিনি আবার প্রার্থনা করলেন—“আমাদের পূর্বপুরুষদের পাপ থেকে, এবং আমাদের শরীর দিয়ে করা পাপ থেকে আমাদের মুক্ত করুন। হে রাজা বরুণ, বসিষ্ঠকে সেই অপরাধ থেকে মুক্ত করুন, যেমন গাভীকে দড়ি থেকে, বা পশুকে ফাঁদ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া হয়।” তিনি উপলব্ধি করলেন, কারও নিজের দক্ষতা, দৃঢ়তা, বীর্য বা বুদ্ধি যথেষ্ট নয়; ছোট-বড় নানা কিছু কাছাকাছি থাকে, মিথ্যা বলার প্রবৃত্তি ও নিদ্রাও আসে। তিনি বললেন—“আমি যেমন দাস তার দাতা প্রভুর জন্য নিষ্কলুষ কর্ম করে, তেমনই দেবতার জন্য নিষ্কলুষ কর্ম করি, ঐশ্বর্যলাভের আশায়। জ্ঞানী দেবতা, যদিও তিনি অদৃশ্য, চিন্তাশীলকে অনুপ্রাণিত করেন; মহৎ বরুণ গায়ককে ধন দেন।” তিনি বললেন—“হে বরুণ, এই স্তোত্রটি আমার হৃদয়ে নিবিষ্ট, আপনার জন্য নিবেদিত। আমাদের গৃহে ও কর্মে মঙ্গল হোক; আপনি সদা আশীর্বাদে আমাদের রক্ষা করুন।” এরপর তিনি দেখলেন, বরুণ সূর্যের পথ সুগম করেছেন; নদীগুলি মহাসাগরের দিকে বহমান, বরুণ তাদের প্রবাহ মুক্ত করেছেন, সত্যের জন্য মহান নদীগুলিকে প্রবাহিত করেছেন। বরুণের শ্বাসই বায়ু, তাঁর বস্ত্র বায়ুমণ্ডল, সদা নবীন; তাঁর শক্তি অশ্বের মতো বলশালী ও দ্রুত। এই বিস্তৃত পৃথিবী ও স্বর্গে তাঁর প্রিয় আবাসস্থল ছড়িয়ে আছে। পৃথিবী ও স্বর্গ বরুণ নির্ধারিত সীমা ও শৃঙ্খলাকে চেনে। যারা সত্যনিষ্ঠ, যজ্ঞজ্ঞ, ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, তারা বরুণের ইচ্ছা উপলব্ধি করতে চায়। বরুণ চিন্তাশীলকে বললেন—“গাভীর তিনবার সাতটি নাম আছে।” পথের গোপন রহস্য জেনে, তিনি তা প্রকাশ করেন না; অনুপ্রাণিত ব্যক্তি ভবিষ্যৎ যুগের জন্য তা গ্রহণ করেন। তিনটি স্বর্গ ভিতরে, তিনটি পৃথিবী উপরে, ছয়টি তাদের বিন্যাসে—এইভাবে জ্ঞানী বরুণ স্বর্ণোজ্জ্বল দোলনা আকাশে স্থাপন করেছেন। বরুণ নদীর উপরে আকাশের মতো অবস্থান করেন; তাঁর উজ্জ্বল, দ্রুত, শুভ্র পশু আছে, যা বিন্দুর মতো শক্তিশালী। তিনি গভীর মননে বিস্তৃতিকে পর্যবেক্ষণ করেন; তাঁর শাসন উৎকৃষ্ট, তিনি বিদ্যমান সকলের রাজা। তিনি এমন এক দাতা, যিনি অপরাধীকেও করুণা করেন—আমরা যেন বরুণের কাছে নিষ্পাপ থাকি। আদিতির নিয়ম অনুসরণ করে, শক্তিতে বৃদ্ধি পেয়ে, আমরা তাঁর আশীর্বাদে সর্বদা সুরক্ষিত থাকি। ঋষি বসিষ্ঠ বরুণের উদ্দেশ্যে শ্রেষ্ঠ স্তোত্র নিবেদন করলেন—তিনি দাতা, নিকটস্থ, পূজনীয়, সহস্রদানী, মহাশক্তিমান ও মহান। তিনি বললেন—“আমি বরুণের চিন্তা ও অগ্নির উপস্থিতি উপলব্ধি করেছি। যাঁরা স্বর্গীয় আহার্যধারী, পুষ্টিদাতা, তাঁরা যেন তাঁদের রূপ প্রকাশ করেন।” একদিন, বরুণ ও বসিষ্ঠ এক নৌকায় সমুদ্রের মাঝখানে যাত্রা করলেন, এবং জলে বিহার করলেন—তখন তাঁরা উজ্জ্বল দোলনায় দোল দিলেন। বরুণ সেই নৌকা থেকে বসিষ্ঠকে ঋষি করলেন, তাঁর মহাশক্তিতে; গায়ক ও অনুপ্রাণিত কবিকে তিনি আশীর্বাদে ধন্য করলেন, যাঁকে স্বর্গ ও উষা বিস্তৃত করলেন। বসিষ্ঠ ভাবলেন—“আমাদের সেই প্রাচীন বন্ধুত্ব কোথায়, যাঁদের সঙ্গে আমি এককালে সংসর্গ করতাম? হে বরুণ, মহাশক্তিমান, আমি আপনার সহস্র দরজার গৃহে এসেছি।” তিনি প্রার্থনা