হনুমান, অতুল ঐশ্বর্যে ভাসমান, জনকের কন্যা সীতাকে নিরীক্ষণ করলেন। দুঃখে দগ্ধ, ক্লান্ত ও মলিন, তাঁর চুলে ধুলো জমে গেছে। তাঁর পুণ্য যেন ক্ষয় হয়েছে, তিনি যেন আকাশ থেকে পতিত কোনো তারা—সতীত্বে সমৃদ্ধ, অথচ স্বামীর বিচ্ছেদে নিদারুণ কষ্টে ক্লান্ত। স্বর্ণালঙ্কার নেই, কিন্তু স্বামীর স্নেহেই যেন তিনি অলংকৃত; রাক্ষসরাজার বন্দী, আত্মীয়স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন। সীতাকে ঘিরে রেখেছে রাক্ষসীদের দল, যেন হাতিনীর চারপাশে শিকারিরা। তিনি যেন মেঘের কিনারায় বাঁকা চাঁদ, শরৎকালের কুয়াশায় ঢাকা। তাঁর দেহে বিষণ্ণতার ছাপ, অথচ কেউ ছোঁয়নি—যেন সুরবিহীন বীণা। স্বামীর মঙ্গলেই নিবেদিত, অথচ রাক্ষসীদের অধীন। অশোকবনে, গভীর দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত হয়ে, সেইসব রাক্ষসী নারীদের মাঝে তিনি যেন তারাদের মাঝে রোহিণী। হনুমান তাঁকে দেখলেন—ফুলহীন লতার মতো; দেহে ধুলো, কিন্তু সৌন্দর্যে দীপ্তিমান; যেন কাদায় লেপা পদ্মের ডাঁটা—উজ্জ্বল, অথচ নিভৃত। জীর্ণ, মলিন কাপড়ে মোড়া, তবু দীপ্তিমান; চিতার মতো চোখ, আবৃত। সেই দেবী, মুখে দুঃখের ছাপ, তবু অদম্য; নিজের সতীত্বেই রক্ষিতা, কৃষ্ণনয়না সীতা, স্বামীর কীর্তিতে দীপ্ত। হনুমান দেখলেন—সীতার হরিণীর মতো চোখ, তিনি ভীত হরিণশাবকের মতো চারদিকে তাকাচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘশ্বাসে যেন পাতাঝরা গাছগুলোও দগ্ধ হচ্ছে, দুঃখের ভারে নুয়ে পড়েছেন, যেন বেদনার ঢেউ উথলে উঠেছে। তাঁর অঙ্গসৌষ্ঠব অক্ষুণ্ণ, অলংকারহীন তবু রূপে অনন্য। মিথিলার রাজকন্যাকে দেখে হনুমানের মনে অপার আনন্দ উপচে উঠল। সীতার মদিরা চোখে তাকিয়ে হনুমানের চোখে আনন্দাশ্রু ঝরল। তিনি সেখানে রামকে প্রণাম করলেন। এরপর হনুমান রাম ও লক্ষ্মণকে নমস্কার করে, সীতাকে দেখে আনন্দে আপ্লুত হয়ে, নিজেকে লুকিয়ে রাখলেন। এবার শুরু হচ্ছে সুন্দর কাণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়। মহর্ষি বাল্মীকি রচিত পবিত্র রামায়ণের এই অধ্যায়ে— হনুমান যখন ফুলে-ফলে ভরা বনের মাঝে বৈদেহীকে খুঁজতে খুঁজতে রাত প্রায় শেষ করে ফেললেন, তখন তিনি শুনতে পেলেন বেদপাঠ আর যজ্ঞের শব্দ—যা উচ্চারিত হচ্ছিল ব্রাহ্মরাক্ষসদের দ্বারা, যারা বেদের ছয় অঙ্গেও