রামচন্দ্র যখন বনবাসে যাবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তাঁর স্ত্রী সীতাকে উপদেশ দেন, ‘‘যে নারী দেবতাদের প্রতি পূজা বা নমস্কার করেন না, কিংবা কোনো কারণে তা বন্ধ রেখেছেন, তিনিও স্বামীর সেবা করা উচিত। স্বামীর যা প্রীতিকর ও কল্যাণকর, তাতেই আনন্দ খুঁজে নেওয়াই নারীর ধর্ম।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘এটাই নারীর চিরন্তন ধর্ম—যা বেদে এবং লোকশাস্ত্রে ঘোষিত, যেভাবে অগ্নিহোত্রে ও দেবতাদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মহৎ ব্যক্তিরা পালন করেন, ঠিক তেমনই।’’ তারপর রাম সীতাকে অনুরোধ করেন, ‘‘আমার অনুপস্থিতিতে দেবতাদের পূজা ও ব্রাহ্মণদের যথাযথ সম্মান দিও। আমার ফিরে আসার প্রতীক্ষায় থেকো, আমার জন্য এই কাজগুলো করো।’’ তিনি সীতাকে বলেন, ‘‘সংযত আহার, অটুট ব্রত এবং স্বামীর সেবায় নিয়োজিত থেকো; আমি ফিরে এলে তুমি তোমার সর্বোচ্চ কামনা পূর্ণ করবে।’’ এভাবে রাম যখন সীতাকে উপদেশ দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ অশ্রুসজল হয়ে ওঠে। কৌশল্যা, পুত্রশোকে কাতর, রামকে বললেন, ‘‘বৎস, তোমার এই চলে যাওয়া আমার মন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না।’’ তিনি আবার বলেন, ‘‘বীর, সময় কারও জন্য থেমে থাকে না, তা ফেরানো যায় না; তাই, একাগ্রচিত্তে যাও, সর্বদা কল্যাণপ্রাপ্ত হও।’’ কৌশল্যা আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘তুমি যখন ফিরে আসবে, তখন আমি ক্লান্তি থেকে মুক্ত হবো; তুমি যখন ব্রত পালন করে, পিতার প্রতি কর্তব্য সম্পন্ন করে ফিরে আসবে, তখন আমি পরম সুখে নিদ্রা যাবো।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বৎস, মৃত্যুর পথ এই জগতে বোঝা কঠিন; যারা তোমাকে উৎসাহ দিচ্ছে, রাঘব, তাদের কথা শোনো, তবে আমার কথাও মনে রেখো। এখন যাও, বলবান বীর, নিরাপদে ফিরে এসো; কোমল ও মধুর বাক্যে আমাকে আনন্দ দিও। হয়তো সেই সময় আসছে, যখন তুমি বন থেকে ফিরে আসবে, আর আমি তোমাকে জটা ও বাকল পরিহিত অবস্থায় দেখতে পাবো।’’ এভাবে দৃঢ় সংকল্পে কৌশল্যা রামকে বনবাসে পাঠানোর জন্য শুভকামনা জানালেন। তিনি রামের কল্যাণে শুভাশিস উচ্চারণ করলেন এবং তাঁর মঙ্গল কামনায় নিজেকে নিবেদিত করলেন। এরপর শুরু হলো পঁচিশতম সর্গ। কৌশল্যা নিজের দুঃখ সংবরণ করে, শুদ্ধ জলে স্পর্শ করে, শুভকর্মে মন দিলেন। তিনি রামকে বললেন, ‘‘তোমাকে কেউ আটকাতে পারবে না, রঘুবংশের শ্রেষ্ঠ; যাও, দ্রুত ফিরে এসো এবং সৎপথে অটল থেকো। তুমি যে ধর্মকে ভালোবাসা ও নিয়মে পালন করো, রঘুবীর, সেই ধর্ম তোমাকে রক্ষা করুক।