অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে, মহারাজ দশরথের পত্নী কৌশল্যা চরম শোক ও বেদনায় বিহ্বল হয়ে ছিলেন। তিনি স্বামী ও পুত্রবিয়োগে নিঃস্ব, আর সেই মুহূর্তে তাঁর সামনে উপস্থিত ভরত, যিনি গভীর অনুতাপ ও কষ্টে ক্লিষ্ট হয়ে কঠিন শপথ উচ্চারণ করছিলেন। কৌশল্যা তাঁর অন্তরের যন্ত্রণা ও ক্রোধকে শপথের ভাষায় প্রকাশ করতে থাকেন—এইসব শপথের মধ্য দিয়ে তিনি সেই ব্যক্তির প্রতি অভিশাপ উচ্চারণ করেন, যার সম্মতিতে শ্রেষ্ঠ পুরুষ রামকে বনবাসে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “যার সম্মতিতে এই মহৎ কর্ম সম্পন্ন হয়েছে, সে যেন পাপিষ্ঠ দাসের মতো দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, যেন সূর্যকে কলুষিত করে, কিংবা ঘুমন্ত গাভীকে পায়ে আঘাত করে। যে প্রভু দাসকে বড়ো বড়ো কাজ করায়, কিন্তু শেষে তাকে অপ্রয়োজনীয় ও পরিত্যক্ত করে দেয়, সেই অন্যায়ের ভাগ যেন তার ওপর পড়ে। যে রাজা নিজের প্রজাদের সন্তানতুল্য রক্ষা করে, আর তবুও কেউ তাকে বিশ্বাসঘাতকতা করে, সেই অপরাধও যেন তার ওপর বর্তায়। যে রাজা ন্যায্য কর আদায় করে, অথচ প্রজাদের রক্ষা করে না, সেই পাপও যেন তার ভাগ্যে জোটে। যে ব্যক্তি তপস্বীদের দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা প্রতারণার মাধ্যমে দেয় না, যুদ্ধক্ষেত্রে যেখানে হাতি, অশ্ব, রথ ও অস্ত্রের ভিড়, সৎকার্য অনুসরণ করে না, কিংবা জ্ঞানীর কাছ থেকে শাস্ত্রের সূক্ষ্ম অর্থ শিক্ষার পর তা ধ্বংস করে দেয়—এইসব পাপও যেন তার ওপর পড়ে। সে যেন কখনো রাজকীয় শোভায় চন্দ্র-সূর্যের মতো দীপ্তিমান বাহুবান ব্যক্তিকে দেখে না। সে যেন নিষ্ঠুর হয়ে দুধ-ভাত বা পায়েস বৃথা খায়, এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের অবজ্ঞা করে। সে যেন গাভীকে পায়ে স্পর্শ করে, নিজে বয়োজ্যেষ্ঠদের নিন্দা করে, এবং বন্ধুকে সম্পূর্ণভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করে। সে যেন অশুভ মনে গোপনে বলা কোনো নিন্দা প্রকাশ্যে বলে দেয়। সে যেন অকর্মণ্য, অকৃতজ্ঞ, আত্ম-পরিত্যক্ত, নির্লজ্জ ও সকলের দ্বারা ঘৃণিত হয়। নিজের গৃহে সন্তান, স্ত্রী ও দাস-দাসীদের মাঝে থেকেও সে যেন একা একা উৎকৃষ্ট আহার গ্রহণ করে। সে যেন উপযুক্ত পত্নী না পেয়ে নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে এবং কোনো সৎকর্ম সম্পাদন করতে না পারে। তার বংশ যেন ধ্বংস হয়ে যায়, স্ত্রীদের মধ্যে দুঃখে পড়ে, এবং আয়ুষ্কাল পূর্ণ না হয়। সে যেন রাজা, নারী, শিশু, বৃদ্ধ হত্যা বা দাস পরিত্যাগের পাপভাগী হয়। সে যেন সর্বদা লাক্ষা, মধু, মাংস, লোহা ও বিষে দাসদের পোষণ করে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পালাতে গিয়ে নিহত হয়। সে যেন হাতে খুলি নিয়ে, ছেঁড়া কাপড়ে মুড়ে, পাগলের মতো ভিক্ষা করতে করতে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায়। সে যেন সর্বদা মদ, নারী ও জুয়ার প্রতি আসক্ত হয়, কাম ও ক্রোধে পরাভূত হয়। তার মনে যদি ধর্মের চিন্তা জাগে, তবুও সে যেন অধর্মাচরণ করে এবং অযোগ্যকে দান দেয়। তার সঞ্চিত বিপুল সম্পদ যেন চোরে লুণ্ঠিত করে। যিনি সন্ধ্যা ও প্রভাতে ঘুমিয়ে পাপ করেন, সেই পাপও যেন তার ওপর পড়ে। যিনি অগ্নি-উপাসনা ত্যাগ করেন, গুরু-পত্নীকে অবমাননা করেন, বন্ধুকে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, সে যেন সেই পাপও ভোগ করে। সে যেন দেবতা, পিতৃপুরুষ, জননী বা পিতার সেবা না করে। সে যেন আজই সৎলোকের লোক, খ্যাতি ও সৎকর্ম থেকে পতিত হয়। সে যেন মায়ের সেবাও ত্যাগ করে, অকারণে দাঁড়িয়ে থাকে। বহু সন্তান থাকলেও দরিদ্র, জ্বর ও ব্যাধিতে কষ্টে ভোগে। সে যেন সমতুল্য, দুঃখিত, আশান্বিত ও প্রার্থনাকারীদের কাছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেয়। সে যেন সর্বদা প্রতারণায় আনন্দ পায়, কঠোর, কুৎসাকারী, অপবিত্র ও রাজভয়ে ভীত হয়ে, অধার্মিক হয়ে যায়। সে যেন স্নানশেষে প্রস্তুত সতী স্ত্রীকে অবমাননা করে। সে যেন নিজের বৈধ পত্নীকে ত্যাগ করে, পরস্ত্রীসঙ্গে যুক্ত হয় এবং ধর্মচ্যুত হয়। সে যেন বংশহীন ব্রাহ্মণের পাপভাগী হয়। সে যেন জল অপবিত্র করা বা বিষ দানের পাপ একা ভোগ করে। সে যেন অশুচি চিত্তে ব্রাহ্মণের জন্য নির্ধারিত পূজা বাধা দেয়, বা বাছুরের জন্য নির্দিষ্ট গাভীকে দোহন করে। জল থাকতে পিপাসার্তকে প্রতারিত করে সেই পাপও যেন তার হয়। অন্যেরা তার সামনে সত্য ও ধর্মের সন্ধানে তর্ক করলে, তাদের পাপও যেন তার ওপর পড়ে। এভাবে স্বামীর ও পুত্রের অভাবে কৌশল্যা নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু শোকের ভারে তিনি মূর্ছিত হয়ে পড়েন। ভরত, যিনি শোকে অচেতন, কঠিন শপথ উচ্চারণ করছিলেন, তাকে দেখে কৌশল্যা বললেন, “বৎস, তুমি যখন এই কঠিন শপথগুলো উচ্চারণ করছ, তখন আমার দুঃখ আরও বেড়ে যাচ্ছে, কারণ তুমি যেন আমার প্রাণটাই কাড়ছ।” এভাবেই কৌশল্যার হৃদয়ের গভীর যন্ত্রণা ও তার শাপসমূহের মধ্য দিয়ে শোকের ছায়া নেমে আসে অযোধ্যার রাজপ্রাসাদে।