রাবণের সামনে সীতার দৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান রাবণের ভয়ংকর উপস্থিতিতে সীতা শান্ত ও অবিচলিত কণ্ঠে বললেন, ‘‘যেমন যজ্ঞমণ্ডপটি ব্রাহ্মণদের মন্ত্রপাঠে পবিত্র হয়ে ওঠে, তখন চণ্ডালও যদি সেখানে উপস্থিত হয়, তবুও সে অপবিত্র করতে পারে না—ঠিক তেমনই, আমি একজন ধর্মপরায়ণা স্বামীর অনুগতা পত্নী, আমার ব্রত অটুট, তুমি যতই পাপী রাক্ষস হও না কেন, তুমি আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘যেমন পদ্মবনে খেলা করতে থাকা রাজহংস কখনও কাদার মধ্যে থাকা কুলশিকে দেখে না, তেমনি আমি তোমার নাগালের বাইরে। এই দেহটি জড়, তুমি চাইলে একে বেঁধে রাখো বা মেরে ফেলো—আমার দেহ বা প্রাণ রক্ষা করা আমার উদ্দেশ্য নয়, হে রাক্ষস।’’ ‘‘কিন্তু এই পৃথিবীতে আমার সতীত্ব আমি কখনও বিসর্জন দেব না।’’ এই বলে বৈদেহী ক্রোধে কঠোর ও তীক্ষ্ণ বাক্য উচ্চারণ করলেন। এরপর জনকনন্দিনী সীতা আর কিছু বললেন না, তাঁর সেই কঠোর ও কাঁপন-জাগানো কথা রাবণকে স্তব্ধ করে দিল। রাবণের হুমকি ও সীতার বন্দিত্ব তখন রাবণ ভয় দেখানোর জন্য বলল, ‘‘ও মৈথিলী, সুন্দরী! আমার কথা শোনো—তোমার সামনে বারো মাস সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে তুমি যদি আমাকে গ্রহণ না করো, তাহলে আমার পাচকেরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে প্রাতঃরাশে রাঁধবে।’’ এই ভয়ঙ্কর কথা বলে রাবণ রাক্ষসীদের উদ্দেশে রাগে গর্জে উঠল, ‘‘এই সঙ্গে থাকা ভয়ংকর, বিভৎস রাক্ষসীরা, যারা মাংস ও রক্ত ভক্ষণে অভ্যস্ত, তারা যেন তার অহংকার চূর্ণ করে দেয়।’’ রাবণের আদেশে সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসীরা হাত জোড় করে মৈথিলীর চারপাশে ঘিরে ধরল। রাবণ আবার পায়ের শব্দে মাটি কাঁপিয়ে তাদের বলল, ‘‘মৈথিলীকে অশোকবনের মাঝখানে নিয়ে যাও, তাকে তোমরা ঘিরে রেখে পাহারা দাও, যেন সে কারও নজরে না পড়ে।’’ ‘‘সেখানে কঠোর হুমকি দিয়ে, আবার কখনও মধুর কথায়, এই মিথিলার কন্যাকে বশে আনো, যেমন বন্য হাতিনিকে প্রশমিত করা হয়।’’ রাবণের আদেশে সেই রাক্ষসীরা সীতাকে নিয়ে গেল অশোকবনে। সেই বন ছিল নানা ফল-ফুলে সুশোভিত, আকাঙ্ক্ষিত ফলগাছে পরিপূর্ণ, আর নেশাগ্রস্ত পাখিদের কোলাহলে মুখরিত। সীতার শোক ও যন্ত্রণার চিত্র সেখানে জনকের কন্যা সীতা, দুঃখে ক্লান্ত, রাক্ষসীদের হাতে বন্দী হলেন, যেন হরিণী বাঘিনীদের মাঝে পড়েছে। গভীর শোকে দগ্ধ হয়ে তিনি শান্তি খুঁজে পেলেন না, যেন জালে আটকে থাকা আতঙ্কিত হরিণী। সেই অশোকবনে, রাক্ষসীদের ভয়ংকর চাহনিতে ও কঠোর হুমকিতে সীতা শান্তি পেলেন না; প্রিয় স্বামী ও দেবরকে স্মরণ করে তিনি ভয়ে ও দুঃখে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়লেন। রামের ফিরে আসা ও অশুভ সংকেত