রাবণ, শত্রুদের আতঙ্ক, বৈদেহী সীতাকে এইভাবে বলার পর, ভয়ংকর চেহারার সকল রাক্ষসী নারীকে ডেকে পাঠাল। তাদের কারও ছিল এক চোখ, কারও এক কান, কারও কান ঢাকা, কারও গরুর মতো কান, কারও আবার হাতির মতো কান, ঝুলে থাকা কান, আবার কারও কানই নেই। কারও হাত ছিল হাতির পায়ের মতো, কারও পা ঘোড়ার খুরের মতো, কারও গরুর মতো পা, কারও ছোট ছোট পা, কেউ এক চোখ, কেউ এক পা, কেউ চওড়া পা, কেউ আবার পা-হীন। কারও মাথা ও গলা অস্বাভাবিক বড়, কারও স্তন ও পেট অত্যন্ত বিশাল, কারও মুখ আর চোখ ছিল অতিকায়, কেউ আবার লম্বা জিভ ও নখওয়ালা। কেউ ছিল নাক-ছাড়া, কেউ সিংহ-মুখী, কেউ গরু-মুখী, কেউ শূকর-মুখী—রাবণ চেয়েছিল, যাতে জনকের কন্যা সীতা দ্রুত তার অধীনে চলে আসে। তখন রাবণ বলল, ‘‘তোমরা সবাই, রাক্ষসী নারীগণ, দ্রুত একত্রিত হও এবং বিপরীত ও অনুকূল পন্থায়, মিষ্টি কথা, উপহার, বিভাজন—সব উপায়ে—তাকে আমার অনুগত করো। প্রয়োজনে ভয় দেখিয়ে, শাস্তির হুমকি দিয়েও বৈদেহীকে বশে আনো।’’ এভাবে বারবার নির্দেশ দিয়ে, কাম ও ক্রোধে অধীর হয়ে, রাবণ গর্জন করতে করতে জানকীর দিকে এগিয়ে গেল। এসময় রাক্ষসী ধন্যমালিনী এগিয়ে এসে দশমুখী রাবণকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘‘রাজন, আমার সঙ্গে ক্রীড়া করো, এই সীতার কী দরকার তোমার?’’ সে আরও বলল, ‘‘এই বিবর্ণ, করুণাময় মানবী—তাকে নিয়ে কী করবে? দেবতারা, শ্রেষ্ঠ ভোগ—এ সবই তার জন্য নয়। তোমার বলশালী বাহু দিয়ে যে সুখ জয় করেছ, দেবতারা তা তাকে দেননি। অনিচ্ছুক নারীকে কামনা করলে শরীর কষ্ট পায়, আর ইচ্ছুক নারীকে কামনা করলে সে আনন্দই সুন্দর।’’ রাক্ষসীর এ কথায় মেঘের মতো গম্ভীর ও শক্তিশালী রাবণ হেসে সরে গেল। তার প্রস্থান যেন পৃথিবী কাঁপিয়ে দিল; দীপ্তিমান সূর্যের মতো জ্বলজ্বলে হয়ে সে নিজের প্রাসাদে প্রবেশ করল। তখন দেবকন্যা, গন্ধর্বকন্যা ও নাগকন্যারা তাকে ঘিরে সেই মনোহর প্রাসাদে ঢুকে পড়ল। এদিকে, রাবণ কামে বিভ্রান্ত হয়ে, কম্পমান মিথিলার কন্যা সীতাকে তিরস্কার করে তাকে ছেড়ে নিজের প্রাসাদে চলে গেল। এবার শুরু হল নতুন অধ্যায়। রাবণ সীতাকে এভাবে বলার পর, রাক্ষসী নারীদের নির্দেশ দিয়ে, নিজ গৃহে চলে গেল। তখন রাক্ষসরাজ প্রাসাদে প্রবেশ করলে, সেই ভয়ঙ্কর রাক্ষসী নারীরা দ্রুত সীতার দিকে এগিয়ে এল। তারা ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে বৈদেহী সীতাকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলল, ‘‘সীতা, তুমি মহাত্মা, দশমুখী রাবণ—পৌলস্ত্যদের শ্রেষ্ঠ—তার পত্নী হওয়ার মূল্য বোঝ না!’’ এরপর এক রাক্ষসী একজটা, যার চোখ ক্রোধে লাল, সীতাকে বলল—তার পেট ছিল নিজের হাতের ওপর রাখা—‘‘ছয় প্রজাপতির মধ্যে চতুর্থ প্রজাপতি হলেন পুলস্ত্য, যিনি ব্রহ্মার মন থেকে জন্মেছিলেন। পুলস্ত্যের দীপ্তিমান পুত্র, মন থেকে জন্ম নেওয়া মহর্ষি, বিশ্ব্রবা—তিনি প্রজাপতিদের সমতুল্য। তাঁরই পুত্র, শত্রুদের শত্রু, রাবণ—তুমি তার পত্নী হওয়া উচিত।’’ ‘‘হে সুন্দর অঙ্গের সীতা, আমি যা বলছি, কেন গ্রহণ করছ না?’’ এরপর আরেক রাক্ষসী, হরিজটা, বিড়ালের মতো ক্রোধে চোখ বড় করে বলল, ‘‘যে রাবণ তেত্রিশ দেবতা ও দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাজিত করেছে, তার পত্নী হওয়া উচিত তোমার। সেই বীর, শক্তিশালী, যুদ্ধে অপ্রতিরোধ্য রাবণ—তুমি কেন তার পত্নী হতে চাও না?’’ ‘‘রাজা তার প্রিয় ও মান্য স্ত্রীকে ত্যাগ করে তোমার কাছে আসবেন, হে সৌভাগ্যবতী, রাবণ তোমার জন্যই আসবেন। হাজার নারী ও নানা রত্নে অলংকৃত অন্তঃপুর ছেড়ে রাবণ তোমার কাছে আসবেন।’’ এরপর আরেক রাক্ষসী বিকটা বলল, ‘‘যার ভয়ঙ্কর শক্তিতে হাতি, গন্ধর্ব, রাক্ষস সবাই বারবার যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে, সেই রাবণ তোমার কাছে এসেছে। তুমি কেন, হে নীচতমা, সেই সর্বসমৃদ্ধিশালী রাবণের পত্নী হতে চাও না?’’ এরপর দুর্মুখী নামে এক রাক্ষসী বলল, ‘‘যার জন্য সূর্য আলো দেয় না, বাতাস ভয়ে বয়ে না, হে কোমল নেত্রের সীতা, তুমি কেন তার পাশে দাঁড়াও না? তার ভয়ে গাছ ফুল ঝরিয়ে দেয়, পর্বত জল ছেড়ে দেয়, মেঘ যা চায় তাই দেয়।’’ ‘‘হে সুন্দরী, সেই রাক্ষসরাজ, রাজাদের রাজা, তার পত্নী হতে তুমি সংকল্প করছ না কেন? হে দেবী, হে সুন্দরী, তোমার জন্য যা বলা হয়েছে, তা সত্য ও মঙ্গলকর; হাস্যোজ্জ্বল মুখে এই কথা গ্রহণ করো, না হলে বাঁচতে পারবে না।’’ এরপর শুরু হল আরেকটি অধ্যায়। তখন বিকৃত মুখের সব রাক্ষসী নারীরা সীতাকে কঠোর, অশোভন, অপ্রীতিকর কথা বলল। তারা বলল, ‘‘হে সীতা, কেন তুমি সেই অন্তঃপুরে থাকতে রাজি হচ্ছ না, যেখানে সকল প্রাণী আনন্দ পায়, বিলাসবহুল শয্যা আছে?’’ ‘‘তুমি একজন মানবীর বিয়েকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিচ্ছ; রামকে ভুলে যাও—এটা কখনোই সম্ভব নয়। রাক্ষসরাজ রাবণ, তিন জগতের ঐশ্বর্যভোগী, তার কাছে যাও, তার সঙ্গে ইচ্ছামতো জীবনযাপন করো।’’ এভাবেই রাবণ ও তার রাক্ষসী সঙ্গিনীরা নানা ভয়, প্রলোভন, কটুবাক্যে সীতাকে রাবণের অনুগত করার চেষ্টা করতে থাকে। তাঁদের মুখে ছিল হুমকি, প্রলোভন, কখনো মধুর, কখনো কঠোর কথা—কিন্তু সীতা অবিচলিত রইলেন, তাঁর মনে শুধু রামেরই স্মৃতি।