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বৎস, তুমি যেসব দেবতা ও মন্দিরে নমস্কার করো, তারা বনেও তোমাকে ও মহান ঋষিদের রক্ষা করুন। মহর্ষি বিশ্বামিত্র যে অস্ত্র তোমাকে দিয়েছেন, তা সদা তোমার সুরক্ষা করুক। পিতার সেবা, মাতার সেবা ও সত্যনিষ্ঠায় তুমি দীর্ঘজীবী হও।’’ কৌশল্যা প্রার্থনা করেন, ‘‘পবিত্র অগ্নি, কুশ, বেদী, ব্রাহ্মণদের আসন, পর্বত, বৃক্ষ, ঝোপ, সরোবর, পক্ষী, সর্প, সিংহ—সবাই তোমাকে রক্ষা করুক। সাধ্য, বিশ্বদেব, মারুত, ধাতা, বিধাতা, পুষা, ভগ, অর্যমান—সবাই তোমাকে কল্যাণ দিক। ইন্দ্রসহ সমস্ত দিকপাল, ছয় ঋতু, মাস, বছর, রাত্রি তোমাকে রক্ষা করুক। দিন ও মুহূর্তে সর্বদা শুভ হোক; বেদ, স্মৃতি ও ধর্ম সর্বত্র তোমাকে রক্ষা করুক।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘দেবতা স্কন্দ, সোম, বৃহস্পতি, সপ্তর্ষি, নারদ—সব দিক থেকে তোমাকে রক্ষা করুন। সিদ্ধ, দিকপাল, ও যেসব দেবতাকে আমি বন্দনা করেছি, তারা বনেও সর্বদা তোমাকে রক্ষা করুন। সমস্ত পর্বত, সাগর, বরুণ, আকাশ, বায়ু, পৃথিবী—সব নড়মান ও স্থির জিনিস তোমাকে রক্ষা করুক। সমস্ত নক্ষত্র, গ্রহ, দেবতা, দিন-রাত্রি, সন্ধ্যাও বনবাসে তোমাকে রক্ষা করুক। ছয় ঋতু, মাস, বছর, সময় ও মুহূর্ত তোমাকে সুখ ও কল্যাণ দিক।’’ ‘‘তুমি যখন মুনি বেশে, জ্ঞানী হয়ে বনে বিচরণ করবে, তখন দেবতা-দানব সবাই তোমার মঙ্গল করুক। রাক্ষস, পিশাচ, ভয়ংকর প্রাণী, মাংসাশী পশু—তাদের থেকে তুমি কখনো ভীত হয়ো না। বানর, বিচ্ছু, দংশক পোকা, মশা, সরীসৃপ, কীট—তারা যেন তোমাকে কষ্ট না দেয়। বৃহৎ হাতি, সিংহ, বাঘ, দাঁতাল ভালুক, শৃঙ্গধার মহিষ ও হিংস্র পশু—তারা যেন তোমাকে আঘাত না করে। যারা মানুষের মাংস খায়, এমন সমস্ত হিংস্র প্রাণী—তাদের কাছ থেকেও তুমি নিরাপদ থাকো।’’ ‘‘তোমার যাত্রা শুভ হোক, কর্ম সফল হোক, সর্বদা সৌভাগ্য তোমার সঙ্গে থাকুক, রাম; নিরাপদে যাও, বৎস। আকাশ ও পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী, দেবতা, এমনকি তোমার বিরোধীরাও বারবার তোমাকে আশীর্বাদ দিক। শুক্র, সোম, সূর্য, কুবের, যম—যাদের আমি পূজা করেছি, তারা দণ্ডকবনে তোমাকে রক্ষা করুক। অগ্নি, বায়ু, ধোঁয়া, এবং ঋষিদের মুখনিঃসৃত মন্ত্র—তারা তোমাকে স্নান ও স্পর্শকালে রক্ষা করুক।’’ এভাবে কৌশল্যা দেবতাদের মালা, দেবগন্ধ, ও উপযুক্ত স্তোত্র দ্বারা পূজা করলেন; তাঁর চোখ ছিল ভক্তিতে ভরা। এক মহাত্মা ব্রাহ্মণ বিধি অনুসারে অগ্নি স্থাপন করে রামের মঙ্গলের জন্য হোমকর্ম করলেন। কৌশল্যা নিজ হাতে ঘি, শুভ্র মালা, পবিত্র কাঠ ও সরিষা প্রস্তুত করলেন অর্ঘ্য নিবেদনের জন্য। এভাবেই কৌশল্যার হৃদয়ভরা আশীর্বাদ, প্রার্থনা ও মঙ্গলকামনায় রামের বনযাত্রা শুরু হলো—মাতৃভক্তি, ধর্ম ও দেবতার কৃপা নিয়ে।