একদিন, ঋষি ও যজমানেরা ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে একাগ্রচিত্তে যজ্ঞে বসেছেন। তারা স্মরণ করেন, কীভাবে ইন্দ্র প্রাচীন জ্ঞানের আলোকে নতুন পথ দেখিয়েছেন, কিভাবে তিনি বড়ো অংশ ছোটোকে দান করে, অমরত্ব লাভ করে দূরদৃষ্টিতে সকলের মঙ্গল কামনা করেছেন। তাই তারা ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করেন—হে আশ্চর্য শক্তির অধিকারী, আমাদেরও দাও ঐশ্বর্য ও কল্যাণ। তারা বলেন, “হে ইন্দ্র, যে তোমার প্রিয় ভক্ত, দাতা, বন্ধু—তাকে তুমি সর্বদা আশীর্বাদ করো। আমরাও যেন তোমার কৃপাপ্রাপ্তদের মধ্যে থাকি, যেন বিপদ থেকে রক্ষা পাই, মানুষের মধ্যে সম্মানিত হই।” তারা আবারও ইন্দ্রকে বন্দনা করেন, “এই স্তব তোমার জন্য, হে মহাশক্তিমান। তুমি যেভাবে সোমার আহ্বানে আসো, তেমনই এসো, আমাদের ধন-সম্পদ দাও।” তারা চায়, ইন্দ্র যেন তাদের শক্তি ও সমর্থন দেন, যেন তাঁর শক্তি তাদের জন্য অফুরান হয়, আর তিনি সদা তাদের মঙ্গল রক্ষা করেন। এরপর, যজ্ঞে সোমা রস অর্ঘ্যরূপে ইন্দ্রের জন্য নিবেদন করা হয়। ইন্দ্রের জন্মের সময় যেভাবে তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, সেই স্মৃতিতে তাঁকে জাগ্রত করার চেষ্টা হয়। তাঁকে আহ্বান করা হয়, যেন তিনি রথে চড়ে, তাঁর বাদামী ঘোড়াদের নিয়ে আসেন, যজ্ঞের স্তব ও সোমার আস্বাদনে আনন্দ পান। যজ্ঞস্থলে সকলে প্রস্তুত, পবিত্র কুশ ঘাস বিছানো, সোমার পানীয় প্রস্তুত। গৃহে গৃহে, বীর ও খ্যাতিমানদের মাঝে, স্তব উচ্চারিত হয়। তখন স্মরণ করা হয়—ইন্দ্রই নদীকে প্রবাহিত করেছেন, তাঁর গর্জনে শত্রুরা কাঁপে, রথগুলো গরুর মতো কাঁপতে থাকে; তাঁর শক্তিতে সমস্ত কৌশল ব্যর্থ হয়। ইন্দ্র তাঁর অস্ত্র নিয়ে, সমস্ত কৃত্য জেনে, ভয়ংকরভাবে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন; বজ্র হাতে তিনি দুর্গ ধ্বংস করেন, তাঁর মহত্ত্বে শত্রু পরাজিত হয়। কেউই তাঁর শক্তির সামনে টিকতে পারে না—না যজ্ঞকারী, না শত্রু। তারা প্রার্থনা করে, “হে ইন্দ্র, শত্রুদের ছত্রভঙ্গ করো, অধার্মিকেরা যেন আমাদের ক্ষতি না করতে পারে।” ইন্দ্র তাঁর শক্তিতে অনেককে ছাড়িয়ে গেছেন, তাঁর মহিমা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। নিজের বলেই তিনি বৃত্রকে বধ করেছেন; যুদ্ধে তাঁর সীমা কেউ খুঁজে পায়নি। এমনকি প্রাচীন দেবতারা পর্যন্ত তাঁর আধিপত্যে নিজেদের শক্তি সঁপে দিয়েছেন; শক্তির প্রতিযোগিতায় সবাই ইন্দ্রের সহায়তা চায়। দুর্বলতমও তাঁর কাছে আশ্রয় চায়, কারণ ইন্দ্র অশেষ কল্যাণের অধিপতি। তিনি শতবার রক্ষা করেছেন; তাঁর রক্ষাকর্তারা সর্বত্র ঘিরে রেখেছেন। যজমানেরা বলেন, “হে ইন্দ্র, আমরা যেন চিরকাল তোমার বন্ধু হই, তোমার মহিমায় শক্তিমান হই। সভায় তোমার কৃপায় যেন জয়লাভ করি, শত্রুর শক্তি যেন পরাভূত হয়।” তারা আরও চায়, “হে ইন্দ্র, তোমার স্বভাবজাত ঐশ্বর্য আমাদের দাও, যেটা দানশীলেরা প্রদান করেন। তোমার শক্তি আমাদের জন্য অফুরান হোক, আমাদের সর্বদা মঙ্গলে রক্ষা করো।” এরপর, তারা ইন্দ্রকে আহ্বান করে, “হে অশ্বপ্রিয়, সোমা পান করো, যেটা তোমার জন্য পাহাড় থেকে নিপুণ হাতে নিঃসৃত হয়েছে। এই মধুর পানীয়ই তোমাকে বৃত্রবধে শক্তি দিয়েছিল; আজও তুমি যেন এতে মত্ত হও।” ঋষি বশিষ্ঠ তাঁর স্তব নিবেদন