জন্মকর্তা জনকের কন্যা সীতা, যিনি এক সময় ছিলেন অপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারী, আজ দুর্ভাগ্যের ঘনঘটায় ক্রমাগত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। যেন শীতের কুয়াশায় পদ্মফুলের সৌন্দর্য হারিয়ে যায়, তেমনি তাঁর সৌন্দর্য ম্লান হয়ে গেছে। নিঃসঙ্গ চক্রবাকের মতো, সীতা আজ অত্যন্ত করুণ অবস্থায় পতিত। আশোক বৃক্ষের ফুলে ভরা ঝুলন্ত শাখাগুলি তাঁর দুঃখ আরও গভীর করে তোলে; শীতের শেষে যেমন ঠাণ্ডা রশ্মির সূর্য উদিত হয়, তেমনি হাজার রশ্মির সূর্যও উদিত হয়েছে। এইসব দৃশ্য দেখে, হনুমান নিশ্চিত হলেন—এই-ই সীতা। তিনি সেই বৃক্ষের আশ্রয় নিয়ে, তার শক্তিশালী ও দ্রুতগামী শাখায় বসে, মনোযোগ দিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। এবার শুনুন সপ্তদশ অধ্যায়ের কাহিনী। তখন চাঁদ উঠেছে আকাশে, শুভ্র পদ্মের মতো উজ্জ্বল ও নির্মল, যেন নীল জলে হাঁস ভেসে আছে। সেই চাঁদ, ঠাণ্ডা রশ্মি ছড়িয়ে, যেন সঙ্গ দিতে এসেছে বায়ুপুত্র হনুমানকে। হনুমান দেখলেন, সীতা—যাঁর মুখ পূর্ণচাঁদের মতো, কিন্তু দুঃখের ভারে নত, যেন জলে ভারী বোঝা নিয়ে চলা নৌকা। বৈদেহীকে দেখতে চেয়ে, হনুমান দেখতে পেলেন আশেপাশে ভয়ংকর রাক্ষসী নারীদের। কেউ এক চোখ, কেউ এক কান; কেউ কান ঢাকা, কেউ কানবিহীন; কেউ শঙ্খাকৃতি কান, কেউ যার নাক মাথার শীর্ষে উঠে গেছে। কেউ বিশাল দেহ ও সুস্পষ্ট অঙ্গ নিয়ে, কেউ লম্বা ও পাতলা গলা; কারও চুল এলোমেলো, কারও চুল প্রচুর, কেউ চুল দিয়ে গা ঢাকা। কেউ ঝুলে থাকা কান ও কপাল, কেউ ঝুলে থাকা পেট ও স্তন, কেউ বড় ঠোঁট ও চিবুক, কেউ ফাঁকা মুখ, কেউ ঝুলে থাকা হাঁটু। কেউ খাটো, কেউ লম্বা; কেউ কুঁজো, কেউ বিকৃত; কেউ বামন, কেউ হিংস্র, কেউ মুখ বিকৃত, কেউ পিঙ্গল চোখ, কেউ বিকৃত চেহারা। তারা বিকৃত, পিঙ্গল, কালো, রাগী, ঝগড়াপ্রিয়; কালো লোহার কাঁটা ও গদা নিয়ে। কারও মুখ শূকর, হরিণ, বাঘ, মহিষ, ছাগল; কারও পা হাতি, উট, ঘোড়া; কেউ মাথা মাটিতে গুঁজে রেখেছে। কেউ এক হাত, এক পা; কেউ গাধার, ঘোড়ার, গরুর, হাতির, বানরের কান; কেউ বিশাল নাক, কাত নাক, নাকবিহীন; কেউ হাতির মতো নাক, কেউ কপাল দিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। কারও হাতির পা, বিশাল পা, গরুর পা, থাবার মতো পা; কারও মাথা ও গলা বিশাল, স্তন ও পেটও বিশাল। কারও মুখ ও চোখ বিশাল, জিহ্বা ও মুখ লম্বা; কারও