রামচরিতমানসের এই অংশে, সীতা রামকে উদ্দেশ্য করে গভীর উদ্বেগ ও স্নেহের সাথে কথা বলেন। তিনি রামের বনযাত্রা দেখে মন অস্থির হয়ে পড়েছে, এবং তাঁর বিদায়ের কথা ভাবতে ভাবতে সীতা চিন্তা করেন, সত্যিই কী তাঁর জন্য কল্যাণকর হবে। সীতা বলেন, “হে বীর, তোমার দণ্ডকবনের যাত্রায় আমার কোন আনন্দ নেই। কেন তা বলছি, শুনো। তুমি ধনুক-বাণ ধারণ করে তোমার ভাইয়ের সাথে বনবাসে যাচ্ছো; বনবাসীদের দেখে যেন তাদের ওপর তোমার বাণ প্রয়োগ না হয়।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্ষত্রিয়দের কাছে ধনুক আগুনের জন্য জ্বালানির মতো; ধনুক হাতে থাকলে তাদের শক্তি ও উদ্যম অনেক বেড়ে যায়। অতীতের এক ঘটনা স্মরণ করে সীতা বলেন, একবার এক মহান, সত্যবাদী, শুদ্ধ তপস্বী এক পবিত্র বনে বাস করতেন, তিনি হরিণ ও পাখিদের সান্নিধ্যে আনন্দ পেতেন। তাঁর তপস্যা বিঘ্নিত করতে ইন্দ্র, দেবরাজ শচীপতি, যোদ্ধার রূপে তলোয়ার হাতে তাঁর আশ্রমে আসেন। সেই আশ্রমে ইন্দ্র একটি উৎকৃষ্ট তলোয়ার রেখে যান, এবং তপস্বী তা আমানত হিসেবে গ্রহণ করেন, তপস্যায় নিমগ্ন থাকেন। তিনি সেই অস্ত্র রক্ষা করতে সদা সচেষ্ট থাকেন, বনভ্রমণে ও ফল-মূল সংগ্রহে কখনও তলোয়ার ছাড়া যান না। অস্ত্র বহন করতে করতে তাঁর মন ক্রমে কঠিন হয়ে যায়, এবং তিনি তপস্যা থেকে সরে গিয়ে হিংসায় লিপ্ত হন। অবশেষে, অস্ত্রের সংস্পর্শে তিনি অধর্মে প্রবৃত্ত হয়ে নরকে পতিত হন। সীতা বলেন, “এই ঘটনা অস্ত্র ব্যবহারের কারণ দেখায়; যেমন আগুনের জন্য কারণ আছে, তেমনি অস্ত্রের ব্যবহারেও কারণ আছে। স্নেহ ও শ্রদ্ধা থেকে আমি তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—ধনুক হাতে নিয়ে যেন কখনও এমন আচরণ না করো।” তিনি আরও বলেন, “দণ্ডকবনের রাক্ষসদের বিনা অপরাধে হত্যা করলে পৃথিবী তা সমর্থন করবে না। ক্ষত্রিয়দের জন্য ধনুকের একমাত্র কর্তব্য, দুঃখিতদের রক্ষা করা।” সীতা প্রশ্ন করেন, “অস্ত্র আর বন, ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য আর তপস্যা—সবই আমাদের দ্বারা মিশে গেছে; দেশের ধর্ম মান্য হওয়া উচিত। অস্ত্রের চর্চা থেকে কু-মন ও অশুদ্ধতা জন্মায়; যখন তুমি অযোধ্যায় ফিরে যাবে, তখন আবার ক্ষত্রিয়ের ধর্ম পালন করবে।” তিনি বলেন, “যদি তুমি রাজ্য ত্যাগ করে তপস্বী হয়ে থাকো, তাহলে শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে আমার সম্পর্ক আরও গভীর হতো। ধর্ম থেকেই সম্পদ ও সুখ আসে; ধর্মেই সবকিছু নিহিত—এই পৃথিবী ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নানা সাধনার মাধ্যমে, চেষ্টা করে দক্ষতায় ধর্ম অর্জিত হয়; ভোগে কখনও সুখ পাওয়া যায় না। হে