রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডে, সেই রাতে রাবণের অন্দরমহলের মদ্যভবনে প্রবেশ করল মহাবীর হনুমান। সেখানে নানা রকম দৃশ্য তার চোখে পড়ল। মদ্যপানে মত্ত, রূপবতী নারীরা ঘুমিয়ে আছেন—কেউ কেউ স্বর্ণের মতো দীপ্তিময় ঢোলকে কোমল অঙ্গ দিয়ে আলতোভাবে ছুঁয়ে রয়েছেন, কারো চোখে এখনো মদের ঘোর। একজন সরু কোমরের, নিষ্পাপা নারী, মদ্যপানে ক্লান্ত, দুই বাহুর মাঝে ছোট ঢোল জড়িয়ে, পাশে রেখে ঘুমিয়ে আছেন। আরেকজন, তার ঢোলের প্রতি গভীর আসক্তি নিয়ে, সেই ঢোলকে শিশুপুত্রের মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছেন, যেন উজ্জ্বল কোনো নারী তার বাছুরকে জড়িয়ে রেখেছে। এক পদ্মনয়নী নারী, মদ্যপানে বিভ্রমিত, নিজের বাহুর বন্ধনে একটি তবলা চেপে ধরে ঘুমিয়ে আছেন। আরও একজন দীপ্তিময়ী নারী, জলের কলসি এক পাশে ছুঁড়ে ফেলে, বসন্তের মাল্যভূষিত লতার মতোই প্রস্ফুটিত, ফুলে সজ্জিত হয়ে শুয়ে আছেন। এক যুবতী, গভীর নিদ্রার বশে, নিজ বুককে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছেন—তার স্তন যেন সোনার কলসির মতো। আরেকজন পদ্মনয়নী, যার মুখ পূর্ণিমার চাঁদের মতো, মদের ঘোরে আরেকটি সুঠাম-কোমরের নারীকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছেন। অনেক রমণী, নানারকম বাদ্যযন্ত্র বুকে চেপে, ঠিক যেমন প্রেমিক তার প্রেয়সীকে জড়ায়, সেইভাবেই ঘুমিয়ে রয়েছেন। এইসব নারীদের মাঝখানে, এক অপূর্ব সুন্দরী নারীকে বিছানার এক পাশে আলাদা করে শুয়ে থাকতে দেখল হনুমান। তিনি মুক্তা ও রত্নখচিত অলংকারে সজ্জিত, তাঁর দীপ্তিতে যেন সেই রাজপ্রাসাদ আরও জ্বলজ্বল করে উঠেছে। হনুমান দেখলেন—এ তো মন্দোদরী, সোনার মতো শুভ্রবর্ণা, অন্তঃপুরের আদরের রানি। তাঁর রূপ, যৌবন আর সৌন্দর্য দেখে হনুমান মনে করলেন, 'এ নিশ্চয়ই সীতা!'—এই মনে করে তিনি আনন্দে আত্মহারা হলেন। খুশিতে তিনি হাততালি দিলেন, লেজে চুমু খেলেন, লাফালেন, গান গাইলেন, স্তম্ভে উঠে পড়লেন আবার মাটিতে পড়ে গেলেন—একেবারে বানরের স্বভাব প্রকাশ পেল তাঁর মধ্যে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই ভাবনা ঝেড়ে ফেলে, হনুমান আবার গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন—এ কি সত্যিই সীতা? তিনি ভাবলেন, রামচন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন সীতা কখনোই ঘুমোবেন না, কিছু খাবেন না, নিজেকে সাজাবেন না, পানীয় স্পর্শও করবেন না। তিনি তো কোনো পুরুষের কাছে যাবেন