সীতার মন গভীর উদ্বেগে ভরা। তিনি ভাবতে থাকেন— রামচন্দ্র কি হতাশ, বিভ্রান্ত, কিংবা কোনো কাজে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছেন? তিনি কি যথার্থ পুরুষের মতোই নিজের কর্তব্য পালন করছেন? তিনি কি শত্রু দমনকারী, বিজয়ের আশায় সদা উদ্যমী, এবং মিত্রদের প্রতি সদয়? তিনি কি যথাযথ কৌশল ও তিন প্রকার নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন? সীতা আরও ভাবেন— রাম কি বন্ধু লাভ করছেন? এমনকি শত্রুরাও কি তাঁর কাছে আসছেন? তাঁর মিত্ররা ও সদ্গুণী সঙ্গী কি তাঁকে যথাযথ সম্মান দিচ্ছেন? রাজপুত্র কি দেবতাদের অনুগ্রহ কামনা করেন এবং মানবীয় প্রচেষ্টা ও ভাগ্য— উভয়ের ওপর নির্ভর করেন? বনবাসের কারণে রাম কি তাঁর প্রতি স্নেহ হারাননি তো? এই দুঃখ থেকে তিনি কি তাঁকে উদ্ধার করবেন? সুখে অভ্যস্ত ও দুঃখে অপরিচিত রাম কি বিপদের মুখে মনোবল হারাননি? সীতা কৌসल्या, সুমিত্রা ও ভরত সম্পর্কে শুভ সংবাদ শুনতে চান। তাঁর কারণে রাম কি শোকে বিভ্রান্ত হননি? রামের মন কি অন্য কোথাও নয়? তিনি কি তাঁকে উদ্ধার করবেন? ভরত, যিনি ভাইয়ের প্রতি নিবেদিত, তিনি কি তাঁর জন্য পরামর্শদাতা পরিবেষ্টিত এক বিশাল সেনাবাহিনী পাঠাবেন? বীরবানররাজা সুগ্রীব কি তাঁর জন্য দাঁত ও নখ-সজ্জিত বীর বানরদের নিয়ে আসবেন? সুমিত্রার আনন্দদায়ক বীর লক্ষ্মণ কি অস্ত্রবৃষ্টিতে রাক্ষসদের বিনাশ করবেন? সীতা আশায় থাকেন— তিনি শীঘ্রই দেখবেন, রাম তাঁর ভীষণ অস্ত্রে রাবণ ও তার মিত্রদের যুদ্ধে হত্যা করছেন। রামের স্বর্ণবর্ণ, পদ্মগন্ধ মুখ তাঁর কারণে যেন শোকে শুকিয়ে না যায়, যেন জলের অভাবে সূর্যের উত্তাপে পদ্ম শুকিয়ে যায়। ধর্মরক্ষার জন্য যখন রাম রাজ্য ত্যাগ করে তাঁকে পদব্রজে বনবাসে নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন কোনো ভয় বা দুঃখ অনুভব করেননি; এখনো যেন তাঁর হৃদয়ে সাহস থাকে। রামের কাছে মা, বাবা, কিংবা আর কেউ সীতার চেয়ে প্রিয় বা সমতুল্য নন— তিনি কেবল প্রিয়তমের সংবাদ শোনার জন্যই বাঁচতে চান। এভাবে সীতা তাঁর মধুর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে বানররাজ হনুমানের কাছে বললেন ও থামলেন, আবারও রামের আশ্বাসবাণী শোনার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। সীতার কথা শুনে মহাবলশালী হনুমান হাতজোড় করে মাথায় তুলে বললেন— “কমলনয়ন রাম জানেন না আপনি এখানে আছেন, তাই তিনি দ্রুত আপনাকে ফিরিয়ে আনতে পারছেন না, যেমন ইন্দ্র শচীকে আনতেন। আমার কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রাঘব