লক্ষ্মণ, দেখো তো, এই পাম্পার জলে সর্বত্র কী অপরূপ সৌরভময় পদ্ম ফুটে আছে! যেন উদিত সূর্যের মতো উজ্জ্বল। পাম্পার স্বচ্ছ জলে পদ্ম আর নীল শাপলা ভেসে আছে, চারদিকে রাজহাঁস আর নানা জলপাখির মেলা, সুবাসিত ফুলে ফুলে শোভিত এই হ্রদ। চারপাশে পদ্মে ঘেরা পাম্পা যেন এক নবীন সূর্যের মতো দীপ্তিময়, মৌমাছিরা পদ্মের পরাগে মগ্ন, জলে ঝিকিমিকি আলো ঝলমল করছে। চক্রবাক পাখির কূজন, বনভূমির ঢাল, আর জল খুঁজতে আসা হাতি-হরিণের পাল—সব মিলিয়ে এই পরিবেশ কত সুন্দর! বাতাসে ঢেউ তুলে যখন পদ্মের পাপড়িগুলো দুলে ওঠে, তখন তারা যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, লক্ষ্মণ। অথচ, বৈদেহী—যার চোখ পদ্মপত্রের মতো প্রসারিত, যিনি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয়—তাঁকে না দেখে এই জীবনে আর কোন আনন্দ পাই না। আহা, কামনা কত বিচিত্র! এখনও সে আমার মনে বারবার ফিরে আসে—সে তো দুর্লভ, হারিয়ে গেছে, অথচ তার মধুর, শুভবচন আজও কানে বাজে। ইচ্ছা যদি আমায় আচ্ছন্ন করেই, তবে যদি এই বসন্তের ফুলেল ঋতু আবার আমায় ব্যথিত না করত! যা কিছু আগে তাঁর সাথে সুখের ছিল, আজ তাঁর অনুপস্থিতিতে সবই নিরানন্দ। আমার দৃষ্টি পদ্মের কুঁড়ি আর পাতার দিকে ছুটে যায়, মনে হয়—এ যেন সীতার চোখ! বাতাসে পদ্মের পরাগের সুবাস মিশে গাছের ফাঁক দিয়ে বয়ে আসে, যেন সীতার কোমল, মধুর নিঃশ্বাস। সুমিত্রানন্দন, দেখো তো, পাম্পার দক্ষিণ ঢালে কী অপূর্ব কর্ণিকার ফুল ফুটেছে! এই পর্বতরাজ নানা খনিজে সমৃদ্ধ, বাতাসে ধুলো উড়ে এক আশ্চর্য দৃশ্য সৃষ্টি করেছে। এখানকার পাহাড়ের ঢালে পত্রহীন, লাল রঙের কিমশুক গাছ ফুলে ফুলে জ্বলছে। পাম্পার তীরে জুঁই, মল্লিকা, পদ্ম আর করবীর গাছে মধুর সুবাসে চারদিক ভরে গেছে। কেতকী, সিন্ধুবর, বসন্তের নানা গাছ, সুগন্ধি মাধবী লতা, জুঁইয়ের ঝোপ—সবই এখানে ফুটে আছে। এখানে চিরিবিল্ব, মধুক, ভঞ্জুল, বকুল, চম্পক, তিলক, নাগ—সব গাছেই ফুল ফুটেছে। পদ্মক, নীল ফুলের অশোক, সিংহের কেশরের মতো হলুদ লোধ্র গাছ পাহাড়ের ঢালে শোভা পাচ্ছে। আরও আছে অঙ্কোল, কুরণ্ট, চূর্ণক, পারিভদ্র, আম, পাতল, কোবিদার—সব গাছেই ফুল। মুচুকুন্দ, অর্জুন, কেতকী, উদাল, শিরীষ, শিমশপা, ধব—সব গাছ পাহাড়চূড়ায় দেখা যাচ্ছে। শালমলী, কিমশুক, রক্ত কুরবক, টিনিশ, নক্তমাল, চন্দন, স্যন্দনও আছে। হিন্তাল, তিলক, নাগ—সব গাছ ফুলে