রামচন্দ্রের বনবাসের মুহূর্তে, কৈকেয়ী বলল—রাম বনবাসে গিয়ে পবিত্র স্থানে যজ্ঞ করবেন, প্রচুর দান করবেন, ঋষিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন, আর এইভাবে তিনি বনেও সুখে থাকবেন। আর বলল, বলবান ভরত অযোধ্যা শাসন করবে; রামের সমস্ত ইচ্ছা যেন আবার পূর্ণ হয়। কিন্তু যখন কৈকেয়ী কাকুত্থস রামের বিষয়ে এভাবে বলল, তার মনে এক অজানা ভয় এসে গেল; মুখ শুকিয়ে গেল, গলা ধরে এল। দুঃখে ও আতঙ্কে, মুখ শুকিয়ে যাওয়া কৈকেয়ী রাজাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘‘ভরত কখনোই এমন এক রাজ্য চাইবে না, যা সম্পদহীন, শূন্য, কোনো ভোগ-বিলাস নেই—যেমন মদের আসল স্বাদ চলে গেলে তা আর আকর্ষণীয় থাকে না।’’ কৈকেয়ী তখন সমস্ত লজ্জা ছেড়ে, কঠোর ভাষায় এসব কথা বলল। তখন রাজা দশরথ, যার চোখ ছিল পদ্মপাতার মতো প্রশস্ত, কৈকেয়ীকে বললেন, ‘‘তুমি কেন আমাকে আঘাত করছ, আমাকে এমন কঠিন দায়িত্ব দিয়ে? অযোগ্য নারী, কেন তুমি আগে আমাকে নিবৃত্ত করলে না, যখন এই কাজ শুরু হয়েছিল?’’ দশরথের রাগে বলা এই কথা শুনে, কৈকেয়ী আরও ক্রুদ্ধ হয়ে বলল, ‘‘তোমার বংশেই সগর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র অসমঞ্জকে নির্বাসিত করেছিলেন; তেমনি রামকেও নির্বাসন দাও।’’ ‘লজ্জা!’—এইভাবে কৈকেয়ী বলতেই, দশরথ উত্তর দিলেন। সবাই লজ্জিত হলো, কেবল কৈকেয়ী কিছুই বুঝল না। তখন প্রবীণ মন্ত্রী সিদ্ধার্থ, যিনি বিশুদ্ধ ও রাজার প্রিয়, কৈকেয়ীকে বললেন—‘‘অসমঞ্জ, যখন সে রাস্তার ধারে খেলত, তখন সে শিশুদের ধরে সরযূ নদীতে ছুড়ে দিত, আর এই পাপকর্মেই সে আনন্দ পেত।’’ এ দেখে নগরবাসীরা রেগে গিয়ে রাজাকে বলল, ‘‘রাজন, আমাদের অথবা অসমঞ্জ—একজনকে বেছে নিন।’’ রাজা জিজ্ঞেস করলেন, ‘‘কিসের জন্য এই ভয়?’’ তখন প্রজারা বলল, ‘‘খেলতে খেলতে সে আমাদের ছোট ছোট সন্তানদের সরযূ নদীতে ফেলে দেয়, আর এতে সে আনন্দ পায়।’’ প্রজাদের কথা শুনে, রাজা নিজের কোনো দোষ না থাকা সত্ত্বেও, কেবল তাদের সন্তুষ্ট করতে নিজের পুত্রকে ত্যাগ করলেন। তৎক্ষণাৎ স্ত্রী ও অনুচরসহ অসমঞ্জকে রথে তুলে, আজীবন নির্বাসনে পাঠালেন—‘‘সে যেন সারাজীবন নির্বাসনে থাকে।’’ অসমঞ্জ কোদাল আর ঝুড়ি হাতে পাহাড়-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে লাগল, যেন কোনো পাপী। এইভাবে ধর্মপরায়ণ রাজা সগরও তাকে পুরোপুরি ত্যাগ করেননি; তাহলে রাম কী অপরাধ করেছে, যে তাকে এমন বাধা দেওয়া হচ্ছে? আমরা রাঘবের কোনো দোষ দেখি না; তার জন্য পাতালে পড়া যেমন অসম্ভব, তেমনি চাঁদের গায়ে দাগ পড়াও অসম্ভব। কিন্তু, হে রানি, যদি তুমি রাঘবের কোনো দোষ দেখো, আজ সত্য করে বলো; তাহলে রাম নির্বাসিত হবে। কারণ, নির্দোষ ও ধর্মনিষ্ঠ কাউকে ত্যাগ করলে, এমনকি ইন্দ্রেরও তেজ নষ্ট হয়ে যাবে, কারণ তা ধর্মবিরুদ্ধ। হে রানি, রামের সৌভাগ্য নষ্ট করার এতেই যথেষ্ট হয়েছে; এখন নিজেকেও জনসমাজের নিন্দা থেকে রক্ষা করো, হে শুভ্রা। সিদ্ধার্থের কথা শুনে, শোকে ক্লান্ত কণ্ঠে দশরথ কৈকেয়ীকে বললেন, ‘‘তুমি নিজের মঙ্গলের জন্য, যদিও কঠিন শোনায়, এই কথাগুলো শুনতে চাইছ না; তুমি আমার বা নিজের মঙ্গল বোঝো না। নিষ্ঠুর পথে গিয়ে, তুমি সৎ নারীর পথ ছেড়ে দিয়েছ।’’ ‘‘আজ আমি রামের সঙ্গে যাব, রাজ্য, সুখ, ধন সব ত্যাগ করব; তুমি আর ভরত, রাজ্যের সবাই—তোমরা চিরকাল রাজ্য ভোগ করো।’’ এভাবে চলল ঘটনাপ্রবাহ। এরপর, প্রধান মন্ত্রীর কথা শুনে, রাম নম্র ও শ্রদ্ধাভরে দশরথকে বললেন, ‘‘রাজন, আমি যখন ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে বনবাসে যাচ্ছি, তখন আমার সঙ্গে কারও যাওয়ার দরকার কী? আমি যখন সব বন্ধন ছেড়ে দিচ্ছি, তখন রশির বন্ধন দিয়ে কী হবে, যখন হাতির মতো মহামূল্যবান কিছুই আমি ছেড়ে দিয়েছি?’’ ‘‘তাই, হে ধর্মশ্রেষ্ঠ, আমার আর সেনাবাহিনী নিয়ে কী হবে, রাজন? সবাই ফিরে যাক; কেবল আমাকে বাকের বস্ত্র এনে দাও।’’ ‘‘আর কোদাল ও ঝুড়ি নিয়ে এসো, কারণ আমাকে চৌদ্দ বছর বনেই থাকতে হবে।’’ তখন কৈকেয়ী, লজ্জাহীনভাবে জনসমক্ষে, নিজ হাতে বাকের বস্ত্র এনে রামকে দিলেন—‘‘এগুলো পরো।’’ রাঘব সেই বাকের বস্ত্র নিয়ে, নিজের সুন্দর রাজবস্ত্র খুলে, ঋষিদের মতো বস্ত্র পরিধান করলেন। সেখানে লক্ষ্মণও, পিতার সামনে, নিজের সুন্দর রাজবস্ত্র ছেড়ে, ঋষির পোশাক ধারণ করলেন। সীতাও, রেশমে আবৃত, ভয়ে বাকের বস্ত্রের দিকে তাকালেন—যেন কোন হরিণী ফাঁদের দিকে ভয়ে তাকায়। জনকের কন্যা, শুভলক্ষণা, চোখ নামিয়ে, দুঃখ ও লজ্জায় বিমর্ষ হয়ে, কৈকেয়ীর কাছ থেকে কুশবস্ত্র নিলেন। চোখে জল নিয়ে, ধর্মজ্ঞা ও স্বামীনিষ্ঠা সীতা, স্বামীকে বললেন, যিনি গন্ধর্বরাজের মতো—‘‘বনে থাকা ঋষিরা কীভাবে এই বাকের বস্ত্র পরেন?’’—এসব জানতেন না বলে, সীতা বারবার মূর্ছিত হচ্ছিলেন। এক টুকরো বাকের বস্ত্র হাতে নিয়ে, গলায় পরলেন; অনভ্যস্ত ও লজ্জিত জনকনন্দিনী সেখানে দাঁড়িয়ে রইলেন।