বিশাল বানর ও ভালুকসেনা নিয়ে দ্রুত আসবেন। তিনি তীব্র তীরবৃষ্টিতে অচল বরুণের আবাস রুদ্ধ করে লঙ্কা রাক্ষসশূন্য করবেন। মৃত্যু, দেবতা বা মহাসুরেরা যদি তাঁর পথে দাঁড়ায়, রাম তাদেরও বিনাশ করবেন। “হে দেবী, আপনাকে না দেখে শোকে রাম শান্তি পান না, যেন সিংহে পীড়িত হাতি। মন্দার, মালয়, বিন্ধ্য, মেরু, দার্দুর— এইসব পর্বত, তাদের মূল ও ফলের শপথ করে বলছি— আপনি রামের মুখ দেখবেন, যার নয়ন সুন্দর, ঠোঁট বিম্বফলের মতো, কানে মনোহর কুন্ডল, যেন পূর্ণচন্দ্র। শীঘ্রই, বৈদেহী, আপনি প্রস্রবণ পর্বতে ইন্দ্রের মতো রামকে দেখতে পাবেন। রাঘব মাংস খান না, মদ্যপানও করেন না; তিনি কেবল বিশুদ্ধ বনফলই আহার করেন। তিনি দেহ থেকে মাছি, মশা, পোকা, সরীসৃপ তাড়ান না; তাঁর মন সর্বদা আপনাতে নিমগ্ন। রাম সর্বদা ধ্যানমগ্ন, শোকে অভিভূত— কিছুর কথা ভাবেন না, কেবল আপনাকেই স্মরণ করেন। শ্রেষ্ঠ পুরুষ রাম কখনোই নিদ্রাহীন; ঘুমালেও জেগে উঠে ‘সীতা’ নাম উচ্চারণ করেন। কোনো ফল, ফুল বা নারীদের প্রীতিকর কিছু দেখলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন— ‘হায়, প্রিয়তমা’, এবং আপনাকে সম্বোধন করেন। এভাবেই, হে দেবী, মহাত্মা রাম, কঠোর ব্রত পালনকারী, সর্বদা পীড়িত, সর্বদা ‘সীতা’ বলে ডাকেন, কেবল আপনার জন্যই সর্বতোভাবে চেষ্টা করছেন।” রামের প্রশংসাপূর্ণ কথা শুনে সীতার দুঃখ কিছুটা লাঘব হয়; রামের শোকে ভাগীদার হয়ে তিনি শরৎকালের চাঁদের মতো মেঘের আড়ালে মুখ উজ্জ্বল রাখেন। এবার শুরু হয় সপ্তত্রিংশ সর্গ। চাঁদের মতো মুখশোভিত সীতা হনুমানকে ধর্মময় ও উদ্দেশ্যপূর্ণ কথা বললেন— “হে বানর, তোমার কথা অমৃতের মতো, আবার বিষমিশ্রিতও; কারণ রাম অন্য কোনো বিষয়ে মন দেন না, কেবল শোকে নিমগ্ন। সুখ-সমৃদ্ধি কিংবা চরম দুর্দশা— মৃত্যু মানুষকে দড়ির মতো টেনে নিয়ে যায়। হে শ্রেষ্ঠ বানর, ভাগ্যকে জীবিত কেউ জয় করতে পারে না; দেখো, সৌমিত্র, আমি, ও রাম— আমরা সকলেই দুর্ভাগ্যে হতবুদ্ধি। রাঘব কেমন করে এই শোকসাগরের অপর পারে পৌঁছাবেন, যেন কেউ ভাঙা নৌকায় সাগর পেরোতে চায়? রাক্ষস হত্যা, রাবণ বধ, ও লঙ্কা বিনাশের পরে কবে আমার স্বামী আমাকে দেখবেন? তাঁকে তাড়না দিতে হবে— ‘শীঘ্র এসো’— কারণ এই বছরের মধ্যেই আমার আয়ু শেষ হয়ে যাবে।” এভাবেই সীতার অন্তরের আকুলতা, রামের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা ও আশার কথা, আর হনুমানের আশ্বাসে তাঁর কিছুটা শান্তি লাভ— সব মিলিয়ে এক গভীর, সংবেদনশীল মুহূর্ত গড়ে ওঠে।