একদিন, ঋষিরা যজ্ঞের আসরে বসে দেবতাদের উদ্দেশে স্তোত্র পাঠ করছিলেন। তারা স্মরণ করলেন—জগতে কত রকমের প্রাণী, যাদের রূপ কখনও এক, কখনও অনেক, কখনও আবার একক। অগ্নিদেব তাদের সকলের নাম জানেন যজ্ঞের মাধ্যমে। অঙ্গিরসগণ তপস্যার তাপে যাদের সৃষ্টি করেছিলেন—হে পার্জন্য, তাদের তুমি মহান সুরক্ষা দাও। তারা স্মরণ করলেন সেই সকল প্রাণীকে, যারা দেবতাদের মাঝে দেহ ধারণ করেছে, যাদের প্রতিটি রূপ সোমদেব জানেন। যেসব গাভী দুধে পূর্ণ, সন্তানে সমৃদ্ধ—হে ইন্দ্র, তাদের গোশালায় বর্ধিত করো। ঋষিরা বললেন, প্রজাপতির অধিপতি আমাদের এই গাভীগণ দিয়েছেন, সকল দেবতা ও পিতৃপুরুষের অনুমোদনে। তারা শুভ হোক, আমাদের গোশালায় আসুক, আমরা তাদের সঙ্গে সন্তানের আনন্দে বাস করি। তখন তারা আহ্বান করলেন উজ্জ্বল, শক্তিশালী দেবতাকে—তিনি যেন মধুর সোম পান করেন, যজ্ঞের স্বামীকে আনন্দ দেন, স্বভাবতই মানুষের রক্ষক, বায়ুর দ্বারা চালিত, নানা রূপে দীপ্তিমান। তিনি সবার পুষ্টি করেন। এই উজ্জ্বল, বলশালী দেবতা ধর্মে প্রতিষ্ঠিত, স্বর্গের আসনে অটল। তিনি শত্রুদের, বৃত্রকে, অসুর ও প্রতিদ্বন্দ্বীদের বধ করেন; তার আলো নতুনভাবে জন্ম নেয়। ঋষিরা দেখলেন—এটাই সর্বোচ্চ আলো, মহান জ্যোতি, যাকে সর্বজয়ী, ধনজয়ী, মহান বলা হয়। সূর্য তার দীপ্তিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী, সবার সামনে প্রসারিত, তার শক্তি কখনও ক্ষয় হয় না। ঋষিরা প্রার্থনা করলেন—হে দীপ্তিমান, তুমি স্বর্গলোকে যাও, আকাশের উজ্জ্বল বিস্তারে। এই আকাশই তো সমস্ত জগৎকে ধারণ করে, এই কর্মঠ দেবতার দ্বারা, সকল দেবতার সহায়তায়। এবার তারা স্মরণ করলেন ইন্দ্রকে—হে ইন্দ্র, তুমি সভা থেকে সেই রথ চালিয়ে এনেছ, সোমে পূর্ণ, তুমি সোমপেষকের আহ্বান শুনেছ। যজ্ঞের নেতৃত্ব, চর্ম—সবই তুমি গ্রহণ করেছ এবং সোমপেষকের গৃহে প্রবেশ করেছ। তুমি বহুবার সেই মর্ত্য, ভেনাকে, শত্রুর বন্ধন থেকে মুক্ত করেছ, তোমার স্মরণকারীর জন্য। সূর্যকে, যদিও সে পিছনে, সামনে এনেছ; দেবতাদের ইচ্ছা তুমি একাই পরিচালনা করো। তারা আহ্বান করলেন—বনভূমি ও শক্তি নিয়ে এসো; গাভীগণ ও তাদের বাছুরেরা পথ মিলে যাক। মহান দাতা, সদাশয় যজ্ঞকারী, তুমি মহৎ চিন্তা নিয়ে এসো, উদার দাতাদের সঙ্গে। আমরা, পিতৃদেবতাদের যেভাবে সমর্থন করি, তেমনই আমরা সুতো প্রসারিত করি, আরাধনায় যজ্ঞ দেই। ভোর, সবার শ্রেষ্ঠ বোন, তার মহৎ জন্ম নিয়ে পথ মেলায়। তারা বললেন—এসো, ভিতরে প্রবেশ করো; অচল, দৃঢ় হয়ে দাঁড়াও। সবাই যেন তোমাকে চায়; তোমার রাজত্ব যেন অটুট থাকে। এখানেই থাকো, চলে যেয়ো না; পর্বতের মতো অচল দাঁড়াও। ইন্দ্রের মতো দৃঢ় থেকো, রাজ্য রক্ষা করো। ইন্দ্র এই দৃঢ়তাকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, দৃঢ় আহুতির দ্বারা; সোম ও ব্রহ্মণস্পতি তাই ঘোষণা করেছেন। আকাশ দৃঢ়, পৃথিবী দৃঢ়, পর্বতগণ দৃঢ়; এই সমগ্র জগৎ দৃঢ়, রাজাও দৃঢ়। রাজা