শান্ত-স্বভাব, সর্বদা মন পবিত্র রাখো, এই তপস্যার বনে ধর্ম পালন করো; তিন বিশ্বের সত্যও তোমার কাছে জানা। নারীর চঞ্চলতা থেকেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে; কে তোমাকে ধর্ম শেখাবে? ভাইয়ের সাথে আলোচনা করে যেটা পছন্দ হয়, তা করো।” এ পর্যায়ে বর্ণনা আসে—এখন দশম অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এই স্নেহময় ও ধর্মময় কথাগুলি বৈদেহী সীতা তাঁর স্বামী রামকে বলেছিলেন। রাম, ধর্মে দৃঢ়, সীতার কথা শুনে উত্তর দেন। তিনি বলেন, “তুমি উপকারী কথা বলেছো, স্নেহে পূর্ণ, উচ্চ বংশের ও ধর্মজ্ঞা হিসেবে যথার্থ। তুমি নিজেই বলেছো, ‘ক্ষত্রিয়রা ধনুক বহন করে যাতে কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার না করে।’” রাম ব্যাখ্যা করেন, “দণ্ডকবনের তপস্বী ঋষিরা, যাঁরা কঠিন ব্রত পালন করেন, নিজেরাই আমার কাছে এসেছেন আশ্রয় চেয়ে। ঋষিরা ঋতু অনুযায়ী বনবাস করেন, ফল-মূল খেয়ে থাকেন, কিন্তু রাক্ষসদের নিষ্ঠুর আচরণে তারা সুখী নন। সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসরা মানুষের মাংস খেয়ে, দণ্ডকবনের তপস্বীদের গ্রাস করে।” ঋষিরা রামকে বলেন, “আমরা তোমার ওপর নির্ভর করি।” রাম তাদের কথা শুনে বিনয়ের সাথে বলেন, “তোমরা আমার প্রতি সদয় হও; আমার মনে গভীর নম্রতা রয়েছে।” অতিথি হিসেবে আসা ব্রাহ্মণদের সামনে রাম জিজ্ঞাসা করেন, “আমি কী করবো?” ঋষিরা বলেন, “হে রাম, আমরা খুব কষ্টে আছি; আমাদের রক্ষা করো। বিশেষ করে যজ্ঞ ও উৎসবের সময়, হে নির্দোষ, সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসরা আমাদের অত্যাচার করে; তপস্যানিষ্ঠ ঋষিরা তাদের দ্বারা নিপীড়িত হন। আমরা তোমার কাছে আশ্রয় নিয়েছি। তপস্যার শক্তি দিয়ে আমরা রাত্রিচরদের ধ্বংস করতে পারি, কিন্তু দীর্ঘদিনের অর্জিত তপস্যা নষ্ট করতে চাই না। তপস্যা নানা বাধায় পূর্ণ ও কঠিন, হে রাঘব। তাই রাক্ষসরা আমাদের খেয়ে ফেললেও আমরা শাপ দিই না।” ঋষিরা আরও বলেন, “দণ্ডকবনের তপস্বীরা রাক্ষসদের দ্বারা কষ্ট পাচ্ছেন; তুমি ও তোমার ভাই আমাদের রক্ষা করো, কারণ আমরা তোমার আশ্রয়ে আছি। আমার কাছ থেকে এই কথাগুলি শুনে, আমি ঋষিদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি—জীবিত থাকাকালীন আমি কখনও আমার কথা ভাঙবো না। ঋষিদের প্রতি অন্যরকম আচরণ করা আমার কাছে কখনও গ্রহণযোগ্য নয়; প্রয়োজনে আমি জীবন, তোমাকে, কিংবা লক্ষ্মণকেও ত্যাগ করতে পারি।” এইভাবে, সীতার উদ্বেগ ও ধর্মবোধের কথা শুনে রাম তাঁর কর্তব্য, ঋষিদের আশ্রয় ও প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেন, এবং তাঁদের রক্ষা করার অঙ্গীকার প্রকাশ করেন।