রামায়ণের অযোধ্যা কাণ্ডের এই অধ্যায়ে এক গভীর আবেগঘন দৃশ্য unfolds হয়। রামের বনবাসের সময়, সুমিত্রা দেবী রামের মা কৌশল্যাকে সান্ত্বনা দেন। তিনি বলেন, "শীঘ্রই তুমি তোমার পুত্রকে বন্ধুদের সাথে দেখবে, সে তোমার সামনে নম্র হয়ে প্রণাম করবে। তখন তোমার চোখে আনন্দের অশ্রু ঝরবে, যেন বর্ষার মেঘ জল বর্ষণ করছে। তোমার সেই বরদানকারী পুত্র শীঘ্রই অযোধ্যায় ফিরে আসবে এবং তার কোমল, গোলাপি হাত দিয়ে তোমার পায়ে স্নেহভরে চাপ দেবে। যখন তুমি তোমার বীর সন্তানকে বন্ধুদের সাথে দেখে, তার প্রণাম ও শ্রদ্ধা দেখবে, তখন তোমার আনন্দের অশ্রুতে সে স্নাত হয়ে উঠবে, ঠিক যেমন পাহাড়ের ওপর মেঘের সারি জল ছিটিয়ে দেয়।" সুমিত্রা দেবী এভাবে কৌশল্যাকে নানা সান্ত্বনামূলক কথা বলে চুপ হয়ে যান। তার কথা শুনে কৌশল্যার দুঃখ যেন শরীর থেকে দূর হয়ে যায়, ঠিক যেমন শরৎকালের মেঘে আর জল থাকে না। এইভাবে অযোধ্যা কাণ্ডের চুয়াল্লিশতম অধ্যায় শেষ হয় এবং পঁয়তাল্লিশতম অধ্যায় শুরু হয়। রাম, যিনি মহান আত্মা ও সত্য সাহসিকতায় পরিপূর্ণ, যখন বনবাসের উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন অযোধ্যার জনগণ তার প্রতি গভীর ভক্তি নিয়ে তাকে অনুসরণ করতে থাকেন। রাজা, যিনি তাদের বন্ধু ও রক্ষক, কর্তব্যের কারণে ফিরে গেলেও, জনগণ রামের রথের পেছনে হাঁটতে থাকেন। অযোধ্যায় বসবাসকারী মানুষের কাছে রাম ছিলেন পূর্ণিমার চাঁদের মতো প্রিয়। সেই সময় নাগরিকরা অনুরোধ করলেও, কাকুত্স্থ বংশের রাম পিতার আদেশ রক্ষা করে বনবাসের পথে এগিয়ে যান। রাম স্নেহভরে জনগণের দিকে তাকিয়ে, যেন চোখ দিয়ে তাদের পান করছেন, কোমল ভাষায় বলেন, "অযোধ্যাবাসীদের আমার প্রতি যে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আছে, তা আমার জন্য বিশেষভাবে ভরতকে দেখাও। তিনি কৌশল্যার আনন্দের উৎস, সুশীল ও সদাচারী। তোমাদের জন্য তিনি যা প্রিয় ও কল্যাণকর, তা ঠিকভাবে করবেন। যদিও তিনি বয়সে তরুণ, তবু জ্ঞান ও নম্রতায় পরিপূর্ণ এবং বীরত্বে গুণান্বিত। তোমাদের জন্য তিনি উপযুক্ত অধিপতি হবেন, তোমাদের ভয় দূর করবেন। তিনি রাজগুণে পরিপূর্ণ এবং উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচিত। তাই আমার ও বয়োজ্যেষ্ঠদের নির্দেশ অনুযায়ী, তোমরা তার আদেশ মানবে। যেমন রাজা দুঃখিত হবেন না আমার বনবাসে, তেমনি আমাকেও সম্মান করে তোমরা তার সুখের জন্য কাজ করবে। যতই রাজা ধর্মে দৃঢ় ছিলেন, ততই জনগণ রামকে তাদের নায়ক হিসেবে কামনা করতেন।" রামের চোখ অশ্রুতে ভরা, তিনি সৌমিত্রি অর্থাৎ লক্ষ্মণকে নিয়ে যেন তার গুণে অযোধ্যাবাসীদের নিজের কাছে টেনে নিচ্ছেন। তখন দ্বিজদের মধ্যে যারা প্রবীণ, জ্ঞান, বয়স ও শক্তিতে