সুগ্রীব যখন বালির কুকর্মের ভয়ে উদ্বিগ্ন ও সন্দেহে ভুগছিলেন, তখন বুদ্ধিমান হনুমান তাঁর দিকে তাকিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘‘এই মালয় পর্বত অত্যন্ত নিরাপদ, এখানে বালির কোনো ভয় নেই। তুমি যে ভয়ে পালিয়ে এসেছ, সেই নিষ্ঠুর বালিকে আমি এখানে দেখতে পাচ্ছি না। তোমার এই ভয়, যা তোমার দুষ্ট বড় ভাইয়ের কুকর্মের কারণে এসেছে, এখন এখানে অমূলক; এখানে তোমার কোনো বিপদ নেই।’’ হনুমান আরও বললেন, ‘‘তোমার বানর স্বভাব স্পষ্ট, তুমি চঞ্চল মনে স্থির থাকতে পারো না। কিন্তু তুমি বুদ্ধি ও বিচক্ষণতায় সমৃদ্ধ, তাই সব বিষয়ে লক্ষণ দেখে কাজ করো; কারণ কোনো রাজা যদি জ্ঞান না রাখে, সে কখনো সকল প্রাণীর ওপর শাসন করতে পারে না।’’ হনুমানের শুভ কথা শুনে সুগ্রীবও আরও শুভ কথা বললেন, ‘‘দেখো, যারা ধনুক, তীর ও তরবারি নিয়ে এসেছে, তাদের দীর্ঘ বাহু, প্রশস্ত চোখ—এই দুইজনকে দেখে কে ভয় পাবে না? আমি সন্দেহ করছি, এরা বালির পাঠানো লোক। রাজাদের অনেক মিত্র থাকলেও এখানে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। শত্রুরা ছদ্মবেশে আসে, তাদের চিনতে হবে; যারা বিশ্বাসযোগ্য নয়, তারা সুযোগ পেলেই আঘাত করে। বালি কর্মে বুদ্ধিমান, রাজারা দূরদর্শী; তাই যারা অন্যের বিনাশক, তাদের চিনতে হবে, যদিও তারা সাধারণ মনে হয়।’’ সুগ্রীব বলেন, ‘‘তুমি যেন সাধারণ বানর হয়ে তাদের কাছে যাও, তাদের আচরণ, ভঙ্গি ও কথা দেখে বুঝতে চেষ্টা করো। তাদের মন ভালো কিনা, বারবার প্রশংসা করে তাদের বিশ্বাস অর্জন করো এবং তাদের ভঙ্গি পড়ো। আমার সামনে দাঁড়িয়ে, তুমি জিজ্ঞেস করো, এই দুই ধনুর্ধারী কেন এই অরণ্যে এসেছে। যদি তারা হৃদয়ে বিশুদ্ধ হয়, তুমি তা তাদের কথা ও চেহারা দেখে বুঝবে; মানুষের কুটিলতা চিনতে হবে।’’ এভাবে বানররাজ সুগ্রীবের নির্দেশে, পবনপুত্র হনুমান রাম ও লক্ষ্মণের কাছে যাওয়ার সংকল্প করলেন। ‘‘ঠিক আছে,’’ বলে, সেই জ্ঞানী ও শক্তিশালী বানরের কথা শ্রদ্ধা করে হনুমান রাম ও লক্ষ্মণের কাছে গেলেন। এখন শুনো, মহামুনি বাল্মীকি রচিত গৌরবময় রামায়ণের কিষ্কিন্ধা কাণ্ডের তৃতীয় অধ্যায়ের কাহিনী। সুগ্রীবের কথাগুলি বুঝে, হনুমান ঋষ্যমূক পর্বত থেকে রঘুবংশের দুই বীরের কাছে লাফিয়ে গেলেন। বানররূপ ত্যাগ করে, হনুমান তখন মুনিরূপ ধারণ করলেন, কৌশলপূর্ণ উদ্দেশ্যে। তিনি সেই দুই বীরের কাছে গিয়ে, যথাযথভাবে তাদের প্রশংসা করে, প্রথা অনুযায়ী সম্মান জানিয়ে কথা বললেন। হনুমান, বানরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, কোমল ও সত্যব্রতী দুইজনকে, রাজর্ষি ও দেবতুল্য মনে করে, নিজের ইচ্ছামতো