শ্রোতা, এখন আমি আপনাদের জন্য বর্ণনা করছি সেই মহৎ কাহিনী, যা বালকাণ্ডের অষ্টম সর্গে বর্ণিত হয়েছে। এক সময়, রাজা দশরথ, যিনি ছিলেন মহাশক্তিশালী, ধর্মপরায়ণ এবং মহান আত্মার অধিকারী, পুত্রসুখের জন্য গভীরভাবে আকুল ছিলেন। কিন্তু তাঁর বংশের উত্তরসূরি হিসেবে কোনো সন্তান ছিল না। এই ভাবনায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন এবং মনে এল, 'কেন আমি পুত্র লাভের জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞ সম্পন্ন করব না?' এই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে, রাজা দশরথ তাঁর জ্ঞানী ও ধর্মপরায়ণ মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করতে লাগলেন। তিনি সুমন্ত্রকে বললেন, 'শীঘ্রই সকল প্রবীণ এবং পুরোহিতদের আমার কাছে নিয়ে এসো।' সুমন্ত দ্রুতগামী হয়ে সমস্ত বেদজ্ঞদের একত্রিত করতে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি সুকৃত, বামদেব, জাবালী, কাশ্যপ, পুরোহিত বশিষ্ঠ এবং অন্যান্য বিশিষ্ট ব্রাহ্মণদের নিয়ে এলেন। তাদের সম্মান জানিয়ে, রাজা দশরথ কোমল ভাষায় বললেন, 'আমি শাস্ত্র অনুযায়ী যজ্ঞ সম্পন্ন করতে চাই। আমি কীভাবে আমার ইচ্ছা পূরণ করতে পারি? আপনারা এই বিষয়ে চিন্তা করুন।' ব্রাহ্মণগণ, যাদের মধ্যে বশিষ্ঠ ছিলেন, রাজা দশরথের কথা শুনে বললেন, 'আপনার কথা খুব ভালো। উপকরণ সংগ্রহ করুন এবং অশ্বকে মুক্ত করুন।' তারা আরও বললেন, 'সারযূ নদীর উত্তর তীরে যজ্ঞের স্থান প্রস্তুত করুন। হে রাজা, আপনি নিশ্চয়ই আপনার ইচ্ছা অনুযায়ী পুত্র লাভ করবেন।' রাজা দশরথ এই কথা শুনে আনন্দিত হলেন। তাঁর চোখে আনন্দের দীপ্তি দেখা গেল এবং তিনি মন্ত্রীদের বললেন, 'যজ্ঞের সব প্রস্তুতি এখানে করুন, প্রবীণদের নির্দেশ অনুযায়ী।' তিনি নির্দেশ দিলেন যে, পবিত্র অশ্ব এবং তার গুরুকে সঠিক তত্ত্বাবধানে মুক্ত করা হোক; সারযূর উত্তর তীরে যজ্ঞের স্থান প্রস্তুত করা হোক। তিনি আরও বললেন, 'শান্তি অনুষ্ঠানও সম্পন্ন করা হোক, যেভাবে শাস্ত্র এবং প্রথায় বলা হয়েছে।' রাজা দশরথের এই মহান সংকল্পের কারণে, তার মন্ত্রীগণ বললেন, 'এমনই হবে।' ব্রাহ্মণগণ রাজা দশরথকে উৎসাহিত করলেন এবং সম্মান জানিয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। রাজা দশরথ পরে তাঁর প্রিয় পত্নীদের কাছে গিয়ে বললেন, 'আপনারা পবিত্রতা গ্রহণ করুন; আমি পুত্রের জন্য যজ্ঞ সম্পন্ন করতে যাচ্ছি।' তাঁর এই মধুর কথায়, রাজপত্নীদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, যেন শীতের শেষে পদ্মফুল ফুটে উঠেছে। এখন শুনুন, সেই কাহিনী যা রাজপুত্রের আগমনের পূর্বে ঘটেছিল। একদিন, রাজা দশরথের রথচালক বললেন, 'হে রাজা, আমি প্রাচীন কাহিনী শোনাতে চাই।' তিনি বললেন, 'একবার, সাধুদের সামনে, সনাতকুমার একটি কাহিনী বলেছিলেন। সেই কাহিনীতে বলা হয়েছে, কাশ্যপের পুত্র ভিভাণ্ডক এবং তাঁর পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গের কথা। ঋষ্যশৃঙ্গ সবসময় বনবাসে জীবনযাপন করতেন।' ঋষ্যশৃঙ্গ, যিনি সদা তাঁর পিতার সাথে থাকতেন, এক অসাধারণ ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং তিনি ব্রহ্মচর্য পালন করতেন। এই সময়, শক্তিশালী রোমপদ রাজা প্রসিদ্ধি লাভ করলেন। কিন্তু সেই রাজার একটি ভুলের কারণে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে। তিনি জ্ঞানী ব্রাহ্মণদের ডাকবেন এবং বলবেন, 'আপনারা পবিত্র আচার জানেন। আমাকে সঠিক আচার এবং পরিশোধনের পদ্ধতি জানান।' ব্রাহ্মণগণ বলবেন, 'হে রাজা, ভিভাণ্ডকের পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গকে এখানে আনুন।' রাজা দশরথ এই কথা শুনে চিন্তিত হয়ে পড়লেন, ভাবতে লাগলেন কিভাবে সেই শক্তিশালী ঋষ্যশৃঙ্গকে এখানে আনা যাবে। এভাবে, রাজা দশরথ তাঁর মন্ত্রীদের সাথে আলোচনা করে, সম্মানসহ পুরোহিত ও উপদেষ্টাদের পাঠাবেন। কিন্তু সেই পুরোহিতরা, ভীত হয়ে, রাজা দশরথের আদেশ শুনে যেতে অস্বীকার করবেন। এভাবেই রাজা দশরথের পুত্রলাভের জন্য যজ্ঞের প্রস্তুতি ও তার পেছনের কাহিনী এগিয়ে চলতে লাগল।