রাবণের অন্দরমহলে তখন এক অপূর্ব দৃশ্য। কিছু নারী মুক্তার মালায় ভূষিত, কারও বা পোশাক খসে পড়েছে, কোমরবন্ধ খোলা—তারা যেন নবযুবতী, সদ্য অপহৃত। কারও কানে দুল নেই, কোথাও মালা ছিঁড়ে মাটিতে লুটিয়ে আছে, যেন বনে প্রস্ফুটিত লতা, রাজহস্তীর পদতলে দলিত। কারও গলায় চন্দ্রমালার মতো উজ্জ্বল হার, স্তনের মাঝে শুয়ে থাকা রাজহংসীর মতো দেখাচ্ছে। কারও গলায় বিড়ালের চোখের রত্ন, যেন কদম্ব পাখি, আবার কারও গলায় সোনার সুতো জোড়া চক্রবাকের মতো। কারও নিতম্ব ও পশ্চাৎদেশ হাঁস, কারণ্ডব ও চক্রবাক পাখিতে সজ্জিত, যেন বালুকাবেষ্টিত নদীতীর। কারও গায়ে সোনার পদ্ম, ঘণ্টার জালের মতো বড়ো, তারা শুয়ে আছে নদীর মতো, সৌন্দর্য আর খ্যাতি আঁকড়ে। কারও কোমল অঙ্গে, স্তনের ডগায়, অলংকারের সারি ঝলমল করছে, যেন অপূর্ব রত্ন। কারও শাড়ির আঁচল, মুখের নিঃশ্বাসে বারবার উড়ে মুখের ওপর পড়ছে। সেই ঝলমলে আঁচল, পতাকার মতো, মুখের গোড়ায় নানা সোনালি রঙে দীপ্তিমান। কারও কানের দুল, উজ্জ্বল দীপ্তিতে, নিঃশ্বাসে আস্তে আস্তে দুলছে। তাদের নিঃশ্বাসে চিনি ও মদের মিষ্টি, স্বাভাবিক সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে, যা রাবণকে তখন আনন্দিত করছে। কিছু নারী, যাদের মুখ রাবণের মতোই, প্রতিদ্বন্দ্বিনী নারীর মুখের সুবাস বারবার নিঃশ্বাসে টেনে নিচ্ছে। তারা সকলেই মন দিয়ে রাবণকে ভালোবাসে, স্বয়ং স্বাধীন নয়, সহস্ত্রীদের ইচ্ছাতেই চলে। কেউ কারও অলঙ্কারময় বাহুতে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, কারও কারও সুন্দর শাড়িও একে অপরের গায়ে। কেউ কারও বুকে, কেউ বাহুতে, কেউ কারও কোল, কেউ স্তনে মাথা রেখে শুয়ে আছে। তাদের উরু, পার্শ্ব, নিতম্ব, পিঠে একে অপরের অঙ্গ লেপ্টে আছে, মদ আর স্নেহে তারা বিভোর। একে অপরের দেহস্পর্শে আনন্দিত, সরু কোমর নারীরা বাহু জড়িয়ে একসঙ্গে ঘুমোচ্ছে। তাদের বাহুতে গাঁথা নারীমালাটি যেন সুতোয় গাঁথা ফুলের মালা, যার চারপাশে মাতাল ভ্রমর ঘুরছে। বসন্তের বাতাসে কুঁড়ি-ফোটা লতার মতো, তারা একে অপরের ফুলে জড়িয়ে গেছে। রাবণের সেই নারীসমূহের বন, সুন্দর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, ভ্রমরে ভরা, বাতাসে দুলছে অরণ্যের মতো। এত অলংকার, দেহ, শাড়ি, মালার ভিড়ে তখন একজনকে আরেকজন থেকে আলাদা করা যাচ্ছিল না। রাবণ আরাম করে শুয়ে আছেন, তাঁর চারপাশে নানা বর্ণের দীপ্তিময় নারী, যেন স্বর্ণময় প্রদীপের সারি, তারা যেন জাগ্রত নয়ন। রাজা, ঋষি, দেবতা, গান্ধর্ব, অসুরদের কন্যারা—সকলেই কামনায় পরাভূত হয়ে তাঁর হয়ে গেছে। রাবণ, যুদ্ধে লিপ্সু, তাদের সকলকে আকর্ষণে বশ করেছেন; কিছু নারী প্রেমে বিভ্রান্ত হয়ে এখানে এসেছে। তবে, এদের কাউকে বলপ্রয়োগে, বীর্য বা অন্য কোনো কামনায় নয়—শুধু জনককন্যা ছাড়া, আর কেউ নতুন নয়। এদের কেউ নীচকুলের নয়, কেউ অশোভন নয়, কেউ অসৌজন্য নয়, কেউ ধর্মহীন নয়, কেউ তাঁর কাছে অপ্রিয় নয়। তখন বানররাজ হনুমান ভাবলেন—যদি রঘুবীরের পত্নী এমন হন, তবে রাক্ষসরাজার এই স্ত্রীরাও সত্যিই উচ্চকুলীয়। আবার গোপন রূপে তিনি ভাবলেন—তবু, সীতাদেবী ধর্মে শ্রেষ্ঠ; তবু এই মহাত্মা লঙ্কেশ্বর তাঁর প্রতি মহাপাপ করেছেন। এভাবেই মহর্ষি বাল্মীকির রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের দশম সর্গ শেষ হয়। এরপর হনুমান দেখলেন, এক অপূর্ব রত্নখচিত, স্ফটিকের মতো দীপ্তিমান শয্যা, দেবতাদের উপযোগী। সেই শয্যায় ছিল বিলাসবহুল আসন, হাতির দাঁত ও সোনার কাজ, সবুজ বেলুর পাথরের আসন, ধনীদের মানানসই। এক প্রান্তে তিনি দেখলেন শুভ্র ছাতা, দেবমালায় সজ্জিত, যেন তারার মাঝে চাঁদ। চারপাশে খাঁটি সোনায় ঘেরা, সূর্যের মতো উজ্জ্বল, অশোকমালায় বিছানো প্রধান আসন। চারদিকে চাকররা চামরের পাখা দিচ্ছে, নানা সুগন্ধে সুবাসিত, উৎকৃষ্ট ধূপে ম-ম করছে। উৎকৃষ্ট চাদরে ঢাকা, কোমল পশমে সাজানো, চারপাশে দুষ্প্রাপ্য ফুলের মালায় সজ্জিত সেই শয্যা। সেই আসনে হনুমান দেখলেন এক মেঘমন্দারের মতো পুরুষ—প্রজ্জ্বলিত কুণ্ডল, রক্তিম নেত্র, বলবান বাহু, রৌপ্য বসনে বিভূষিত। তাঁর দেহে লাল চন্দনের গন্ধ, সন্ধ্যার রক্তিম মেঘে বিদ্যুতের রেখার মতো দীপ্তি। দেবতুল্য অলংকারে ভূষিত, রূপবান, ইচ্ছামতো রূপধারী, বৃক্ষ, বাগান, ঝোপে পরিবেষ্টিত, যেন শয়ান মন্দার পর্বত। হনুমান দেখলেন, পানাহারে তৃপ্ত রাক্ষসরাজা সেই উজ্জ্বল শয্যায় শুয়ে আছেন, বীরোচিত দীপ্তিতে। হনুমান যখন সেই বিশাল নিঃশ্বাসের রাবণের কাছে এগোতে লাগলেন, তাঁর মনে প্রবল উৎকণ্ঠা জাগল এবং তিনি চূড়ান্ত সতর্কতায় ধীরে ধীরে অগ্রসর হলেন।