রাবণের হাতে অপহৃত হয়ে, সীতার হৃদয় ছিল ব্যাকুল। তিনি, যিনি স্বামীর প্রাণাধিক প্রিয়া এবং সম্পূর্ণ অসহায়, চারপাশে তাকিয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘‘হে প্রিয়, যদি কখনো আমার স্বামীর কোনো স্নেহভাজনকে দেখো, তবে তাকে বলো—রাবণ আমাকে অপহরণ করেছে।’’ তিনি দৃঢ় বিশ্বাসে আরও বললেন, ‘‘রাম, যিনি বলবান ও পরাক্রমশালী, তিনি এই সংবাদ জানলে স্বয়ং বৈবস্বত যমের কবল থেকেও তাঁর বীরত্বে আমাকে উদ্ধার করবেন।’’ এইভাবে দুঃখে আকুল হয়ে, কাঁদতে কাঁদতে, করুণ স্বরে সীতা চতুর্দিকে তাকালেন। তখন তিনি দেখলেন, এক বৃক্ষের উপরে বসে আছেন বিশাল দেহী, মহান গৃধ্ররাজ জটায়ু। রাবণের কবলে বন্দী হয়ে, সীতা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে, বিষণ্ণ কণ্ঠে জটায়ুকে সম্বোধন করলেন, ‘‘হে মহাবীর, দেখো, আমি কেমন নিরুপায়ের মতো এই নিষ্ঠুর রাক্ষসরাজ রাবণের হাতে বন্দী হয়ে যাচ্ছি।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘এই নিষ্ঠুর রাত্রিচরকে তুমি রুখতে পারবে না; সে প্রবল, ছলনাময়, অস্ত্রধারী ও দুষ্টচরিত্র। জটায়ু, তুমি রামকে আমার অপহরণের কথা সত্য করে জানাবে, এবং লক্ষ্মণকেও সব কিছু নির্ভয়ে বলবে।’’ এদিকে, তখন জটায়ু সম্পূর্ণ জাগ্রত ছিলেন না। কিন্তু হঠাৎ সেই করুণ আর্তনাদ শুনে তৎক্ষণাৎ তিনি চমকে উঠলেন, রাবণ ও বৈদেহী সীতাকে দেখতে পেলেন। তখন গৃধ্ররাজ, পর্বতের শিখরের মতো ধারালো ঠোঁটবিশিষ্ট, সেই বৃক্ষের উপর থেকে শুভবাক্য উচ্চারণ করলেন। তিনি বললেন, ‘‘হে দশমুখী রাবণ, এক সময় তুমি ধর্মে স্থিত, সত্যনিষ্ঠ ছিলে। ভাই, আজ কেন এই নিন্দনীয় কর্মে প্রবৃত্ত হলে? আমি গৃধ্ররাজ জটায়ু, পাখিদের রাজা, মহেন্দ্র ও বরুণের তুল্য শক্তিশালী। রাম, দশরথপুত্র, সর্বপ্রাণীর কল্যাণে নিবেদিত; এই মহীয়সী নারী তাঁর পত্নী, এই জগতের অধিপতির ধর্মপত্নী। তুমি যাকে হরণ করতে চাও, তিনি সীতা—নন্দিনী, সুমূর্তিময়ী। ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাজা কখনও অন্যের পত্নীতে স্পর্শ করেন না। বিশেষত, রাজা পরস্ত্রীদের রক্ষা করেন, হে মহাবীর; অন্যের পত্নীকে আকাঙ্ক্ষা করে এই অধর্মের পথ থেকে ফিরে এসো।’’ জটায়ু আরও উপদেশ দিলেন, ‘‘বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনও নিন্দনীয় কর্ম করেন না; যেমন নিজের পত্নীকে রক্ষা করে, তেমনই অন্যের পত্নীকেও রক্ষা করা উচিত। লাভ বা কামনার জন্য হলেও, ধর্মবুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি শাস্ত্রে নির্ধারিত না হলেও সঠিক পথ খুঁজে নেন, হে পুলস্ত্যবংশীয়। রাজা, ধর্ম, কাম ও অর্থ—এই চারিই শ্রেষ্ঠ সম্পদ; রাজা থেকেই ধর্ম ও অধর্ম, সমৃদ্ধি ও ক্ষয়—সবকিছু নির্গত হয়।’’ তিনি তীব্রভাবে প্রশ্ন করলেন, ‘‘তুমি চঞ্চল ও দুষ্ট প্রকৃতির হয়েও রাজ্যাধিকারী হলে কেমন করে? দুষ্ট ব্যক্তি স্বর্গীয় রথে আরোহণ করলে যেমন হয়! কামনায় গাঁথা বিষয় সহজে দূর হয় না; কারণ সদাচার দুষ্টের গৃহে দীর্ঘস্থায়ী হয় না। রাম, মহাবীর ও ধর্মনিষ্ঠ, তোমার রাজ্য বা নগরে কোনো অপরাধ করেননি; তবে কেন তুমি তাঁকে কষ্ট দিচ্ছ?’’ জটায়ু স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘‘যদি খর, শূর্পণখার কারণে জনস্থানে এসে, সীমা লঙ্ঘন করে, রামের হাতে নিহত হয়—তাহলে বলো, রামের কী অপরাধ? সত্য করে বলো, তুমি জগতের স্বামীর পত্নী অপহরণ করে কোথায় যাচ্ছ?’’ তিনি সতর্ক করলেন, ‘‘বৈদেহীকে দ্রুত মুক্তি দাও, নইলে তাঁর কঠিন দৃষ্টিতে তুমি দগ্ধ হবে, যেমন ইন্দ্রের বজ্রাঘাতে বৃত্রাসুর দগ্ধ হয়েছিল। তুমি বুঝতে পারছ না, তোমার বস্ত্রের কণ্ঠায় বিষধর সাপ বেঁধেছ; মৃত্যুর ফাঁস তোমার গলায় পড়ে গেছে, তাও দেখতে পাচ্ছ না।’’ জটায়ু আরও উপদেশ দিলেন, ‘‘শুধু সেই ভার বহন করা উচিত, যা মানুষকে দুর্বল করে না; কেবল সেই আহার গ্রহণ করা উচিত, যা পরিপাকের পর ক্ষতি না করে। এমন কী কর্ম, যা না ধর্ম, না কীর্তি, না স্থায়ী যশ এনে দেয়—শুধু দেহকে ক্লান্ত করে?’’ জটায়ু জানালেন, ‘‘ষাট হাজার বছর ধরে, রাবণ, আমি আমার পিতামহদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত এই রাজ্য সঠিকভাবে পালন করেছি। আমি বৃদ্ধ, তুমি তরুণ, ধনুর্বান, রথ ও বর্মধারী; তবুও, বৈদেহীকে আমার চোখের সামনে থেকে নিয়ে যেতে পারবে না। যেমন যুক্তি ও ন্যায়ে প্রতিষ্ঠিত বেদজ্ঞান কেড়ে নেওয়া যায় না, তেমনি আমি থাকতে সীতাকে তুমি নিয়ে যেতে পারবে না।’’ তিনি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বললেন, ‘‘যদি সত্যিই বীর হও, তবে যুদ্ধ করো, রাবণ! এক মুহূর্ত দাঁড়াও; তুমি খর যেমন ভূমিতে লুটিয়ে পড়েছিলে, তেমনই পড়বে। যিনি বহুবার দানব-দৈত্য বধ করেছেন, সেই তপোধারী রামের হাতে শীঘ্রই তুমি যুদ্ধে নিহত হবে।’’ জটায়ু বললেন, ‘‘আমি কী করব, রাজপুত্ররা তো অনেক দূরে চলে গেছেন। তবে, তুমি তাদের ভয়ে নিশ্চয়ই ধ্বংস হবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, রামপ্রিয়, পদ্মলোচনা, এই শুভলক্ষণা সীতাকে তুমি নিতে পারবে না।’’ তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন, ‘‘তবু, মহাত্মা রামের প্রিয় ও দশরথের জন্য আমি যা করতে পারি, জীবন দিয়েও তা করব। দাঁড়াও, দাঁড়াও, দশমুখী! এক মুহূর্ত অপেক্ষা করো, রাবণ। তোমার উৎকৃষ্ট রথ থেকে তোমাকে ছিঁড়ে ফেলে দেবো, যেন ডাল থেকে ফল পড়ে। আমি আমার সাধ্য অনুযায়ী তোমাকে যুদ্ধ-অতিথ্যি দেব, হে রাত্রিচর।’’ এবার শুরু হলো মহারোমাঞ্চকর যুদ্ধ। রাবণ, রাক্ষসরাজ, রক্তবর্ণ চোখে, দীপ্তিময় সুবর্ণ কুণ্ডল পরে, প্রচণ্ড ক্রোধে গৃধ্ররাজের দিকে ধেয়ে এলেন। দুই মহাবীরের মধ্যে আকাশে মেঘের সংঘর্ষের মতো প্রচণ্ড ও ভয়ংকর সংঘর্ষ শুরু হলো। গৃধ্র ও রাক্ষস—উভয়েই পাখাবিশিষ্ট ও মাল্যপরিহিত—দুই মহাপর্বতের মতো এক অভূতপূর্ব যুদ্ধের ময়দানে মুখোমুখি হলেন।