একদিন, এক ঋষি তাঁর অন্তরের গভীরতা থেকে দেবতাদের স্মরণ করলেন। তিনি বললেন, “হে প্রাচীন সহায়গণ, যাঁরা উত্তম, যাঁদের অশ্ব উত্তম, যাঁদের বুদ্ধি সুস্পষ্ট, আমি তোমাদের আহ্বান জানাই শক্তি ও অগ্রগতির জন্য। তোমরা আমাদের সহায় হও।” এইভাবে তিনি আশ্রয় খুঁজলেন দেবতাদের কাছে। ঋষি জানতেন, মিত্রের অনুগ্রহ সর্বদা উপস্থিত এবং তাঁর সদিচ্ছা অশেষ। কষ্টের মুহূর্তেও মিত্র মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান। তাই তিনি প্রার্থনা করলেন, “আমরা যেন মিত্রের আশ্রয়ে থাকি, যেন আমাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, আমরা যেন পাপমুক্ত হই, এবং সদা বরুণের কৃপায় পরিচালিত হই।” তিনি আবার বললেন, “হে মিত্র ও বরুণ, তোমরা আমাদের জাতিকে পথ দেখাও, আমাদের নেতৃত্ব দাও। আমাদের দাতা ও ঋষিদের কখনও পরিত্যাগ কোরো না, আমাদের রক্ষা হ্রাস কোরো না।” মানুষেরা দেবতাদের জ্ঞানে ও আলোকিত শৃঙ্খলায় আকৃষ্ট হয়ে, বরুণের নিকট গিয়ে বলত, “আমরা তোমাদের কাছে আসি, হে বরুণ, তোমার উজ্জ্বল শাসনকে উপলব্ধি করতে চাই। তোমার জন্য আমরা সাধনা করি।” কারণ, মিত্র-বরুণের শাসন অটুট ও সত্য, তাঁদের আদেশে আলোক মানুষের মাঝে স্থাপিত হয়। মানুষ তাঁদের কাছে গীত, উপহার ও গবাদিপশুর বিস্তৃত চারণভূমির জন্য প্রার্থনা করে। তাঁরা প্রাচীন কৌশলে, সূক্ষ্ম চিহ্নে মানুষকে দেখে থাকেন, তাঁদের জ্ঞান পবিত্র। ঋষিরা জানতেন, পৃথিবীর শৃঙ্খলা অক্ষয় ও প্রবাহমান, এবং এই মহিমা দেবতাদের দ্বারা পরিচালিত। মিত্রের কৃপাদৃষ্টিতে, জ্ঞানী ও সাধারণ মানুষ একত্রে প্রশস্ত আশ্রয় ও স্বশাসনের জন্য সাধনা করে। ঋষি আবার স্মরণ করলেন, “হে আদিত্যগণ—বরুণ, মিত্র, অর্যমান—তোমরা অটল, পূজনীয়, মহৎ শাসন স্থাপন করেছো। তোমাদের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব রয়েছে।” যখন মিত্র ও বরুণ তাঁদের সোনার আসনে বসেন, তখন তাঁরা জাতিকে রক্ষা করেন ও অনুগ্রহ দান করেন। কারণ, বরুণ, মিত্র ও অর্যমান সর্বজ্ঞ, তাঁরা সবকিছু দেখেন এবং নিয়মের মতো মানুষকে অকল্যাণ থেকে রক্ষা করেন। তাঁরা সত্য, শৃঙ্খলার সংস্পর্শে, প্রতিটি যুগে ধার্মিক, উত্তম পথপ্রদর্শক ও দাতা। বিপদ থেকেও তাঁরা মুক্তি দেন। ঋষি ভাবলেন, “কে তোমাদের যথাযথভাবে স্তব করেছে—মিত্র না বরুণ? এই চিন্তা তোমাদের ও অত্রিদের দিকে যায়।” তখন তিনি উচ্চস্বরে গাইলেন, “মিত্র ও বরুণ, তোমাদের জন্য মহিমামণ্ডিত স্তব করি, কারণ তোমরা মহাশক্তিশালী ও মহান।” এই দুই দেবতা ঘৃতনির্মিত, দেবতাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ও পূজিত। ঋষি প্রার্থনা করলেন, “তোমরা আমাদের পৃথিবীর ঐশ্বর্য ও স্বর্গীয় ধন দান করো, কারণ দেবতাদের মধ্যে তোমাদের শক্তি অতুলনীয়।” এই দুই দেবতা সত্যকে সত্যের সঙ্গে যুক্ত করেন, অন্তর্দৃষ্টি অন্বেষণ করেন, এবং প্রতারণামুক্ত থেকে শক্তিতে বৃদ্ধি পান। স্বর্গ ও পৃথিবী, যাঁরা বৃষ্টিদাত্রী, এবং জলাধিপতি দেবতারা, তাঁরা দানুমতীর বিস্তৃত গহ্বর অন্বেষণ করেন। ঋষি বললেন, “হে বরুণ, তিনটি রাজ্য, তিনটি স্বর্গ, তিনটি বিস্তার তুমি ও মিত্র ধারণ করো। তোমরা শাসকের শৃঙ্খলা রক্ষা করো, অখণ্ড নিয়মের পাহারাদার।” বরুণের আছে দুধে ভরা গাভী, মিত্রের জন্য প্রবাহিত হয় মধুময় নদী। তিনটি মহাবলদ তিন আসনের মাঝে দীপ্তি ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রভাতকালে ঋষি দেবী অদিতিকে আহ্বান করেন, মধ্যাহ্নে সূর্য উঠলে মিত্র ও বরুণের কাছে প্রার্থনা করেন ধন, কল্যাণ, সন্তান ও উত্তরাধিকারীদের মঙ্গলের জন্য। তাঁরা স্বর্গ ও পৃথিবীর দীপ্তি ও বিস্তারের ধারক, অমর দেবতারা তাঁদের অটল নিয়মে বাধা দেন না। ঋষি বললেন, “তোমাদের জন্য সহায়তা অবারিত, হে বরুণ ও মিত্র, আমি আজ তোমাদের অনুগ্রহ কামনা করি।” তিনি চাইলেন, “আমরা যেন সত্যপরায়ণ থেকে তোমাদের কৃপা লাভ করি, যেন আমরা তোমাদের রুদ্ররূপ লাভ করি।” তিনি বললেন, “হে রুদ্রগণ, আমাদের রক্ষা করো, আমাদের উদ্ধার করো, যাতে আমরা নিজেদের শক্তিতে শত্রু জয় করতে পারি। কারও অদ্ভুত শক্তির প্রভাবে বা অপচয়ে আমরা যেন দেহে কষ্ট না পাই।” এরপর তিনি মিত্র ও বরুণকে আহ্বান করলেন, “আমাদের স্তব শুনে এসো, হে বরুণ ও মিত্র, এই সুন্দর যজ্ঞে আসো।” কারণ, বরুণ ও মিত্র সর্বজ্ঞ শাসক, তাঁরা যেন আমাদের পূর্ণ বোধদান করেন। তিনি বললেন, “আমাদের নিঃসৃত সোম পান করতে এসো, হে বরুণ ও মিত্র, যাঁরা পূজিত।” অতঃপর তিনি বললেন, “আমরা অত্রির মতো মিত্র ও বরুণকে গীত捜র্ন করি; পবিত্র কুশে বসে সোম পান করো।” তাঁদের ব্রত দৃঢ়, তাঁরা শৃঙ্খলা রক্ষক ও মানুষের পথপ্রদর্শক। তিনি আবার আহ্বান করলেন, “আমাদের যজ্ঞ গ্রহণ করো, কুশে বসে সোম পান করো।” এদিকে, ঋষি আশ্বিনীকেও ডেকে বললেন, “তোমরা আজ কোথায় আছো—দূরে, কাছে, নাকি অনেক স্থানে? হে বহু ভোগের অধিকারী, মধ্যাকাশে থেকেও এসো।” তাঁদের বললেন, “হে সদা কর্মঠ, বহু সহায় ও আশ্রয় নিয়ে, আশ্চর্যযানে, দ্রুতগতিতে তোমাদের ডাকি অনুগ্রহের জন্য।” আশ্বিনীরা বহু আশ্চর্য রূপ সৃষ্টি করেছেন, তাঁদের রথের চক্র জুড়েছেন; তাঁদের মহাশক্তিতে তাঁরা তিনটি জগত অতিক্রম করেন, দুই নাহুষের যোতকে ঘিরে থাকেন। তাঁদের অনুগ্রহে যা কিছু ঘটে, সবই প্রশংসার যোগ্য; নানা জন্ম ও রূপে, তাঁরা আমাদের আত্মীয় হয়েছেন। যখন সূর্যা তাঁদের রথে আরোহণ করেন, সেই রথ সদা দ্রুত ও সহজে চালিত হয়। তাঁদের চারপাশে লাল পাখি উড়ে, সূর্যের কিরণ ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের রাত সতর্ক ও সদয়, আর তাঁদের আশ্চর্য, পুষ্টিকর উষ্ণতা মানুষ উপভোগ করে, হে নাসত্য, তোমরা আমাদের কল্যাণে সদা মনোযোগী। এভাবেই ঋষি দেবতাদের স্তব, প্রার্থনা ও আহ্বান জানালেন, তাঁদের কৃপা ও আশ্রয়ে মানবজাতি যেন চিরকাল রক্ষা পায়—এই প্রার্থনায় তাঁর অন্তর ভরে উঠল।