পারদর্শী। ঠিক তখনই, মধুর বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে, দশমুখী রাবণ জেগে উঠল। জেগে উঠে, মালা ও বস্ত্র ঝুলতে থাকা অবস্থায়, রাক্ষসরাজার মন পড়ে রইল সীতার দিকে। প্রবল কামনায় উন্মত্ত, ইচ্ছা চেপে রাখতে পারল না সে। সমস্ত অলংকারে সজ্জিত, অতুল্য দীপ্তিতে উদ্ভাসিত রাবণ প্রবেশ করল সেই বনে, যেখানে নানা বৃক্ষ ফুলে-ফলে ভরা। পদ্মপুকুরে ঘেরা, বিচিত্র ফুলে সজ্জিত, নেশাগ্রস্ত ও অপূর্ব পাখিতে পরিপূর্ণ সেই বনে সে প্রবেশ করল। আশেপাশে বিচিত্র পশুপাখির আসর, চোখ জুড়ানো দৃশ্য, মণিময় ও সোনালী খিলানে সাজানো পথের দিকে তাকাল সে। নানা পশুর দল, ঝরা ফল ছড়ানো, ঘন বৃক্ষে ঘেরা অশোকবনে প্রবেশ করল রাবণ। তার পেছনে শত নারী চলছিল, যেন গন্ধর্বকন্যারা মহেন্দ্রকে অনুসরণ করছে। কেউ সোনার প্রদীপ হাতে, কেউ চামর, কেউ তালপাতার পাখা নিয়ে। কেউ আবার সামনে সোনার পাত্রে জল নিয়ে, কেউ গোলাকার পাখা হাতে পেছনে। এক নারী ডান হাতে রত্নখচিত পানপাত্র ধারণ করল, ভরে উঠেছে যার ভিতর। অন্যজন পেছনে ছাতা ধরল—পূর্ণিমার চাঁদের মতো শুভ্র, সোনার হাতলে ঝলমল, যেন রাজহাঁস। রাবণের প্রিয় নারীরা, যাদের চোখে ঘুম বা মদের ছাপ নেই, তাঁরা তাঁদের বীর স্বামীকে অনুসরণ করছিলেন—যেন মেঘের পেছনে বিদ্যুৎ। তাঁদের গয়না ও বালা এলোমেলো, রঙ ফ্যাকাশে, চুল অবিন্যস্ত, মুখে ঘাম। নেশা ও তন্দ্রায় দুলতে দুলতে, মুখে ঘামের ঝিলিক, মালা শুকিয়ে এসেছে, চুলে ফুল জড়ানো। তাঁদের পরাক্রমশালী প্রভু, কামনায় বন্দী, মন সীতার প্রতি নিবদ্ধ, ধীরে ধীরে চলছিলেন, বিমর্ষ দেখাচ্ছিলেন। হনুমান বাতাসপুত্র, সেই নারীদের কঙ্কণ-নূপুরের ঝংকার শুনতে পেলেন। তিনি দেখলেন—অসাধারণ কীর্তির, অতুল শক্তির অধিকারী রাবণ দরজার দিকে এগিয়ে আসছেন। চারিদিকে বহু প্রদীপে ঘেরা, সামনে সুগন্ধি তেল মাখানো নারীরা। রাবণের চোখ কাম, অহংকার ও মদের ছোঁয়ায় বড় বড়, লালচে, পাশ-চোখে তাকানো—সে যেন নিজেই কামদেব, ধনুক পাশে পড়ে আছে। তার গায়ে শুভ্র, সরস, ফুলে-ফুলে সজ্জিত উপবস্ত্র, হাতে আর্মলেটের সাথে আটকে গেছে। পাতার আড়ালে, শত শত পাতা ও ফুলের ছায়ায় লুকিয়ে, হনুমান তাঁকে নিরীক্ষণ করতে লাগলেন। তখনই তিনি দেখলেন—রাবণের অপূর্ব রূপসী যুবতী নারীদের, যারা সৌন্দর্য ও যৌবনে সমৃদ্ধ।