বরুণ তোমার জন্য দৃঢ়, দেবতা বৃহস্পতি দৃঢ়; ইন্দ্র ও অগ্নি যেন একত্রে রাজ্য দৃঢ় রাখেন। দৃঢ় আহুতির দ্বারা আমরা সোম স্পর্শ করি; তখন ইন্দ্র, তুমি সকল জাতিকে করায়ত্ত করো, তাদের কর প্রদান করো। বিজয়ী আহুতি দিয়ে, যেভাবে ইন্দ্র জয়ী হয়েছিলেন, সেই দ্বারা, হে ব্রহ্মণস্পতি, আমাদের দিকে রাজ্য ফিরিয়ে দাও। প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রুদের পরাজিত করে, বিরোধী ও আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকো। সavitā ও সোম যেন তোমাকে পরিবেষ্টন করেন; সমস্ত সত্তা যেন তোমার চারপাশে থাকে, তোমার কামনায়। যে আহুতিতে ইন্দ্র সর্বশ্রেষ্ঠ ও উন্নত হয়েছিলেন, সেই দ্বারা দেবতারা আমাকে নিরপেক্ষ করেছেন—আমি তাই হয়েছি। আমি যেন প্রতিদ্বন্দ্বীহীন, প্রতিদ্বন্দ্বী-সংহারী, শক্তিশালী রাজ্য নিয়ে, শত্রু বিজয়ী হই; এই সত্তা ও জনগণের মাঝে আমি শ্রেষ্ঠ হই। ঋষিরা বললেন—সavitā দেবতা তোমাদের, হে সোমপেষকগণ, ধর্মে আশীর্বাদ করুন; যন্ত্রে যুক্ত হয়ে পেষণ করো। অশুভ বাক্য ও চিন্তা দূর করো, আরোগ্যদায়ক আলো আনে। পেষকগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঊর্ধ্ব বেদীতে উন্নীত হন; তারা শক্তি স্থাপন করেন। আবার সavitā দেবতা তোমাদের ধর্মে আশীর্বাদ করুন, যজ্ঞকারীর জন্য। ঋষিরা ডাকলেন—ঋভুগণের বীর, বিজয়ী সন্তানরা আসুন, যারা পৃথিবীকে গাভীর মতো ভোগ করেছেন। দেবীর ভক্তি নিয়ে জাঠবেদস অগ্নিদেবকে আনো, তিনি যেন আমাদের আহুতি যথাযথভাবে বহন করেন। এই পুরোহিত, দেবতাভক্ত, যজ্ঞে অগ্রসর হন; সুসংযোজিত রথের মতো, নিজ ইচ্ছায় দীপ্তিমান হয়ে চলেন। অগ্নি বিস্তৃত হন, যেন অমর জন্ম থেকে; দেবতা, জীবনদাতা, শক্তির চেয়েও শক্তিশালী। জ্ঞানীরা হৃদয় ও মন দিয়ে সেই ডানা-ওয়ালা সত্তাকে উপলব্ধি করেন, যিনি অসুরের মায়ায় আবৃত; সাগরের মধ্যে ঋষিরা তাকে দেখেন, রশ্মির পথ, সৃষ্টিকর্তার চিহ্ন অনুসন্ধান করেন। ডানা-ওয়ালা সত্তা মনে বাক্য ধারণ করেন; গন্ধর্ব গর্ভে তা ঘোষণা করেন; উজ্জ্বল স্বর্গীয় জ্ঞান, ঋষিরা অমরতার আসনে রক্ষা করেন। আমি দেখেছি সেই রাখালকে—তিনি কখনও পড়েন না, দুই পথে চলেন, ঘুরে বেড়ান; একইসঙ্গে এক ও ভিন্নবেশী, তিনি জগতে ঘুরে বেড়ান। ঋষিরা আহ্বান করলেন—তর্ক্ষ্য, বলশালী, দেবপ্রেরিত, বিজয়ী, দ্রুততম রথ, অক্ষচক্র অখণ্ড, যুদ্ধজয়ী—তাকে কল্যাণের জন্য ডাকি। কল্যাণের আশায় ইন্দ্রের কৃপা চাই; যেন নৌকার মতো বিপদ পার হই; বিস্তৃত, গভীর পৃথিবী আমাদের যেন ক্ষতি না করে—এখানে বা পরজগতে। যিনি একসঙ্গে তাঁর শক্তিতে পাঁচ জাতিকে সূর্যের মতো আলোয় ছড়িয়ে দিয়েছেন—তাঁর ঐশ্বর্য হাজারে হাজার, শতকে শত, কখনও ক্ষয় হয় না, যেন প্রতিযোগিতায় নবযুবতী। এইভাবে ঋষিরা দেবতাদের স্মরণ করে, যজ্ঞের মাধ্যমে কল্যাণ, সুরক্ষা ও ঐশ্বর্য কামনা করলেন—তাদের স্তোত্রে দেবতারা প্রসন্ন হলেন, আর মানবজাতির কল্যাণের পথ প্রসারিত হলো।