রামচরিতের এই অংশে, রাম ও সীতা দণ্ডকারণ্য গমন করেছেন। রামের ভাইয়ের সঙ্গে ধনুক-বাণ নিয়ে দণ্ডকারণ্য যাত্রার জন্য তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। রামের এই যাত্রা দেখে সীতার মন অশান্ত হয়ে ওঠে; তিনি উদ্বেগে ভাবেন, কীভাবে রামের জন্য সত্যিই কল্যাণকর হবে। সীতা স্পষ্ট বলেন, রামের দণ্ডকারণ্য যাত্রায় তাঁর আনন্দ নেই; তিনি কারণটি জানাতে চান। সীতা বলেন, রাম ধনুক-বাণ নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে বনভূমিতে গেছেন; সেখানে বনবাসীদের দেখে যেন তিনি তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহার না করেন। তিনি স্মরণ করান, ক্ষত্রিয়দের জন্য ধনুক আগুনের জ্বালানির মতো; কাছে থাকলে তাঁদের শক্তি ও উদ্যম প্রবল হয়। অতীতের একটি ঘটনার কথা তুলে ধরেন সীতা—একবার, এক মহাবীর্যবান, সত্যবাদী, বিশুদ্ধ এক তপস্বী পবিত্র অরণ্যে বাস করতেন, তিনি হরিণ ও পাখিদের সঙ্গ উপভোগ করতেন। তাঁর তপস্যায় বাধা দিতে ইন্দ্র, শচীর স্বামী, যোদ্ধার রূপ নিয়ে তপস্বীর আশ্রমে আসেন, হাতে তীক্ষ্ণ তলোয়ার। সেই আশ্রমে তলোয়ারটি রাখা হয়, আমানতের নিয়মে, যখন তপস্বী তপস্যায় নিমগ্ন ছিলেন। সেই অস্ত্র পেয়ে তপস্বী আমানত রক্ষায় মনোনিবেশ করেন; বনভূমিতে ঘুরতে ঘুরতে তিনি নিজেই তা রক্ষা করেন। মূল, ফল সংগ্রহ করতে গেলেও কখনও তলোয়ার ছাড়া যাননি; আমানত রক্ষায় সদা সচেতন থাকতেন। অস্ত্রটি সর্বদা বহন করতে করতে তপস্বীর মন ক্রমশ কঠোর হয়ে যায়, তিনি তপস্যার সংকল্প ত্যাগ করেন। এরপর, তিনি হিংসায় লিপ্ত হন, ধর্মচ্যুত হয়ে, অস্ত্রের সঙ্গেই নরকগমন করেন। সীতা বলেন, এভাবেই অস্ত্র ব্যবহারের কারণ পূর্বে ঘটেছিল; যেমন আগুনের কারণ থাকে, তেমনি অস্ত্র ব্যবহারেরও কারণ আছে। সীতা প্রেম ও শ্রদ্ধা থেকে রামকে স্মরণ করিয়ে দেন, তিনি যেন কখনও এমন আচরণ না করেন ধনুক বহনকালে। দণ্ডকারণ্যে বাস করা রাক্ষসদের যদি রাম বিনা শত্রুতা বা অপরাধে হত্যা করেন, পৃথিবী তা সমর্থন করবে না। ক্ষত্রিয়দের জন্য, অরণ্যে ধনুক হাতে আত্মসংযমী হয়ে কেবল ক্লিষ্টদের রক্ষা করাই কর্তব্য। সীতা প্রশ্ন করেন, অস্ত্রের সঙ্গে বনবাস, ক্ষত্রিয়ের কর্তব্যের সঙ্গে তপস্যা—সবকিছুই যেন মিশে গেছে; তাই দেশীয় নিয়ম মানা উচিত। অস্ত্রচর্চায় কু-মন ও অশুদ্ধতা জন্ম নেয়; যখন রাম অযোধ্যায় ফিরবেন, তখন আবার ক্ষত্রিয়ের কর্তব্য পালন করবেন। সীতা বলেন, যদি রাম রাজ্য ত্যাগ করে তপস্বী হয়ে থাকেন, তাহলে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে তাঁর অশেষ সখ্যতা থাকবে। তিনি স্মরণ করান, ধর্ম থেকেই অর্থ, ধর্ম থেকেই সুখ; ধর্মেই সবকিছু অর্জিত হয়—এই পৃথিবী ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত। নানা সাধনা ও প্রচেষ্টায় দক্ষতা অর্জন করে ধর্ম পাওয়া যায়; ভোগে সুখ নয়। সীতা বলেন, রাম যেন তাঁর মন সর্বদা বিশুদ্ধ রাখেন, অরণ্যের তপস্যায় ধর্ম পালন করেন; রামের কাছে তিন জগতের সত্যই জানা। তিনি বলেন, এই উপদেশ তাঁর মনে নারীর চঞ্চলতা থেকেই এসেছে; কে-ই বা রামকে ধর্মে উপদেশ দিতে পারে? রাম যেন ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করে যা ভালো লাগে, তা করেন। এখানে দশম অধ্যায় শুরু হয়। বৈদেহী, স্বামীর প্রতি ভক্তি থেকে এই কথা বলেন; শুনে, রাম, ধর্মে দৃঢ়, জানকীকে উত্তর দেন। রাম বলেন, সীতা, তুমি যা বলেছ, তা কল্যাণকর, প্রেমপূর্ণ, উত্তম পরিবার ও ধর্মজ্ঞানীর মতোই; জনক-কন্যা, তোমার কথায় আমি আনন্দিত। তুমি নিজেই বলেছ, ক্ষত্রিয়রা ধনুক বহন করেন, যাতে ক্লিষ্টদের আর্তনাদ না ওঠে—আমি কী বলব? দণ্ডকারণ্যের তপস্বীরা, যাঁরা ব্রতের দৃঢ়, তাঁরাই রামের কাছে এসে আশ্রয় চেয়েছেন। বনভূমিতে ঋতু অনুযায়ী বাস করে, মূল-ফল খেয়ে, তাঁরা সুখ পান না, কারণ রাক্ষসেরা নিষ্ঠুর কর্মে বাধা দেয়। সেই ভয়ংকর রাক্ষসেরা, যারা মানবমাংস খায়, দণ্ডকারণ্যের তপস্বীদের গ্রাস করে। সেই দ্বিজাতিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠরা রামকে বলেন, "আমরা তোমার ওপর নির্ভর করতে চাই।" তাঁদের কথা শুনে, রাম বিনয়ের সঙ্গে বলেন, "আপনারা আমার প্রতি সদয় হোন; এটি আমার গভীর নম্রতা।" অতিথি-রূপে ব্রাহ্মণরা যখন রামের কাছে আসেন, তিনি তাঁদের সামনে জিজ্ঞাসা করেন, "আমি কী করব?" তাঁরা বলেন, "আমরা খুব কষ্টে আছি, রাম; তুমি আমাদের রক্ষা করো। বিশেষত অর্ঘ্য ও উৎসবের দিনে, পাপহীন, ভয়ংকর রাক্ষসেরা আমাদের মাংসভক্ষী হয়ে অত্যাচার করে। তপস্বীরা রাক্ষসদের দ্বারা নিপীড়িত।" তাঁরা বলেন, "আমরা তোমার কাছে আশ্রয় নিয়েছি; তপস্যার শক্তিতে আমরা রাতের রাক্ষসদের ধ্বংস করতে পারি, কিন্তু আমরা দীর্ঘদিনের অর্জিত তপস্যা ভঙ্গ করতে চাই না। তপস্যা সর্বদা বহু বাধায় আক্রান্ত, কঠিন সাধনা। তাই, রাক্ষসেরা আমাদের ভক্ষণ করলেও আমরা অভিশাপ দিই না। দণ্ডকারণ্যের তপস্বীরা, রাক্ষসদের দ্বারা পীড়িত, তোমার কাছে রক্ষা চায়।" তাঁরা বলেন, "তুমি ও তোমার ভাই আমাদের রক্ষা করো, কারণ আমরা অরণ্যে তোমার আশ্রয়ে আছি।" রাম বলেন, "তপস্বীদের কাছে আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, জনক-কন্যা, তা আমি জীবিত থাকতে কখনও ভঙ্গ করব না।" এইভাবে, সীতা ধর্ম ও প্রেমের কথা বলেন, রাম তাঁর কর্তব্য ও প্রতিশ্রুতির কথা জানান; দণ্ডকারণ্যে তপস্বীদের রক্ষা, রাম ও সীতার জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে।