হনুমান সেই স্থানটি দেখতে পেলেন, যা যেন স্বর্গের নন্দন কাননের মতো, হরিণ ও পাখির কলরবে মুখর, রাজপ্রাসাদ ও অট্টালিকায় ভরা, এবং কোকিলের ডাক প্রতিধ্বনিত হচ্ছে চারিদিকে। সেখানে ছিল সোনালী পদ্ম ও শাপলা-ভরা সরোবর, বিচিত্র আসন ও শয্যা, বহু তলা বিশিষ্ট অট্টালিকা। বছরের প্রতিটি ঋতুতেই মনোরম গাছ, ফল-ফুলে ভরা, এবং অশোক বৃক্ষের রঙে যেন সূর্যোদয়ের দীপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে। হনুমান দেখলেন, কিছু গাছের ডালপালা যেন পাখিদের অবিরাম আনাগোনায় পাতাহীন, যেন আগুনে দগ্ধ হচ্ছে। শত শত পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে, নানা রকম ফুলের মালায় সজ্জিত অশোক বৃক্ষ দুঃখ দূর করছে। ভারী ফুলে গাছের ডাল মাটিতে ছুঁই ছুঁই, কর্ণিকার ও কিম্শুক গাছে পূর্ণ বিকাশ। সেই অঞ্চলে গাছের দীপ্তিতে চারিদিক আলোকিত, পুন্নাগ, সপ্তপর্ণ, চম্পক ও উদ্দালক গাছও ছিল সেখানে। অনেক গাছ, মজবুত শিকড়ে দাঁড়িয়ে, কেউ স্বর্ণের মতো ঝলমল করছে, কেউ বা অগ্নিশিখার মতো দীপ্তিমান। হাজার হাজার অশোক বৃক্ষ কালো অঞ্জনের মতো, দেবতাদের নন্দন ও চৈত্ররথ কাননের তুল্য। সেই উদ্যান ছিল অপূর্ব, কল্পনার অতীত, দিব্য, সৌন্দর্যে ভরা—ফুলের আলোয় আরেকটি আকাশের মতো। শত শত ফুলের রত্নে সজ্জিত, যেন পঞ্চম সমুদ্র; সব ঋতুর ফুল-ফল-ভরা বৃক্ষ, মধুর সুগন্ধে পরিব্যাপ্ত। আনন্দময় সেই উদ্যান, হরিণ ও পাখির নানা স্বরে মুখর, শুভ্র ও মোহনীয় সুবাসে ভরা। কিছু দূরে হনুমান দেখলেন এক অপূর্ব মন্দির-শিখর, হাজার স্তম্ভের উপর স্থাপিত, কাইলাস পর্বতের মতো শুভ্র। প্রবেশপথ প্রবাল দিয়ে তৈরি, মঞ্চ খাঁটি সোনার, চোখ ধাঁধানো দীপ্তিতে উজ্জ্বল। নির্মল ও উচ্চ, যেন আকাশ ছুঁয়েছে। সেখানেই তিনি দেখলেন—এক নারী, মলিন বস্ত্রে ঢাকা, রাক্ষসী নারীদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। উপবাসে ক্ষীণ, বিষণ্ণ, বারবার দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন—তিনি ছিলেন, যেন শুক্লপক্ষের প্রথম চাঁদের মতো নির্মল। তাঁর সৌন্দর্য ম্লান, দীপ্তি নিস্তেজ, ধোঁয়ার আবরণে ঢাকা আগুনের শিখার মতো। একটিমাত্র মলিন কাশায় বস্ত্রে আচ্ছাদিত, অলঙ্কারহীন, যেন পুষ্পহীন পদ্মলতা। দুঃখে দগ্ধ, ক্লান্ত, তপস্যায় নিমগ্ন, যেন