করেন, “হে দাতা, আমার এই বাক্য শুনো, এই যৌথ ভোজে আমাদের স্তব গ্রহণ করো।” যে পাহাড় থেকে সোমা নিঃসৃত, সেই আহ্বান শুনে, গায়কের অন্তর্দৃষ্টি শুনে, ইন্দ্র যেন সর্বোত্তম কৃপা দেন, যাতে তারা ইন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। যজমানেরা বলেন, “তোমার বাণী ও গৌরব আমি জানি, কখনো অস্বীকার করতে পারি না। আমি সদা তোমার নাম ও মহিমা ঘোষণা করি।” ইন্দ্রের জন্য অনেক উৎসর্গ, অনেক জ্ঞানী তাঁকে আহ্বান করেন। তাঁরা প্রার্থনা করেন, “হে দাতা, আমাদের গৃহ যেন কখনো হারিয়ে না যায়।” তাঁরা বলেন, “এই সকল উৎসর্গ তোমারই জন্য, তোমার মহিমা বাড়ানোর জন্য আমি স্তব করি, মানুষ যেন সর্বদা তোমাকে আহ্বান করে।” তাঁরা স্বীকার করেন, “যারা নিজেদের শক্তিশালী ভাবে, তারাও তোমার মহিমায় পৌঁছাতে পারে না; তোমার পুরুষত্ব ও দান অপ্রতিদ্বন্দ্বী।” প্রাচীন ও নবীন ঋষিরা, যাঁরা স্তব রচনা করেছেন, তাঁদের শুভ বন্ধুত্ব যেন আমাদের সঙ্গে থাকে; ইন্দ্র যেন চিরকাল আমাদের মঙ্গলে রক্ষা করেন। বশিষ্ঠের স্তব উত্থিত হয়, তিনি ইন্দ্রকে মহিমায় মহিমান্বিত করেন, যিনি বজ্রধারী। তিনি কামনা করেন, “হে ইন্দ্র, তুমি আমাদের বীরপুত্র ও গবাদি দান করো, আমাদের সর্বদা মঙ্গলে রক্ষা করো।” ইন্দ্রের জন্য গৃহে আসন প্রস্তুত, তাঁকে বারবার আহ্বান করা হয়, “হে রক্ষক, আমাদের ঐশ্বর্য দাও, সোমায় তুষ্ট হও।” তাঁর মন যেন সুসংহত থাকে, সোমা মধুর, দুধ প্রবাহিত, আহুতি প্রচুর; এই প্রার্থনা ইন্দ্রকে ডাকে। তাঁকে আহ্বান করা হয়, “হে শক্তিশালী, স্বর্গ ও পৃথিবী থেকে এসো, এই আসনে সোমা পান করো। তোমার বাদামী ঘোড়ারা তোমাকে আমাদের এই স্তবের কাছে নিয়ে আসুক।” তাঁকে ডাকা হয়, “হে হর্যশ্ব, তোমার সমস্ত সহায় নিয়ে এসো, আমাদের বিস্তৃত নিরাপত্তা দাও, তোমার পুরুষত্ব আমাদের মধ্যে স্থাপন করো।” তাঁরা বলেন, “এই স্তব তোমার জন্য, হে প্রচণ্ড বীর, যেমন রথচালক রথ টেনে আনে; এই স্তব তোমাকে ধনের মাঝে খোঁজে—তুমি আমাদের দিকে মনোযোগ দাও, যেমন আকাশে স্বর্গ শোনে।” তাঁরা কামনা করেন, “হে ইন্দ্র, আমাদের উৎকৃষ্টতায় পূর্ণ করো, তোমার মহান কৃপা আমাদের প্রাপ্য হোক, দানশীলদের জন্য বীরপুত্র ও পুষ্টি বর্ষণ করো, আমাদের সর্বদা আশীর্বাদে রক্ষা করো।” যখন যুদ্ধের ময়দানে সেনারা একত্রিত হয়, তারা ইন্দ্রের দিকে চেয়ে থাকে; বজ্রপাত নেমে আসে বীরের বাহু থেকে। তাঁরা চান, “তোমার মন যেন আমাদের থেকে বিচ্যুত না হয়।” তাঁরা প্রার্থনা করেন, “হে ইন্দ্র, দুর্গ ভেঙে দাও, শত্রুদের পরাজিত করো, শত্রুর অভিশাপ দূর করো, আমাদের সংগৃহীত ধন এনে দাও।” তাঁরা বলেন, “শত শত স্তব ও হাজার হাজার আশীর্বাদ সুদাসের জন্য হোক; আমাদের দান দাও, শত্রুর অস্ত্র বিনষ্ট করো, আমাদের জন্য গৌরব ও ধন প্রতিষ্ঠা করো।” তাঁরা ঘোষণা করেন, “শক্তির জন্য, হে ইন্দ্র, আমি তোমার; রক্ষার জন্য, হে বীর, আমি তোমার। প্রতিদিন তোমার শক্তিতে আমাদের জন্য গৃহ নির্মাণ করো, যেন আমরা অক্ষত থাকি।” অবশেষে, কুত্সা, হর্যশ্ব ও অন্যান্য সহায়কদের নিয়ে, তারা ইন্দ্রের কাছে শক্তি চাইতে আসে—দেবতাদের সহায়তায় বিজয় সাধন হয়, পুরস্কার লাভ হয়। এইভাবেই, যজ্ঞের স্তব, সোমার আহুতি ও একাগ্রচিত্ত প্রার্থনার মাধ্যমে, সকলে ইন্দ্রের কৃপা ও আশীর্বাদ লাভের আকাঙ্ক্ষায় মগ্ন থাকেন।