তামসা নদীর মনোরম তীরে আশ্রয় নিয়ে রাঘব রামা সীতা ও লক্ষ্মণকে দেখলেন। তিনি সুমিত্রানন্দন লক্ষ্মণকে সস্নেহে বললেন, ‘‘লক্ষ্মণ, আজ বনবাসের প্রথম রজনী। বনবাস তোমার মঙ্গলময় হোক, চিত্ত যেন ব্যাকুল না হয়।’’ রামা চারিদিকে নির্জন অরণ্য দেখিয়ে বললেন, ‘‘দেখো, চারিদিকে বনভূমি যেন শূন্য, পশুপক্ষী তাদের আশ্রয়ে গুটিয়ে আছে—এ যেন গোটা অরণ্য আমাদের জন্য কাঁদছে। আজ অযোধ্যা নগরী, পিতার রাজধানি, নিশ্চয়ই আমাদের বিচ্ছেদে শোকাহত—পুরুষ-নারী সকলেই কাঁদছে, এতে সন্দেহ নেই। রাজা দশরথের অসংখ্য সদ্গুণে আকৃষ্ট জনসাধারণ আমার, তোমার, ভ্রাতা শত্রুঘ্ন ও ভরত—সবার জন্যই শোক করবে।’’ রামা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘‘আমার পিতা ও পুণ্যবতী মায়ের জন্য দুঃখ হয়। তারা যেন আমাদের জন্য অতিরিক্ত কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে না যান। তবে ন্যায়পরায়ণ ভরত নিশ্চয়ই ধর্ম, অর্থ ও কামের যুক্তিতে পিতা-মাতাকে সান্ত্বনা দেবে। বারবার ভরতের মমতা স্মরণ করলে আমার আর চিন্তা হয় না।’’ তিনি লক্ষ্মণকে বললেন, ‘‘লক্ষ্মণ, তুমি তোমার কর্তব্য পালন করেছো আমার সঙ্গে থেকে। এখন বৈদেহী সীতার নিরাপত্তায় তোমাকে সাহায্য করতে হবে। আজ এই নদীতীরে আমি বিশ্রাম নেবো, এ স্থান আমার ভালো লাগছে, যদিও বনভূমিতে অনেক আশ্রয় আছে।’’ এরপর রাঘব সুমন্ত্রকে বললেন, ‘‘সুমন্ত্র, সদা সতর্ক থেকো, ঘোড়াদের দেখাশোনা করো।’’ সূর্য অস্ত গেলে সুমন্ত্র ঘোড়াগুলিকে যথেষ্ট খাদ্য দিলেন এবং তাঁদের কাছেই রইলেন। সন্ধ্যার পূজার পর রামা ও লক্ষ্মণের শয্যা প্রস্তুত করলেন তিনি। তামসার তীরে পাতার বিছানায় রামা, সীতা ও লক্ষ্মণ শুয়ে পড়লেন। রামা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে লক্ষ্মণ সারারাত জেগে রামের গুণাবলি সুমন্ত্রকে বললেন। রাত কেটে সূর্য উঠল, তখনও লক্ষ্মণ সুমন্ত্রকে রামের গুণগান করছিলেন। তামসার দূরতম তীরে, যেখানে গবাদিপশুর পাল, সেখানেই রামা সঙ্গীদের নিয়ে রাত কাটালেন। সকালে জেগে রামা লক্ষ্মণকে বললেন, ‘‘লক্ষ্মণ, দেখো, এইসব অযোধ্যাবাসী নিজেদের ঘরবাড়ি ভুলে গাছের তলায় আমাদের জন্য পড়ে আছেন। এঁরা দৃঢ় সংকল্পে আমাদের ছাড়বেন না, প্রয়োজনে প্রাণও দেবেন।’’ রামা বললেন, ‘‘এঁরা এখন ঘুমোচ্ছেন, এই সুযোগে আমরা দ্রুত রথে চড়ে অজানা পথে এগিয়ে যেতে পারি। ইক্ষ্বাকুবংশীয় এই নাগরিকদের যেন আর কষ্ট না দিই। এঁরা নিজেদের কর্মে শোক পেয়েছেন, আমাদের দ্বারা যেন আর শোক না বাড়ে।’’ লক্ষ্মণ সম্মত হয়ে বললেন, ‘‘আপনি যেমন বলেন, তেমনই হোক; চলুন, দ্রুত রথে উঠি।’’ রামা সুমন্ত্রকে বললেন, ‘‘রথ প্রস্তুত করো, আমি অরণ্যে যাবো। দ্রুত চালাও, সুমন্ত্র।’’ সুমন্ত্র চটপট উৎকৃষ্ট ঘোড়ায় রথ জুড়ে হাতে জোড় করে জানালেন, ‘‘প্রভু, রথ প্রস্তুত। সীতা ও লক্ষ্মণসহ দ্রুত উঠুন, মঙ্গল হোক।’’ রামা, সীতা ও লক্ষ্মণ রথে উঠলেন। সুমন্ত্র তামসা নদী পার হলেন। নদী পার হয়ে রামা কাঁটাবিহীন, নিরাপদ পথ ধরলেন। নাগরিকদের বিভ্রান্ত করতে রামা সুমন্ত্রকে বললেন, ‘‘রথ উত্তরে ঘুরিয়ে চালাও। কিছুদূর গিয়ে আবার ফিরে এসো, যাতে নাগরিকেরা আমাদের পথ বুঝতে না পারে।’’ রামার নির্দেশমতো সুমন্ত্র রথ ঘুরিয়ে আবার রামার কাছে এলেন। তখন রামা ও লক্ষ্মণ সীতা সহ রথে উঠে আশ্রমের পথে রওনা হলেন। শুভ লক্ষণ দেখে দশরথনন্দন রামা রথ উত্তরে ঘুরিয়ে অরণ্যের পথে যাত্রা করলেন। এভাবে মহর্ষি বাল্মীকি রচিত মহারামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডের সাতচল্লিশতম সর্গ শুরু হয়। রাত কেটে গেলে, রামা-বিহীন নাগরিকেরা শোকাকুল হয়ে নিস্তব্ধ হয়ে রইলেন। বারবার চোখ মুছে তাঁরা রামার মুখও দেখতে পেলেন না। বেদনায় বিমর্ষ মুখে, সেই জ্ঞানী ও দয়ালু রামাকে হারিয়ে তাঁরা বিলাপ করলেন—‘‘ধিক সেই ঘুমকে, যা আমাদের মন ভুলিয়ে দেয়! আজ আমরা চওড়া-বক্ষ, বলবান রামাকে দেখতে পাচ্ছি না। কেমন করে সেই সত্যব্রত, মহাবীর রামা তাঁর প্রজাদের ছেড়ে, সন্ন্যাসীর মতো অরণ্যে চলে গেলেন?