প্রভুর আদেশে যে দাস কঠিন কাজেও নিষ্ঠাভরে সফল হয়, তাকেই মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলা হয়। আবার, যে দাস সক্ষম হয়েও গুরুতর দায়িত্ব পেয়ে রাজাকে সন্তুষ্ট করতে পারে না, সে সাধারণ মানুষরূপে গণ্য হয়। আর যে দাস মনোযোগী ও সক্ষম হয়েও রাজাধীশের আদিষ্ট কাজটি করে না, সে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নীচ বলে বিবেচিত হয়। এই আদেশ পালন করে হনুমান কৃতকার্য হয়েছে; এতে তাঁর নিজের মর্যাদা বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং সুগ্রীবও অত্যন্ত সন্তুষ্ট। এখন রঘুকুলের আমি, বলবান লক্ষ্মণ ও ধর্মনিষ্ঠভাবে বৈদেহীর দর্শনলাভে নিরাপদ হয়েছি। তবুও আমার হৃদয় দুঃখে ভারাক্রান্ত, কারণ যে মহাপুরুষ এই আনন্দবার্তা নিয়ে এসেছে, তার জন্য আমি এখনও সমানভাবে আনন্দদায়ক কিছু করতে পারিনি। এই মুহূর্তে আমি হনুমানকে যে আলিঙ্গন দিলাম, তা আমার কাছে সবকিছুর সমতুল্য। এভাবে বলার পর, রাম আনন্দে আপ্লুত হয়ে হনুমানকে আলিঙ্গন করলেন, যিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে ফিরে এসেছেন। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে রঘুবংশশ্রেষ্ঠ রাম, যখন বানররাজ সুগ্রীব শুনছিলেন, এ কথা বললেন— ‘‘সীতার সন্ধান সব দিক থেকেই সুচারুভাবে হয়েছে; কিন্তু সমুদ্রের কাছে এসে আমার মন আবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।’’ ‘‘এত বিশাল ও দুরতিক্রম্য সমুদ্র— কিভাবে আমাদের সকল বানর দক্ষিণ তীরে পৌঁছাবে?’’ ‘‘যদিও বৈদেহীর সংবাদ আমি শুনেছি, কিন্তু বানরদের সমুদ্র পার হওয়ার উপায় কী?’’ এভাবে বলার পর, শত্রুনাশী রাম দুঃখে ব্যাকুল হয়ে হনুমানের কথা মনে মনে ভাবতে লাগলেন। এখন, মহার্ষি বাল্মীকি রচিত মহারামায়ণ, যুদ্ধে কাণ্ডের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হচ্ছে— শুনুন। তখন দীপ্তিমান সুগ্রীব, শোকাক্রান্ত দশরথপুত্র রামকে সান্ত্বনাস্বরূপ কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘‘রাঘব, এখন যখন আমরা সীতার সংবাদ পেয়েছি ও শত্রুর অবস্থান জেনেছি, তখন তোমার আর দুঃখ করার কারণ নেই।’’ ‘‘তুমি বুদ্ধিমান, শাস্ত্রজ্ঞ, সুবোধ ও পণ্ডিত, রাঘব; এই সাধারণ ও আত্মঘাতী মনোভাব ত্যাগ করো। আমরা এই কুমিরে পূর্ণ বিশাল সমুদ্র পার হবো, লঙ্কা জয় করবো এবং তোমার শত্রুকে বধ করবো।’’ ‘‘যে ব্যক্তি বিমর্ষ, হতাশ ও দুঃখে আচ্ছন্ন, তার সব কাজ ব্যর্থ হয় ও সর্বনাশ ঘটে। এই বানরনেতারা সাহসী ও সক্ষম, তারা তোমাকে সন্তুষ্ট করতে যা কিছু করতে প্রস্তুত— এমনকি আগুনেও প্রবেশ করতে পারে; তাদের আনন্দ ও আমার দৃঢ় বিশ্বাস থেকেই আমি জানি।’’ ‘‘বীরত্বের সঙ্গে আমি তোমার শত্রু, পাপিষ্ঠ রাবণকে বধ করে সীতাকে ফিরিয়ে আনবো; তুমিও তদনুযায়ী কাজ করো। যেমন এখানে একটি সেতু নির্মাণ করা উচিত, যাতে আমরা সেই নগরী দেখতে পারি, তেমনি, রাঘব, তোমাকেও রাক্ষসরাজার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।’’ ‘‘যখন তুমি ত্রিকূট পর্বতের চূড়ায় দাঁড়িয়ে লঙ্কানগরী ও যুদ্ধে নিহত রাবণকে দেখবে, তখন নিশ্চিত জেনে নিও, তোমার লক্ষ্য পূর্ণ হয়েছে। এই ভয়ংকর সমুদ্র, যা বরুণের আবাস, সেতু নির্মাণ ছাড়া— দেবতা, অসুর, এমনকি ইন্দ্রও লঙ্কা ধ্বংস করতে পারে না।’’ ‘‘যখন সেতু নির্মাণ হবে ও আমার সমগ্র সেনা পার হয়ে বিজয়ী হবে, তখন জেনে নিও, আমরা জয়ী; কারণ এই বীর বানররা যুদ্ধে ইচ্ছামতো রূপ ধারণ করতে পারে।’’ ‘‘তাই, রাজন, এই দ্বিধাগ্রস্ত মনকে বিদায় দাও; কারণ দুঃখ মানুষের সাহস নষ্ট করে। মানুষের যা কর্তব্য, তা সাহসের উপর নির্ভর করেই করতে হয়; কারণ দৃঢ় সংকল্পেই দ্রুত সাফল্য আসে।’’ ‘‘এ সময়, হে মহাবুদ্ধিমান, তোমার শক্তি ও উদ্যম আহ্বান করো; কারণ বীরদের মধ্যে, হে মহাত্মা, ক্ষয় বা ক্ষতির জন্য দুঃখ করা সকল প্রচেষ্টাকে বিনষ্ট করে। তুমি জ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও শাস্ত্রার্থজ্ঞ; আমার মতো পরামর্শদাতাদের নিয়ে শত্রু বিজয়ে সক্ষম।’’ ‘‘রাঘব, এই তিনলোকে আমি কাউকে দেখি না, যে তোমার হাতে ধনুক তুলে যুদ্ধ করতে পারে। বানররা তোমার প্রতি নিবেদিত, তোমার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে না; শীঘ্রই তুমি সীমাহীন সমুদ্র পার হয়ে সীতাকে দেখবে।’’ ‘‘তাই, আর দুঃখ আঁকড়ে থেকো না; রাগ ধারণ করো, রাজন, কারণ মন্থর ক্ষত্রিয়রা অবজ্ঞার পাত্র, আর সকলেই ভয় পায় ভয়ঙ্করদের। এই ভয়ংকর সমুদ্র পার হওয়ার জন্য, আমাদের সঙ্গে একজন তীক্ষ্ণবুদ্ধির ব্যক্তি এসেছেন— তিনিই এ বিষয়ে চিন্তা করুন।’’ ‘‘যখন সেনাবাহিনী পার হয়ে যাবে, তখনই নিশ্চিত জেনে নিও, আমরা জয়ী; আমার সম্পূর্ণ বাহিনী পার হয়ে বিজয়ী হয়েছে— এ কথা দৃঢ়ভাবে বুঝে নাও।’’ ‘‘এই বানররা বীর, যুদ্ধে ইচ্ছামতো রূপ ধারণ করতে পারে; তারা শত্রুদের ওপর পাথর ও বৃক্ষবৃষ্টি করে পরাস্ত করবে। আমি পূর্বাভাস পাচ্ছি, বরুণের আবাস— এই সমুদ্র পার হওয়া সম্ভব; এবং যুদ্ধে শত্রুর বিনাশও হবে।’’ ‘‘আর বেশি বলার দরকার নেই; সব দিক থেকেই তুমি বিজয়ী হবে; শুভলক্ষণও দেখছি, আমার হৃদয় আনন্দে ভরে গেছে।’’ এবার মহারামায়ণের যুদ্ধকাণ্ডের তৃতীয় অধ্যায় শুরু হচ্ছে— শুনুন। সুগ্রীবের যুক্তিপূর্ণ ও অর্থবহ বাক্য শুনে, কাকুত্স্থ বংশধর রাম তা গ্রহণ করলেন এবং হনুমানকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘‘তপস্যার শক্তি দিয়ে, সেতু নির্মাণ করে কিংবা সমুদ্র শুকিয়ে দিয়েও, আমি যেকোনো উপায়ে এই সমুদ্র পার হতে সক্ষম।