ছাগল, হাতি, গরু, শূকরের মুখ। কারও ঘোড়া, উট, গাধার মুখ; ভয়ংকর রাক্ষসীরা কাঁটা ও গদা হাতে, রাগী ও ঝগড়াপ্রিয়। তারা হিংস্র, ধূসর চুলে, বিকৃত মুখে; সর্বদা মদ্যপান ও মাংসভোজন করে। বৃক্ষের চারপাশে বসে আছে তারা, আর নিচে নির্দোষ রাজকন্যা সীতা। হনুমান দেখলেন, জনকের কন্যা—সৌর্য্যহীন, দুঃখে দগ্ধ, চুলে মাটি লেগে আছে। তাঁর পুণ্য ক্ষয় হয়েছে, তিনি যেন পতিত নক্ষত্রের মতো; তিনি সদ্গুণে পরিপূর্ণ, কিন্তু স্বামীর বিচ্ছেদে কষ্টে আছেন। অলঙ্কারহীন, স্বামীর স্নেহই তাঁর অলঙ্কার; রাক্ষসরাজের বন্দী, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। সীতা সৈন্যবেষ্টিত, যেন হাতিনী গৃহবন্দী; মেঘের কিনারে চাঁদ, শরতের কুয়াশায় ঢাকা। দুঃখিত রূপে, অস্পর্শিত, যেন সুরবিহীন বীণা; স্বামীর মঙ্গলে নিবেদিত, কিন্তু রাক্ষসীদের অধীন। আশোক বনে, দুঃখের সাগরে নিমজ্জিত; রাক্ষসী নারীদের মাঝে, যেন রোহিণী তারাদের মাঝে। হনুমান দেখলেন, তিনি যেন ফুলহীন লতা; দেহে মাটি মাখা, তবু সৌন্দর্যে ভরা; যেন কাদায় মাখা পদ্মের ডাঁটি, উজ্জ্বল অথচ ম্লান। ময়লা, পুরাতন পোশাকে, তবু দীপ্তিমান; হনুমান দেখলেন, হরিণীর মতো চোখ, ঢাকা। সেই দেবী, দুঃখিত মুখে, তবু অদম্য; নিজের পুণ্যে রক্ষা পাওয়া, শ্যামল চোখের সীতা, স্বামীর কীর্তিতে দীপ্ত। হনুমান দেখলেন, হরিণীর চোখে ভীত, চারপাশে তাকাচ্ছেন— যেন তাঁর দীর্ঘশ্বাসে পাতার গাছ পুড়ে যাচ্ছে, যেন দুঃখের ঢেউ উঠেছে। সীতার অঙ্গ সুগঠিত, অলঙ্কারহীন তবু সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ; মিথিলার রাজকন্যাকে দেখে হনুমান অশেষ আনন্দে ভরে গেলেন। সীতার মাদক চোখ দেখে হনুমান আনন্দে কেঁদে ফেললেন, এবং সেখানে রামকে প্রণাম জানালেন। এরপর রাম ও লক্ষ্মণকে নমস্কার করে, হনুমান সীতাকে দেখে আনন্দে, নিজেকে গোপন করলেন। এবার শুনুন অষ্টাদশ অধ্যায়। মহিমান্বিত বাল্মীকি রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের অষ্টাদশ অধ্যায়। হনুমান যখন ফুলে ভরা বন দেখছিলেন ও বৈদেহীকে খুঁজছিলেন, তখন রাত প্রায় শেষ। তিনি শুনলেন, ব্রহ্মরাক্ষসেরা যাঁরা বেদের ছয় শাখায় পারদর্শী, তাঁদের দ্বারা বেদপাঠ ও যজ্ঞের ধ্বনি। এরপর শুভ বাদ্যযন্ত্রের শব্দে, শ্রুতিমধুর সুরে, দশমুখী রাবণ জাগ্রত হলেন। জেগে উঠে, মহাশক্তিশালী রাক্ষসরাজ, ঝুলন্ত মালা ও পোশাক পরে, বৈদেহীর কথা চিন্তা করতে লাগলেন।