এগিয়ে, তাদের মাথা বার্ধক্যে কাঁপতে কাঁপতে দূর থেকে বলেন, "ওহে রামের রথের দ্রুতগামী ঘোড়ারা, ফিরে যাও! আর সামনে যেও না। তোমাদের ও তোমাদের প্রভুর মঙ্গলের জন্যই বলছি। সমস্ত প্রাণী, বিশেষত ঘোড়ারা, মানুষের কথা শুনে। তাই আমাদের অনুরোধ শুনে ফিরে যাও। তোমাদের প্রভু, যিনি পবিত্র, ধর্মপরায়ণ, বীর ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, তাকে শহরে ফিরিয়ে আনো, বনবাসে নিয়ে যেও না।" বৃদ্ধদের এই কষ্টের কথা শুনে রাম হঠাৎ রথ থেকে নেমে পড়েন। এরপর রাম, সীতা ও লক্ষ্মণ একসাথে পায়ে পায়ে বনপথে এগিয়ে যান। রাম, যিনি ধর্মে দৃঢ়, করুণাবশত রথে চড়ে ব্রাহ্মণদের রেখে যেতে পারেননি। রামকে যেতে দেখে ব্রাহ্মণরা, মন বিষণ্ন ও দুঃখে ভরা, তাকে বলেন, "সমস্ত ব্রাহ্মণ্যতাই তোমার সাথে আছে, কারণ তুমি ব্রাহ্মণদের প্রতি নিবেদিত। এমনকি যজ্ঞের অগ্নি, ব্রাহ্মণদের কাঁধে বহিত, তোমার সাথে যাচ্ছে।" তারা বলে, "বাজপেয় যজ্ঞের ছাতা আমাদের পেছনে মেঘের মতো ছায়া দিচ্ছে। সূর্যের তাপে তুমি যখন ছাতাহীন, তখন আমরা আমাদের বাজপেয় ছাতা দিয়ে তোমাকে ছায়া দেব। আমাদের যজ্ঞের সংকল্প, যা সবসময় বৈদিক মন্ত্রে পরিচালিত হয়েছে, এখন তোমার জন্য বনেও অনুসরণ করছে। আমাদের হৃদয়ে যে বেদ, আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ, তা আমাদের ঘরে থাকবে, আমাদের স্ত্রীগণও ধর্মে রক্ষিত থাকবে। তোমার যাত্রা নিয়ে আর কোনো চিন্তা নেই; যখন তুমি ধর্মে নিবেদিত, তখন আমাদের জন্য কীই বা অবশিষ্ট!" তারা বিনীতভাবে বলেন, "আমরা মাথা নত করে, চুল রাজহংসের মতো সাদা, নম্র আচরণে, মাটিতে ধূলো মাখা, তোমাকে ফিরে আসতে অনুরোধ করছি। এখানে বহু ব্রাহ্মণদের যজ্ঞ অসম্পূর্ণ আছে; তাদের পূর্ণতা তোমার ফিরে আসার ওপর নির্ভর করে। এখানে সমস্ত প্রাণী, স্থাবর ও জঙ্গম, তোমার প্রতি নিবেদিত; যখন তারা তোমাকে অনুরোধ করে, তুমি তাদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাও।" তারা আরও বলেন, "তোমাকে অনুসরণ করতে না পেরে, তাদের শিকড় ছিঁড়ে, বাতাসে উড়ে যাওয়া গাছগুলো যেন কান্না করছে। পাখিরা, খাদ্য ও চলনে স্থির, গাছের ডালে বসে, তোমাকে—যিনি সকলের প্রতি দয়ালু—অনুরোধ করছে।" ব্রাহ্মণরা যখন এভাবে রামকে ফিরে আসার জন্য আহ্বান করছিল, তখন সেখানে অন্ধকার নেমে আসে, যেন রঘুবংশীয় রামের পথ রুদ্ধ করছে। তখন সুমন্ত্রও ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে রথ থেকে খুলে, দ্রুত ঘুরিয়ে, তাদের শরীর জলভেজা অবস্থায় অন্ধকারের কাছে নিয়ে যান। এইভাবে রামায়ণের এই অধ্যায়ে রামের বনবাসের যাত্রা, অযোধ্যাবাসী ও ব্রাহ্মণদের গভীর ভালোবাসা, এবং তাদের হৃদয়বিদারক অনুরোধের চিত্র ফুটে ওঠে।