রামায়ণের সুন্দরকাণ্ডের এই অংশে, হনুমান রাক্ষসরাজ রাবণের অন্তঃপুরে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি দেখলেন, রাবণের বহু রমণী ক্লান্তি ও মদ্যপানে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে শুয়ে আছেন। তাদের চুল খোলা, মালা খসে পড়েছে, দামী অলংকার ছড়িয়ে আছে। অনেকে কপালে টিপ লেপটে গেছে, কারও নুপূর সরে গেছে, কারও গলার হার পাশে সরে এসেছে। কারও গলায় মুক্তার মালা, কারও বা কাপড় খুলে পড়েছে, কোমরের বেল্ট খুলে গেছে—তারা যেন তরুণী, প্রবল স্রোতে ভেসে গেছে। কিছু নারীর কানে দুল নেই, কারও মালা ভেঙে গেছে—এরা যেন বনভূমিতে রাজহস্তীর পদাঘাতে চূর্ণ হয়ে যাওয়া ফুলের লতা। কারও গলায় চাঁদের কিরণের মতো উজ্জ্বল হার, যা স্তনের মাঝে ঘুমন্ত রাজহংসীর মতো দেখাচ্ছে। অন্যদের গলায় ক্যাটস-আই রত্ন, যা যেন কদম্ব পাখি, আবার কারও সোনালি সুতো যুগল চক্রবাক পাখির মতো লাগে। তাদের নিতম্ব ও পশ্চাৎদেশে অলংকারের ঝলক নদীর তীরে বালির চরের মতো দীপ্তি ছড়ায়। কিছু নারী ঘুমন্ত অবস্থায় হাতে ঝনঝন করা সোনার পদ্মের মতো বড় অলংকার পরে আছেন, তারা যেন সুন্দর নদীতীর ধরে শুয়ে আছেন। কারও কোমল অঙ্গ ও স্তনের শিখরে অলংকারের সারি যেন অপূর্ব রত্ন। কারও মুখের নিঃশ্বাসে কাপড়ের প্রান্ত বারবার উড়ে মুখের ওপর পড়ছে। সেই উজ্জ্বল কাপড়ের প্রান্ত সোনালি রঙে মুখের পাশে পতাকার মতো ঝলমল করছে। কারও ঝকমকে দুল মুখের নিঃশ্বাসে মৃদু কেঁপে উঠছে। তাদের নিঃশ্বাস থেকে চিনির মিষ্টি ও মদের সুবাস বেরিয়ে আসছে, যা সেই সময় রাবণকে আনন্দিত করেছিল। কিছু রমণী, যাদের মুখ রাবণের মুখের মতো, প্রতিদ্বন্দ্বী সঙ্গিনীদের মুখের সুবাস বারবার শ্বাস নিয়ে নিচ্ছিলেন। তারা সবাই রাবণের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত, নিজেদের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সহ-স্ত্রীদের ইচ্ছায় চলে, স্বাধীনতা নেই। কিছু নারী অলংকারে সজ্জিত বাহু ও সুন্দর কাপড়ে একে অপরের ওপর শুয়ে আছেন। কেউ কারও বুকে, কেউ বাহুতে, কেউ কারও কোলে, কেউ স্তনের ওপর শুয়ে আছে। তাদের উরু, পাশ, নিতম্ব ও পিঠে একে অপরের অঙ্গ জড়িয়ে আছে, মদ ও স্নেহে আচ্ছন্ন। একে অপরের দেহ স্পর্শে তারা তৃপ্ত, বাহু জড়িয়ে সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাদের এই বন্ধন যেন ফুলের মালা, যার গাঁথুনি মাতাল মৌমাছিতে ভরা। বসন্তের বাতাসে যেমন ফুলের লতা গাঁথা থাকে, তেমনি এদের অঙ্গগুলো একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। রাবণের এই নারীদের বন যেন সুন্দর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, মৌমাছিতে গুঞ্জরিত, বাতাসে দুলছে। অলংকার, দেহ, কাপড়, মালার মধ্যেও তখন একে অপরকে আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না। রাবণ আরাম করে শুয়ে, তার চারপাশে নানা বর্ণের, সোনালি দীপ্তিতে উজ্জ্বল রমণীরা—তারা যেন জ্বলন্ত প্রদীপের মতো, একটানা তাকিয়ে আছে। এদের মধ্যে রাজা, ঋষি, দেবতা, গন্ধর্ব ও অসুরদের কন্যারাও ছিল, সকলেই কামনায় আচ্ছন্ন হয়ে রাবণের অধীন হয়েছে। এদের কেউ রাবণের কাছে বলপ্রয়োগে, বীর্যে বা অন্য কোনোভাবে আসেনি, কেউ নতুন নয়—শুধু জনক-কন্যা সীতাকে ছাড়া। এখানে কেউ নীচকুলীন নয়, কেউ অশোভন নয়, কেউ সৌজন্যহীন নয়, কেউ অগুণবতী নয়, কেউই রাবণের কাছে অপ্রীতি ছিল না। এ দৃশ্য দেখে মহাবীর হনুমান চিন্তা করলেন—যদি রাঘবের ধর্মপরায়ণা পত্নী সীতারূপে এমন হন, তবে রাবণের এই রমণীরাও সত্যিই উচ্চকুলীন। আবার গোপন রূপে তিনি ভাবলেন—নিশ্চয়ই সীতা গুণে শ্রেষ্ঠ; তবুও এই মহাত্মা লঙ্কাপতি তার প্রতি ঘৃণ্য ও নিন্দনীয় কর্ম করেছে। এরপর দশম সর্গের শুরুতে হনুমান দেখলেন এক অপূর্ব শয্যা, রত্নখচিত, দেবতাদের উপযোগী, যেন স্বচ্ছ স্ফটিকের মতো জ্বলজ্বল করছে। সেখানে ছিল বিলাসবহুল শয্যা, দাঁতের ও সোনার কাজ করা, বীর্যল রত্নখচিত আসন, যা বড় ধনীর জন্য মানানসই। শয্যার এক পাশে ছিল শুভ্র ছাতা, দেবমালা দিয়ে সাজানো, যেন তারার মাঝে চাঁদ। শুদ্ধ সোনার বৃত্তে ঘেরা, সূর্যের মতো দীপ্তিমান, অশোকমালায় সাজানো শ্রেষ্ঠ আসন। চারপাশে চাকররা চামর দোলাচ্ছে, নানা সুগন্ধে সুসজ্জিত, উৎকৃষ্ট ধূপের সুবাসে ভরা। নরম পশমে ঢাকা, মূল্যবান ফুলের মালায় অলংকৃত সেই আসন। সেখানে হনুমান দেখলেন এক মহাপ্রভু—গম্ভীর মেঘের মতো, দীপ্তিমান কুন্ডল, লালচোখ, বলিষ্ঠ বাহু, রৌপ্যবর্ণের মনোহর পোশাকে আবৃত। তাঁর দেহে লাল চন্দনের সুবাস, গোধূলির মেঘের মতো দীপ্ত, বিদ্যুৎরেখার মতো দ্যুতিময়। তিনি দেবতুল্য অলংকারে সজ্জিত, রূপবান, ইচ্ছামতো রূপধারণে সক্ষম, বৃক্ষ, বনের ঝোপে পরিবেষ্টিত, যেন বিশ্রামরত মন্দার পর্বত। এভাবেই হনুমান, রাবণের অন্তঃপুর ও তার রাজকীয় শয্যার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলেন, এবং সেই অনুপম পরিবেশে সীতার খোঁজে তাঁর অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন।