সীতার মুখে রামচন্দ্রের জন্য গভীর দুঃখ আর ক্লান্তির ছাপ, চোখে অশ্রু ঝরছে। এমন অবস্থায় হনুমান, সেই বীরবানর, তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ‘‘আপনার কথা রাঘব শুনলেই তিনি অতি দ্রুত, অসংখ্য বানর ও ভালুকের বিশাল সেনা নিয়ে এখানে আসবেন। অথবা, আজই আমি আপনাকে এই রাক্ষসদের হাত থেকে মুক্ত করতে পারি; আপনি আমার পিঠে উঠুন, নিষ্কলঙ্কা, এই দুঃখ থেকে মুক্তি পান।’’ হনুমান বললেন, ‘‘আপনাকে আমার পিঠে নিয়ে আমি সমুদ্র পার করব; আমার এমন শক্তি আছে যে, চাইলে আমি রাবণসহ লঙ্কাকে তুলে নিতে পারি। আজই, মৈথিলী, আমি আপনাকে প্রস্রবণ পর্বতে দাঁড়িয়ে রাঘবের হাতে তুলে দেব, যেমন অগ্নি দেবতা ইন্দ্রকে হোম দেয়। আজই, বৈদেহী, আপনি রাঘবকে দেখবেন, লক্ষ্মণসহ, দৃঢ় সংকল্পে—যেন বিষ্ণু দানবদের বধ করতে উদ্যত।’’ ‘‘আপনি দেখবেন, সেই মহাবলশালী রাম, আপনাকে দেখে উল্লাসিত, আশ্রমে বসে আছেন, যেন দেবরাজ ইন্দ্র পর্বতের শিখরে। আমার পিঠে উঠুন, সুন্দরী, দ্বিধা করবেন না; রামচন্দ্রের সাথে মিলিত হন, যেমন রোহিণী চাঁদের সাথে মিলিত হয়।’’ হনুমান বললেন, ‘‘রোহিণী যেমন চাঁদের সাথে কথা বলে মিলিত হয়, আপনি আমার পিঠে উঠে তারাদের মহাসাগর পার করুন। লঙ্কার কোনো বাসিন্দাই, সুন্দরী, আমার পথে আপনাকে নিয়ে যেতে পারবে না।’’ ‘‘যেভাবে আমি এখানে এসেছি, সেভাবেই নিশ্চয় ফিরতে পারব; দেখুন, বৈদেহী, আমি আপনাকে আকাশপথে নিয়ে যাচ্ছি।’’ এইসব অলৌকিক কথা শুনে, মৈথিলী সীতা হনুমানের দিকে বিস্মিত ও আনন্দিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘‘হনুমান, আপনি কীভাবে আমাকে এত দূর নিয়ে যেতে চান? এ তো আপনার বানর-স্বভাব, বানরদের মধ্যে আপনি শ্রেষ্ঠ।’’ ‘‘আপনার শরীর তো ছোট, আপনি কীভাবে আমাকে নিয়ে যেতে চান আমার স্বামী, মানবরাজের কাছে?’’ সীতার কথা শুনে, পবনপুত্র হনুমান মনে মনে ভাবলেন, ‘‘তিনি আমার প্রকৃত শক্তি ও স্বভাব জানেন না; তাই, বৈদেহীকে আমার ইচ্ছামত রূপ দেখাই।’’ এমন ভাবনা নিয়ে হনুমান, বানরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, শত্রুদের বিনাশকারী, তাঁর প্রকৃত রূপ প্রকাশ করলেন। তিনি গাছের ওপর থেকে লাফিয়ে উঠে, নিজের আকার বাড়াতে লাগলেন, যাতে সীতার মনে সাহস আসে। অতঃপর, হনুমান পর্বতের মতো বিশাল, তাম্রবর্ণ মুখ, অপরিসীম শক্তি, হীরার মতো দন্ত ও নখ নিয়ে বৈদেহীর কাছে বললেন, ‘‘আমার শক্তি আছে লঙ্কাকে, তার পর্বত, অরণ্য, দুর্গ ও রক্ষকদের নিয়ে যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে যেতে।’’ ‘‘তাই, আপনার মন স্থির রাখুন, সুন্দরী; উদ্বেগে কাতর হবেন না; রাঘব ও লক্ষ্মণকে দুঃখমুক্ত করুন, বৈদেহী।’’ হনুমানকে পর্বতের মতো দেখে, জনককন্যা, যার চোখ পদ্মের মতো, পবনপুত্রের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘‘আপনার সাহস ও শক্তি আমি জানি, মহান বানর; আপনার গতি বায়ুর মতো, আপনার দীপ্তি অগ্নির মতো বিস্ময়কর।’’ ‘‘সাধারণ কোনো প্রাণী এই দেশে আসতে পারে না, বানরদের নেতা; সীমাহীন সমুদ্র পার হওয়া তো অসম্ভব। আপনার যাত্রার ক্ষমতা ও আমাকে পথ দেখানোর শক্তি আমি জানি; নিশ্চয় আপনার দ্বারা এই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে।’’ ‘‘তবু, শ্রেষ্ঠ বানর, আপনার সাথে যাওয়া আমার পক্ষে শোভন নয়; আপনার বায়ুর মতো দ্রুত গতি আমাকে বিভ্রান্ত করবে।’’ সীতা বললেন, ‘‘আকাশে, সমুদ্রের ওপর, আমি আপনার পিঠ থেকে পড়ে যেতে পারি, যখন আপনি দ্রুত চলবেন।’’ ‘‘সমুদ্রের মধ্যে পড়ে, যেখানে হাঙর ও কুমিরে ভরা, আমি দ্রুত অসহায় হয়ে যাব, জলজ প্রাণীদের শ্রেষ্ঠ খাদ্য হব। শত্রুদের বিনাশকারী, আমি আপনার সাথে যেতে অক্ষম; আপনার স্ত্রী আছে বলে, আমার প্রতি সন্দেহও হতে পারে।’’ ‘‘আমাকে নিয়ে যেতে দেখে, রাবণ নির্দেশিত, ভয়ঙ্কর ও শক্তিশালী রাক্ষসরা আমাদের পেছনে ধাওয়া করবে। তাদের বেষ্টিত হয়ে, শূল ও গদা হাতে, আপনি বিপদে পড়বেন, কারণ আপনার সাথে স্ত্রী আছে।’’ ‘‘অনেক রাক্ষস আকাশে অস্ত্র হাতে থাকবে, আপনি নিরস্ত্র; তখন আপনি কীভাবে যুদ্ধ করবেন আর আমাকে রক্ষা করবেন?’’ ‘‘আপনি যখন সেই নিষ্ঠুর রাক্ষসদের সাথে যুদ্ধ করবেন, আমি আপনার পিঠ থেকে ভয়ে পড়ে যাব, শ্রেষ্ঠ বানর।’’ ‘‘অথবা, শ্রেষ্ঠ বানর, সেই ভয়ঙ্কর, শক্তিশালী রাক্ষসরা আপনাকে যুদ্ধে পরাজিত করতে পারে। কিংবা, আপনি যুদ্ধ করতে গিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে, আমি পড়ে যাব; তখন দুষ্ট রাক্ষসরা আমাকে ধরে নিয়ে যাবে।’’ ‘‘তারা হয়তো আপনাকে আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে কিংবা আমাকে হত্যা করবে; কারণ যুদ্ধে বিজয় ও পরাজয় অনিশ্চিত। অথবা, আমি রাক্ষসদের হুমকিতে মারা যেতে পারি; তখন আপনার চেষ্টা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে।’’ ‘‘আপনি অবশ্যই সব রাক্ষসকে বিনাশ করতে পারেন; কিন্তু রাক্ষসদের আপনার দ্বারা বধ হলে রাঘবের খ্যাতি কমে যাবে।’’ ‘‘অথবা, রাক্ষসরা আমাকে কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারে, যেখানে বানর বা রাঘব কেউই জানতে পারবে না। তখন আপনার এই প্রচেষ্টা আমার জন্য ব্যর্থ হবে; কারণ আসল গৌরব তো রামের আপনার সাথে আগমনে।’’ এভাবেই, সীতা হনুমানকে তাঁর যুক্তিগুলো জানালেন, আর হনুমান তাঁর প্রকৃত শক্তি ও সাহস প্রকাশ করলেন, সীতার মন শান্ত করার জন্য।