করলেন—“যিনি আপনার চিরন্তন প্রিয় বন্ধু, সে যদি অপরাধও করে, সে যেন আপনার সঙ্গী হয়। আমরা যেন পাপী হয়ে আপনার ক্রোধভাজন না হই; গায়ককে রক্ষা করুন।” তাঁরা বললেন—“আমরা এই চিরস্থায়ী আবাসে বাস করি; বরুণ যেন আমাদের বন্ধন থেকে মুক্ত করেন। যারা কৃপা চায়, তারা যেন আদিতির কোলে পৌঁছে যায়; আপনি সদা আমাদের মঙ্গলে রক্ষা করুন।” বসিষ্ঠ আবার প্রার্থনা করলেন—“হে বরুণ, হে রাজা, আমাকে যেন মৃতের গৃহে যেতে না হয়; হে মহাশক্তিমান, দয়া করুন, করুণা করুন। আমি যদি কম্পিত হয়ে চলি, অপক্ব পাত্রের মতো, দয়া করুন। আমার সংকল্প যদি ভেঙে যায়, আমি যদি বিপথে যাই, হে পবিত্র, দয়া করুন। আমি যদি জলে দাঁড়িয়ে, পিপাসায় ও বার্ধক্যে কাতর হই, দয়া করুন। আমরা মানুষরা যেসব অপরাধ করি, জেনে বা না জেনে, দেবীয় নিয়ম অমান্য করে, হে বরুণ, সে পাপ যেন আমাদের ক্ষতি না করে।” এরপর যজ্ঞে বিশুদ্ধ, মধুময়, বলপূর্ণ আহুতি বরুণের জন্য উৎসর্গ করা হলো; বায়ু, আপনি আপনার দলবল নিয়ে আসুন, সোমরস পান করুন। যিনি আহুতি দেন, তিনি বিশুদ্ধ সোম আপনাকে উৎসর্গ করেন, হে বায়ু; আপনি তাঁকে মানুষের মধ্যে প্রসিদ্ধ করেন, প্রতি জন্মে পুরস্কার দেন। যাঁদের জন্য দুই পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে, যাঁদের জন্য ধিষণা দেবী ধন দেন—তাঁদের সঙ্গে বায়ুর দল চলে, উজ্জ্বল, ধনদায়ী দেবতা যোজিত হন। উষা উদিত হয়ে শুভদিন আনে, বিস্তৃত আলো প্রকাশ করে; গাভীগুলো বিস্তীর্ণ ভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে, নদীগুলো নিজ নিজ পথে প্রবাহিত হয়। তাঁরা, সত্যপ্রতিজ্ঞ, স্বেচ্ছায় যোজিত হয়ে, ইন্দ্র ও বায়ুর রথ টেনে নিয়ে যায়, বীর্যে পূর্ণ; দ্রুতগামী দল একত্রিত হয়। যাঁদের কাছে সূর্য, গবাদি পশু, অশ্ব, ধন, সোনা আছে—ইন্দ্র ও বায়ু, তাঁরা শক্তিশালী, যুদ্ধক্ষেত্রে অশ্ব ও বীর দিয়ে জয়ী হন। বসিষ্ঠরা, খ্যাতিলাভের আশায়, সুন্দর স্তোত্রে ইন্দ্র ও বায়ুকে বন্দনা করেন; তাঁরা বললেন—“আমরা আপনাদের ডাকছি, শক্তি দিন, সৌভাগ্য দিন; সদা আমাদের মঙ্গলে রক্ষা করুন।” বসিষ্ঠ ভাবলেন—কে জানে, সেই প্রাচীন দেবতাদের, যারা নিষ্কলুষ ও মহাশক্তিমান, যথাযথ পূজা করা হতো; তাঁরা উষাকে উদিত করেছিলেন বায়ু ও নির্যাতিত মনুর জন্য, সূর্যসহ। উজ্জ্বল দূতেরা, প্রতারণাহীন রক্ষক, মাস ও ঋতু পাহারা দিতেন। হে ইন্দ্র ও বায়ু, আপনাদের স্তোত্র সদা নবীন, আমি আপনাদের কৃপা ও নতুন সমৃদ্ধি চাই। পুষ্টিসম্পন্ন, ধনবর্ধক, জ্ঞানী ও উজ্জ্বল—তাঁদের দলের মহিমা অপরিসীম; তাঁরা বায়ুর উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে, সকলেই রাজকীয় কর্ম করলেন। আপনারা যতোদূর দেহ বিস্তার করেছেন, যতো শক্তি, যতোদূর দৃষ্টি, হে ইন্দ্র ও বায়ু, আনন্দে বিশুদ্ধ সোম পান করুন; এই কুশাসনে উপবিষ্ট হোন। আপনারা উজ্জ্বল দল যোজনা করুন, একই রথে আসুন; এই মধুর আহুতির সেরা অংশ আপনাদের জন্য, আপনারা আমাদের প্রতি অনুগ্রহ বর্ষণ করুন। এইভাবে, ঋষি বসিষ্ঠ দেবতাদের স্তব ও প্রার্থনায় স্নিগ্ধ, ভক্তিপূর্ণ কণ্ঠে তাঁদের করুণা, মুক্তি ও কল্যাণ কামনা করলেন।