না, দেবতাদের মধ্যেও রামের সমতুল্য কেউ নেই। এ কথা বুঝে, হনুমান স্থির করলেন—এ নিশ্চয়ই অন্য কেউ। তিনি আরও একবার সীতার খোঁজে মদ্যভবনের ভেতর ঘুরতে লাগলেন। কেউ খেলায়, কেউ গানে, কেউ নাচে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে; কেউ আবার মদ্যপানে বশীভূত। কারও পাশে ঢোল, ঝাঁঝ, কেউবা মজার মঞ্চে, কেউ প্রধান শয্যায় শুয়ে। তিনি দেখলেন—রাবণ, সহস্র অলংকারে সজ্জিত নারীদের পরিবেষ্টিত, যারা কথোপকথন, গান ও রূপে পারদর্শিনী। তাদের মধ্যে একজন, সময় ও স্থানের উপযোগী কথা বলা, আনন্দদানে শ্রেষ্ঠ, রাবণের সঙ্গ পেয়েছেন। এছাড়াও, হনুমান দেখলেন—সহস্র সুন্দরী, কথায় দক্ষ, ঘুমিয়ে রয়েছেন। তাদের মধ্যেও একজন, সময়োপযোগী কথা বলেন, আনন্দে তৃপ্ত হয়ে ঘুমিয়ে আছেন। রাক্ষসরাজার সেই মহিমায়, চারপাশে রমণীদের বেষ্টনীতে, রাবণ যেন বনের মধ্যে মত্ত গজপতি, হাতিনীদের মাঝে। মদ্যভবনের সেই অপূর্ব সাজসজ্জা, নানা রকম ভোজ্য, পানীয় আর অলংকারে পূর্ণ, হনুমান বিস্ময়ে দেখলেন। সেখানে হরিণ, মহিষ, বুনো শুকরের মাংস নানা থালায় সাজানো; বিস্তৃত সোনার পাত্রে ময়ূর ও মোরগের মাংসও রাখা। হনুমান দেখলেন, দুধ-দই, নুনে মেশানো গণ্ডার ও শুকরের মাংস, হরিণ ও ময়ূরের কাবাব। বিভিন্ন জাতের তিতির, খাসি, আধখাওয়া খরগোশ, বহু শল্যবিদ্ধ মহিষ, ভেড়া—সবই ভোজনের জন্য প্রস্তুত। চাটবার, পানীয়, খাওয়ার মতো নানারকম মোলায়েম ও রুক্ষ খাদ্য, ঝাল-টক, রঙিন মিষ্টান্ন, সবই সেখানে। বড় বড় নূপুর, বালা ছড়িয়ে আছে, ধনরত্ন ছিটিয়ে আছে, পানপাত্র উল্টে পড়ে আছে, নানা রকম ফলও ছড়িয়ে রয়েছে। পুষ্পার্পণ হয়ে মাটি আরও দীপ্তিময়, এখানে-ওখানে সুন্দরভাবে বিছানো বিছানা ও আসন। আগুন না থাকলেও, নানা সুস্বাদু, মনোহর খাদ্যে সেই মদ্যভবন যেন আলোকিত। সতর্কভাবে প্রস্তুত নানা জাতের মাংস, পানভূমিতে আলাদা করে রাখা; দেবতুল্য স্বচ্ছ ও নানা রকম মদ্য, বিশেষভাবে প্রস্তুত পানীয়ও আছে। চিনি, মধু, ফুল, ফল থেকে তৈরি নানা মদ্য, সুগন্ধি গুঁড়ো—সব সুন্দরভাবে আলাদা করে সাজানো। মাটিতে ছড়ানো অসংখ্য মালা, সোনার পাত্র, স্ফটিকের থালা। আরও ছিল সোনার গ্লাস, ঝকঝকে রূপার কলসি, সোনার জার। হনুমান সেই শ্রেষ্ঠ পানভবন দেখলেন; সেখানে রত্নখচিত পানপাত্র, কিছু পূর্ণ, কিছু আধভর্তি, কিছু সম্পূর্ণ খালি। এভাবেই হনুমান রাবণের অন্দরমহলের সেই বিলাসবহুল, মদ্য-মদিরা ও রমণীতে ভরা পরিবেশে, সীতার খোঁজে একের পর এক দৃশ্য দেখলেন—বিস্মিত, মনোযোগী ও শ্রদ্ধাভরে।