ধর্ম, সত্য, সাহস, সকল প্রাণীর প্রতি করুণা, মধুর ভাষণ, এবং দ্বিজ, দেবতা ও অতিথিদের যথাযথ সম্মান—এগুলোই সৎলোকেরা স্বর্গে যাওয়ার পথ বলে ঘোষণা করেছেন। এই বিষয়টি যথাযথভাবে বুঝে, ব্রাহ্মণরা একাগ্রচিত্তে সঠিকভাবে ধর্মাচরণ করে, সর্বদা সতর্ক থেকে পরলোকে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা করেন। রাম তখন বললেন, ‘‘আমার পিতার সেই কাজ আমি নিন্দা করি, যিনি তোমাকে গ্রহণ করেছিলেন, অথচ তোমার মন সৎপথ থেকে বিচ্যুত। যে ব্যক্তি এমন ভুল ধারণা নিয়ে কাজ করে, সে প্রকৃতপক্ষে নাস্তিক এবং ধর্মপথ থেকে সরে গেছে।’’ তিনি আরও বললেন, ‘‘যেমন চোর, তেমনি এমন মনোবৃত্তির মানুষকেও জানো। নাস্তিকতাই সেই অবস্থার সমান; তাই সকলের মধ্যে সবচেয়ে সন্দেহজনক নাস্তিক। জ্ঞানীরা কখনো তার সঙ্গে মিশবেন না।’’ রাম আরও স্মরণ করিয়ে দিলেন, ‘‘তোমার পূর্বেও আরও মহৎ ব্যক্তিরা বহু শুভকর্ম করেছেন, এই লোক ও পরলোক জয় করেছেন; অতএব, ব্রাহ্মণগণ, যজ্ঞ ও দান সর্বদা শুভ। যারা ধর্মে স্থিত, সজ্জনদের সঙ্গে যুক্ত, দান ও গুণে শ্রেষ্ঠ, অহিংস এবং কলঙ্কহীন—তাদেরই এই জগতে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়।’’ রামের এই ক্রুদ্ধ বাক্য শোনার পর, সেই ব্রাহ্মণ সত্য, বিশ্বস্ত ও কোমলভাবে জবাব দিলেন, ‘‘আমি নাস্তিকদের কথা বলিনি, আমি নাস্তিক নই, আবার কিছুই নেই—এমনও নয়। সময়ের বিচারে আমি আবার বিশ্বাসী হয়েছি; অন্য সময়ে হয়তো নাস্তিকও হয়ে যেতে পারি। এখন সেই সময় এসেছে, যেমন আমি নাস্তিকতার কথা বলেছিলাম; কিন্তু, রাম, আমি তোমাকে ফেরানোর জন্য এবং তোমার কৃপা পাওয়ার জন্যই এ কথা বলেছিলাম।’’ এইভাবে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। রামের ক্রোধ দেখে তখন মহর্ষি বসিষ্ঠ বললেন, ‘‘জাবালিও এই জগৎচক্রের আগমন ও প্রস্থান জানেন। তিনি তোমাকে ফেরাতে চেয়েছিলেন, তাই এই কথা বলেছেন। এখন, হে পৃথিবীর অধিপতি, এই জগতের উৎপত্তি সম্পর্কে আমার কথা শোনো।’’ বসিষ্ঠ বললেন, ‘‘প্রথমে সবই ছিল জল, সেখানেই পৃথিবী গঠিত হয়। তখন স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা দেবতাদের সঙ্গে উদিত হন। পরে তিনি বরাহরূপে ধরিত্রীকে উত্তোলন করেন। চিরন্তন, অবিনশ্বর, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা আকাশ থেকে জন্ম নিয়ে তাঁর আত্ম-নিয়ন্ত্রিত পুত্রদের সঙ্গে সমগ্র সৃষ্টিকে সৃষ্টি করেন। তাঁর থেকেই জন্মান মরিচি, মরিচি থেকে কশ্যপ। কশ্যপ থেকে জন্মান বিবস্বান, বিবস্বান থেকে মনু, আর সেই মনুর পুত্র ইক্ষ্বাকু।’’ ‘‘মনুই প্রথম এই সমৃদ্ধ পৃথিবী ইক্ষ্বাকুকে দেন; তিনিই অযোধ্যার প্রথম রাজা। ইক্ষ্বাকুর বিখ্যাত পুত্র কুক্ষি, কুক্ষি থেকে বীর বিকুক্ষি। বিকুক্ষি থেকে বলশালী বাণ, বাণের পুত্র মহাবাহু অনরণ্য। অনরণ্যর রাজত্বে কখনো অনিয়মিত বৃষ্টি বা দুর্ভিক্ষ হয়নি, এবং সৎ মানুষের দেশে কোনো চোর ছিল না।’’ ‘‘অনরণ্যর পুত্র মহাবাহু পৃথু, পৃথু থেকে মহারাজ ত্রিশঙ্খু, যিনি নিজের সত্যব্রতের জন্য দেহে স্বর্গে গিয়েছিলেন। ত্রিশঙ্খুর পুত্র ধুন্ধুমার, ধুন্ধুমার থেকে মহাবলশালী যুবনাশ্ব। যুবনাশ্বর পুত্র বিখ্যাত মান্ধাতা, মান্ধাতা থেকে মহাবলশালী সুসন্ধি। সুসন্ধির দুই পুত্র—ধ্রুবসন্ধি ও প্রসেনজিত; ধ্রুবসন্ধি থেকে জন্ম নেন শত্রুনাশক ভরত।’’ ‘‘ভরত থেকে মহাবাহু অসিত; তাঁর বিরুদ্ধে হাহয়, তালজঙ্ঘ ও বীর শশিবিন্দুদের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাজারা উঠে আসেন। তিনি সকলকে যুদ্ধে প্রতিহত করে, নির্বাসনে গিয়ে, পর্বতের শিখরে মুনি হয়ে বাস করেন। বলা হয়, তাঁর দুই স্ত্রী ছিল, দুজনেই গর্ভবতী। এক স্ত্রী অপরের সন্তান নষ্ট করতে ঔষধ পান করান।’’ ‘‘তখন ভৃগুকুলীয় ঋষি চ্যবন হিমালয়ে বসবাস করছিলেন। কালিন্দী তাঁর কাছে গিয়ে সশ্রদ্ধে প্রণাম করলেন। ঋষি বুঝলেন তিনি পুত্র কামনা করেন, বললেন, ‘তুমি এক মহাত্মা, ধর্মবান, কীর্তিমান, বংশপ্রবর্তক ও শত্রুনাশী পুত্র লাভ করবে।’ আশীর্বাদ পেয়ে, পদক্ষিণা করে, পদ্মপলাশ-নয়না ও পদ্মগর্ভসম কান্তি নিয়ে তিনি ফিরে গিয়ে পুত্র প্রসব করলেন।’’ ‘‘কিন্তু অপর স্ত্রী শত্রুর সন্তান নাশ করতে পুনরায় ঔষধ পান করান। সেই ঔষধসহ পুত্র জন্ম নেন—তিনি হলেন সাগর। রাজা সাগর সমুদ্র খনন করেন এবং যজ্ঞোৎসবে অংশগ্রহণ করে তাঁর বেগে সকলকে ভীত করেন।’’ ‘‘সাগরের পুত্র অসমঞ্জ, যিনি জীবিত অবস্থায়ই পিতার দ্বারা কুকর্মের জন্য নির্বাসিত হন। অসমঞ্জের পুত্র বীর্যশালী অংসুমান, অংসুমানের পুত্র দিলীপ, দিলীপের পুত্র ভাগীরথ। ভাগীরথ থেকে ককুত্স্থ, তাঁর নামেই ককুত্স্থ বংশ বিখ্যাত, ককুত্স্থের পুত্র রঘু, তাঁর নামেই রঘুবংশ। রঘুর পুত্র বলশালী, কীর্তিমান, মানুষভক্ষক—তিনি কালমাষপাদ সৌদাস। তাঁর পুত্র শঙ্খন, পিতার শক্তি অর্জন করে সহস্র সেনা বিনষ্ট করেন।’’ ‘‘শঙ্খনের পুত্র বীর ও কীর্তিমান সুদর্শন, সুদর্শনের পুত্র অগ্নিবর্ণ, অগ্নিবর্ণের পুত্র শীঘ্রগ। শীঘ্রগের পুত্র মরু, মরুর পুত্র প্রশুশ্রুক, প্রশুশ্রুকের পুত্র অম্বরীষ, যিনি মহাপ্রভায় উজ্জ্বল। অম্বরীষের পুত্র নাহুষ, সত্য ও বীর্যে স্থিত; নাহুষের পুত্র নাভাগ, যিনি সর্বোচ্চ ধর্মপরায়ণ।’’ এভাবেই বসিষ্ঠ মহর্ষি রামচন্দ্রকে পূর্বপুরুষদের গৌরবময় বংশধারা এবং ধর্মের সুস্পষ্ট পথ স্মরণ করিয়ে দিলেন।