এদিকে, মহর্ষি বাল্মীকি রচিত পবিত্র রামায়ণের অরণ্যকাণ্ডের সাতান্নতম সর্গ শুরু হচ্ছে। রাম তখন দ্রুত গতিতে সেই মায়ামৃগ মারীচকে বধ করে আশ্রমের পথে ফিরছিলেন। তাঁর মনে ছিল কেবল মৈথিলীর চিন্তা। হঠাৎ পেছন থেকে এক শিয়ালের করুণ, ভীতিকর ডাক শুনতে পেলেন তিনি। সেই ভয়াবহ শব্দ শুনে রাম শঙ্কিত হলেন, মনে মনে ভাবলেন, ‘‘এই শিয়ালের ডাক নিশ্চয়ই অশুভ সংকেত; বৈদেহীর যেন কিছু না হয়, রাক্ষসদের যেন সে কোনো অনিষ্টের শিকার না হয়।’’ তিনি ভাবলেন, ‘‘যদি লক্ষ্মণ সেই ডাক শুনে—যা মারীচ আমার কণ্ঠ অনুকরণ করে হরিণরূপে দিয়েছে—তাহলে সুমিত্রানন্দন লক্ষ্মণ সীতার অনুরোধে আমাকে সাহায্য করতে চলে আসবে, আর সীতাকে একা রেখে যাবে।’’ রাম বুঝলেন, ‘‘নিশ্চয়ই রাক্ষসেরা সীতার অনিষ্ট চেয়েছে; এক সোনার হরিণের ছলনায় আমাকে কুটির থেকে দূরে সরিয়ে এনেছে। আমাকে দূরে নিয়ে গিয়ে মারীচ আমার বাণে বিদ্ধ হয়ে 'হায় লক্ষ্মণ, আমি মরে গেলাম!' বলে চিৎকার করেছিল।’’ তিনি আরও ভাবলেন, ‘‘আমি কুটির থেকে চলে আসায়, জনককন্যা ও লক্ষ্মণ—এই দু'জনের যেন মঙ্গল হয়। জনস্থানার ঘটনার জন্য আমি রাক্ষসদের শত্রু হয়েছি।’’ রাম দেখলেন, চারপাশে নানা অশুভ লক্ষণ দেখা দিচ্ছে। তিনি দ্রুত ফিরে চললেন, মনে মনে ভাবতে লাগলেন, কীভাবে এক রাক্ষস হরিণরূপে তাঁকে ফাঁদে ফেলেছিল। রামের উদ্বেগ ও লক্ষ্মণের আগমন চিন্তায় উদ্বিগ্ন রাম দ্রুত জনস্থানায় ফিরলেন। তাঁর মন ভারাক্রান্ত দেখে বনজ প্রাণী ও পাখিরাও তাঁর চারপাশে জড়ো হয়ে করুণ সুরে ডাকতে লাগল, যেন তারাও তাঁর দুঃখ ভাগ করে নিচ্ছে। তাঁকে বাম পাশে রেখে তারা ভয়ংকর শব্দ করল। এসব অশুভ লক্ষণ দেখে রাম আরও দ্রুত নিজের কুটিরের দিকে ছুটলেন। তখন তিনি লক্ষ্মণকে দেখতে পেলেন, যিনি ক্লান্ত ও বিমর্ষ চেহারায় কাছে আসছিলেন। দুই ভাই একে অপরের কাছে এলেন—দুজনেই উদ্বিগ্ন ও দুঃখে ক্লিষ্ট। রামের অভিযোগ ও শঙ্কা রাম লক্ষ্মণকে ডেকে তাঁর বাম হাত ধরে মৃদু তিরস্কারে বললেন, ‘‘হায় লক্ষ্মণ, তুমি সীতাকে এই রাক্ষস-আক্রান্ত বনে একা রেখে চলে এসেছ—এটা সত্যিই নিন্দনীয়।’’ ‘‘তুমি এখানে চলে এসেছ, সীতাকে একা রেখে—তবুও তাঁর মঙ্গল হোক! কিন্তু, হে বীর, আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই—জনককন্যা হয়তো ইতিমধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন, অথবা রাক্ষসেরা তাঁকে খেয়ে ফেলেছে; কারণ আমার সামনে শুধু অশুভ লক্ষণই দেখা যাচ্ছে।’’ ‘‘হে লক্ষ্মণ, আমরা কি আদৌ জনকের কন্যা, আমাদের প্রিয় সীতার কোনো চিহ্ন খুঁজে পাব, যখন তিনি এখনো জীবিত?’’ এভাবেই, সীতার সতীত্ব, রাবণের হুমকি, রাক্ষসীদের হাতে তাঁর বন্দিত্ব, আর রামের উদ্বেগ ও শোক—সব মিলিয়ে অরণ্যকাণ্ডের এই অধ্যায়ে এক গভীর বেদনা ও উত্তেজনার চিত্র ফুটে ওঠে।