কথা বললেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘‘আপনারা দু’জন, সুন্দর চেহারার, কীভাবে এখানে এসেছেন, যার ফলে অরণ্যের হরিণ ও অন্যান্য প্রাণীরা ভীত হয়ে পড়েছে? আপনারা দু’জন, উদ্যমী, পাম্পা নদীর তীরে বৃক্ষগুলোর দিকে তাকিয়ে, নদীর সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছেন। আপনারা দু’জন, ধৈর্যশীল, সোনালী বর্ণের, বাকলবস্ত্র পরিহিত, গভীর নিশ্বাস নিচ্ছেন, দৃষ্টিতে সিংহের মতো, বিশাল বাহু, এই অরণ্যের প্রাণীদের অস্থির করছেন।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘আপনারা দু’জন, শত্রুনাশক, ইন্দ্রের ধনুকের মতো ধনুক হাতে, অসীম শক্তি ও সাহসে ভরপুর। আপনারা দীপ্তিমান, সুদর্শন, মহিষের মতো বলবান, হাতির শুঁড়ের মতো বাহু, পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। আপনাদের জ্যোতির দ্বারা পর্বতের অধিপতি পর্যন্ত আলোকিত; রাজ্য শাসনে যোগ্য, দেবতুল্য, কীভাবে এখানে এসেছেন?’’ ‘‘আপনারা দু’জন, পদ্মের পাপড়ির মতো চোখ, জটা পরিহিত, সব দিকেই একরকম, মনে হয় দেবলোক থেকে এসেছেন। যেন চাঁদ ও সূর্য একসাথে পৃথিবীতে এসেছে; আপনাদের বীরত্ব, প্রশস্ত বুক, দেবতুল্য অথচ মানবরূপে। সিংহের মতো কাঁধ, প্রচণ্ড শক্তি, গর্বিত মহিষের মতো, দীর্ঘ ও সুগঠিত বাহু যেন লোহার দণ্ড। সব অলংকারে সাজানোর যোগ্য, অথচ অলংকারহীন; আমি মনে করি, আপনারা এই পৃথিবী রক্ষার যোগ্য।’’ ‘‘সমগ্র পৃথিবী, বন ও সাগরসহ, বিন্ধ্য ও মেরু পর্বতে সজ্জিত; আর এই ধনুকগুলো সুন্দর, মসৃণ ও সুসজ্জিত। সোনায় মোড়ানো ইন্দ্রের বজ্রের মতো দীপ্তিমান; তূণীতে তীক্ষ্ণ তীর, দেখতেও সুন্দর। ভয়ঙ্কর, প্রাণনাশক, দগ্ধ তীর, তূণী সোনায় সাজানো। এই দুই তরবারি মুক্ত সর্পের মতো দীপ্তিমান; আমি কথা বলছি, আপনি কেন উত্তর দিচ্ছেন না?’’ ‘‘একজন ধর্মপরায়ণ সুগ্রীব আছেন, বানরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, যিনি ভাইয়ের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে দুঃখে পৃথিবী ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেই মহান সুগ্রীবের পাঠানো দূত হিসেবে আমি এসেছি; আমি হনুমান, বানরদের মধ্যে প্রধান। সেই ধর্মপরায়ণ সুগ্রীব আপনাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব কামনা করেন; আমাকে তাঁর মন্ত্রী হনুমান, পবনপুত্র হিসেবে জানুন। সুগ্রীবের জন্য আমি মুনিরূপে ছদ্মবেশে ঋষ্যমূক থেকে এসেছি, নিজের ইচ্ছামতো চলেছি, ইচ্ছামতো কাজ করেছি।’’ এইভাবে হনুমান, সুগ্রীবের আদেশে, রাম ও লক্ষ্মণের কাছে এসে তাঁদের পরিচয় জানিয়ে, তাঁদের উদ্দেশ্য বোঝার চেষ্টা করলেন।