রোহিণী নক্ষত্র মঙ্গলের দ্বারা পীড়িত। চোখজলভরা, ক্ষীণ, উপবাসে কাতর, শোক ও ধ্যানে নিমগ্ন, চির বিষণ্ণ। আপনজনহীন, রাক্ষসী পরিবেষ্টিত, যেন হরিণী দলছুট হয়ে শ্বাপদের মাঝে পড়েছে। তাঁর কোমরে একটিমাত্র কালো চুলের বেণি, যেন শুষ্ক বনভূমির মাটিতে নদীর রেখা। সুখের যোগ্য তিনি, দুঃখে দগ্ধ, দুর্ভোগে অপরিচিতা; চওড়া চোখে, আরও ক্ষীণ ও অবিন্যস্ত হয়ে। হনুমান ভাবলেন, ‘এ নিশ্চয়ই সীতা’, কারণ তাঁর মনে পড়ল—তাঁকে তখন সেই রূপবদ রাক্ষসী অপহরণ করেছিল। যেভাবে তখন দেখা গিয়েছিল, এখানেও সেই নারী—পূর্ণিমা চাঁদের মতো মুখ, সুন্দর ভুরু, সুঠাম স্তন। তাঁর দীপ্তি চারিদিক আলোকিত করছিল, দেবীর মতো; গলায় কালো, ঠোঁটে বিম্ব ফলের মতো লাল, সরু কোমর, দৃঢ়বতী। পদ্মপত্র-নয়না সীতা, সমগ্র জগতের প্রিয়, যেমন রতি কামদেবের; যেমন পূর্ণিমা চাঁদের দীপ্তি। তিনি মাটিতে বসে, তরুণ চন্দ্রকিরণের মতো ক্ষীণ, তপস্বিনীর মতো সংযমী, গভীর নিঃশ্বাসে, ভয়ে ভীত, যেন সাপরাজের পত্নী। দুঃখের জালে আবৃত, দীপ্তিহীন, যেন ধোঁয়ায় ঢাকা অগ্নিশিখা। তিনি স্মৃতির মতো বিভ্রান্ত, লক্ষ্মীর মতো পতিত, বিশ্বাসের মতো বিনষ্ট, আশার মতো নিষ্ফল। সফলতা বাধাগ্রস্ত, বুদ্ধি কলুষিত, মিথ্যা কুৎসায় খ্যাতি লুপ্ত। রামের বিরহে কাতর, রাক্ষসীদের অত্যাচারে দুর্বল, হরিণীর মতো নয়নে, চারিদিকে তাকাচ্ছেন। তাঁর চোখজলভরা মুখ, বাঁকা ঘন পল্লব, হাস্যহীন, বারবার দীর্ঘশ্বাসে ক্লান্ত। মাটি ও ধূলিতে আবৃত, অলংকারহীন অথচ অলংকারের যোগ্য, যেন নক্ষত্ররাজ দীপ্তি মেঘে ঢাকা। সীতার এমন দশা দেখে হনুমানের মন বিষণ্ণ হয়ে পড়ল, যেন অনুশীলনহীন বিদ্যা ম্লান। দুঃখে হনুমান সীতাকে চিনতে পারলেন, যেমন অলংকারহীন ভাষা অর্থহীন হয়ে ওঠে, তেমনি। তিনি দেখলেন—চওড়া চোখ, নির্দোষ রাজকন্যা—এ নিশ্চয়ই সীতা, নানা লক্ষণে নিশ্চিত হলেন। রাম যে অলংকারের কথা বলেছিলেন, সীতার অঙ্গে সেই গয়না, সেই মালা তিনি দেখতে পেলেন। কানে সুন্দর কুণ্ডল, মুক্তা-রত্নখচিত, হাতেও রত্ন ও প্রবালে অলংকার। সেগুলো দীর্ঘ ব্যবহারে কালো, সুন্দর গড়ন; হনুমান নিশ্চিত হলেন—এগুলোই রাম বর্ণনা করেছিলেন। এভাবেই হনুমান, সেই অপূর্ব কানন ও অট্টালিকার মধ্যে, কষ্টে-দগ্ধ, অলংকারহীন, অথচ দীপ্তিময়ী, রামের প্রিয়া সীতাকে চিনে নিলেন।