ভরা, তাদের ডালে নানা লতা জড়িয়ে, ডগাগুলো ফুলে ঢাকা। দেখো, সুমিত্রানন্দন, পাম্পার তীরে কত সুন্দর গাছ, বাতাসে ডাল দুলছে, গাছগুলো পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। লতাগুলো যেন মাতাল অভিজাত নারীর মতো, এক গাছ থেকে আরেক গাছে, পাহাড় থেকে পাহাড়ে, বন থেকে বনে ছুটে বেড়াচ্ছে। বাতাস যেন নানা সুবাসে মুগ্ধ, কিছু গাছ ফুলে ভরা, মধুর মতো গন্ধ ছড়াচ্ছে। কিছু গাছে কুঁড়ি, রঙে গাঢ়, মনে হয়—'এটা একেবারে টাটকা, এটা মিষ্টি, এটা পুরোপুরি ফুটে উঠেছে।' মৌমাছি কামনায় বিভোর, ফুলে ডুবে যায়, আবার হঠাৎ উড়ে যায় অন্য কোথাও; এই মধুর সন্ধানে সে পাম্পার তীরের গাছ থেকে গাছে ঘুরে বেড়ায়। এখানকার মাটিতে নিজে থেকেই ঝরে পড়া ফুলের গুচ্ছ ছড়িয়ে আছে, যেন বিশ্রামের জন্য পাথরের বিছানা। সুমিত্রি, পাহাড়ের ঢালে নানা ফুলে ঢাকা পাথরগুলো চওড়া আর লালাভ সোনালি রঙে রাঙা হয়েছে। দেখো, সুমিত্রি, শীতকালেও গাছে গাছে কী অপূর্ব ফুল ফুটেছে; যেন পরস্পরের সংস্পর্শে গাছগুলো ফোটে উঠেছে। গাছে গাছে মৌমাছির গুঞ্জন, মনে হয় তারা একে অপরকে ডাকছে; ফুলে সাজানো ডালগুলো কত উজ্জ্বল, লক্ষ্মণ। এখানে কারণ্ডব পাখি স্বচ্ছ জলে ডুব দিচ্ছে, সঙ্গিনীর সাথে আনন্দে মগ্ন, যেন কামনা উসকে দিচ্ছে। মন্দাকিনীর এই মনোহর রূপ সত্যিই চমৎকার; তার মহিমা বিশ্বের দরবারে সুপরিচিত, আর সে সত্যিই মনোরম। যদি সেই ধর্মপরায়ণা নারীকে দেখতে পেতাম, আর এখানে থাকতে পারতাম, রঘুবংশশ্রেষ্ঠ, তবে ইন্দ্রলোকে বা অযোধ্যাতেও আমার মন টানত না। তাঁর সাথে এই মনোরম উপত্যকায় থাকলে কোনো চিন্তা থাকত না, আর কিছু চাওয়ারও থাকত না। এখানকার এই নানা ফুলে ও পাতায় সাজানো গাছপালা, এই বনে, প্রিয়াকে ছাড়া শুধু দুঃখই মনে করিয়ে দেয়। দেখো, সুমিত্রি, শীতল পদ্মে ভরা এই জল, চক্রবাক আর কারণ্ডব পাখিতে মুখর। পাম্পা আরও দীপ্তিময়, প্লব আর ক্রৌঞ্চ পাখিতে ভরা, নানা বন্যপ্রাণীর আনাগোনা, আর অসংখ্য পাখির ডাক। এই নানা রকম খুশি পাখিরা আমার আকুলতা আরও বাড়িয়ে তোলে, যেন আমার সেই শ্যামবর্ণ, পদ্মনয়না, চাঁদের মতো মুখশ্রী প্রিয়ার স্মৃতি জাগিয়ে দেয়। দেখো, ওই সুন্দর ঢালে হরিণেরা তাদের সঙ্গিনীর সাথে ঘুরে বেড়াচ্ছে; আর আমি, বৈদেহী—যার চোখ হরিণশাবকের মতো—তাঁর বিচ্ছেদে ব্যথিত হৃদয়ে এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছি।