রাবণের অশোকবনে প্রবেশ করে হনুমান এক অপূর্ব রাজপ্রাসাদ দেখতে পেলেন। সেই সভাগৃহের স্তম্ভগুলি ডানার মতো উপরে উঠে আকাশ ছুঁতে চেয়েছে, যেন স্বর্গের দিকে উড়ছে। মাটিতে ছিল এক বিশাল কার্পেট, যার ওপর পৃথিবীর নানা চিহ্ন আঁকা। সভাগৃহটি ছিল পৃথিবীর মতোই বিস্তীর্ণ, নানা বাড়ি ও পল্লীতে ভরা। নেশাগ্রস্ত পাখিদের কলরব সেখানে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল, আর বাতাসে ভেসে আসছিল দেবসুলভ সুগন্ধ। সেই প্রাসাদ ছিল দামী আসবাব ও বিছানায় সাজানো, স্বয়ং রাক্ষসরাজ রাবণ সেখানে সেবা করতেন। তার শুভ্রতা ছিল রাজহংসের মতো, আর আগরবাতির ধোঁয়ায় সুবাসিত। পাতার ও ফুলের অর্ঘ্য দিয়ে সাজানো, কখনো দীপ্তি ছড়ানো, কখনো ছোপ ছোপ রঙে মোড়া—এমন রঙের মাধুর্যে মন ও ইন্দ্রিয় আনন্দে ভরে উঠত। এই দেবতুল্য সভাগৃহ দুঃখ দূর করত, কল্যাণ বয়ে আনত, এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয়কে তাদের শ্রেষ্ঠ বস্তু দিয়ে তৃপ্ত করত। রাবণের সুরক্ষায় এই প্রাসাদ যেন মায়ের মতো সবাইকে লালন করত। হনুমান মনে মনে ভাবলেন, ‘এ কি স্বর্গ? দেবলোক? নাকি স্বয়ং ইন্দ্রের অমরাবতী? অথবা চরম সিদ্ধিলাভ?’ তিনি চিন্তামগ্ন হয়ে চারপাশ দেখলেন, সেখানে সোনার প্রদীপ জ্বলছে; যেন এক প্রতারককে আরেক প্রতারক খেলায় হারিয়েছে। প্রদীপের দীপ্তি, রাবণের জ্যোতি আর অলংকারের ঝলকে মনে হচ্ছিল, গোটা সভাগৃহ যেন জ্বলছে। এরপর হনুমান দেখলেন, বিছানায় বসে আছেন সহস্র অভিজাত নারী, নানা রঙের বসন ও মালায় সজ্জিত, বিচিত্র পোশাকে অলংকৃত। রাতের মধ্যভাগে, যখন অর্ধেক রাত পার হয়েছে, তাঁরা পান ও খেলায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন, গভীর নিদ্রায় মগ্ন। নিস্তব্ধতায় সজ্জিত সেই নারীদের দল যেন বিশাল পদ্মপুকুরে রাজহংস ও মৌমাছির মতো নিরবতায় দীপ্তিমান। হনুমান দেখলেন, তাঁদের মুখ পদ্মের মতো সুগন্ধি, দাঁত ও চোখ বন্ধ, অপরূপ রূপবতী সেই নারীরা ঘুমিয়ে আছেন। রাত ফুরোলে তাঁদের মুখ যেন ফুটন্ত পদ্ম, আবার পাপড়ি বন্ধ হলে রাতের মতো হয়ে যায়। এই পদ্মমুখগুলি নিশ্চয়ই বারবার আকৃষ্ট করে মাতাল মৌমাছিদের, যেমন তারা সদ্য ফোটা পদ্ম কামনা করে। বিচক্ষণ হনুমান চিন্তা করলেন, এঁদের গুণে যেন জলজ পদ্মফুলের তুলনা চলে। ঐ নারীদের সৌন্দর্যে সভাগৃহটি যেন শরৎকালে তারাভরা আকাশের মতো ঝলমল করছিল। তাঁদের মাঝে রাবণ যেন জ্যোতির্ময় চন্দ্র, চারপাশে তারা ঘিরে আছে। হনুমান মনে মনে ভাবলেন, ‘এরা সবাই যেন স্বর্গ থেকে পতিত তারা, পূণ্যশেষে ঘিরে আছে।’ যেমন মহান শুভ তারা-নক্ষত্রের আলো, রঙ ও দীপ্তি স্পষ্ট দেখা যায়, তেমনি ঐ নারীদের সৌন্দর্য ও জ্যোতি সেখানে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কারও চুল ও মালা এলোমেলো, অলংকার ছড়িয়ে আছে, পান ও খেলায় মত্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। কারও কপালের তিলক মুছে গেছে, কারও নূপুর সরে গেছে, কারও বা গলার মালা এক পাশে সরে পড়েছে। কেউ মুক্তার মালা পরে আছেন, কারও পোশাক খুলে পড়েছে, কোমরের কাঁচি খুলে গেছে, যেন নবযুবতীরা বয়ে যাচ্ছে। কারও কানে দুল নেই, কারও মালা ছিঁড়ে মাটিতে পড়েছে, যেন অরণ্যের মাঝে রাজহস্তীর পায়ের নিচে পিষ্ট কুসুমলতা। কারও গলায় চাঁদের কিরণের মতো ঝলমলে মালা, স্তনের মাঝে শুয়ে থাকা রাজহংসের মতো দেখাচ্ছে। কিছু নারীর গলায় ক্যাটস-আই রত্ন ছিল, যা কদম্বপক্ষীর মতো, আবার কারও সোনালি সুতো যেন জোড়া চক্রবাক পাখি। রাজহংস, কারান্ডব ও চক্রবাক পাখিতে সাজানো তাঁদের নিতম্ব ও পশ্চাৎদেশ যেন নদীর চরের মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছিল। কারও কোমরে সোনার পদ্মের মতো ঝনঝনানি ঘুমন্ত নদীর তীরে সৌন্দর্য ও খ্যাতি আঁকড়ে ধরে আছে। কিছু নারীর কোমল অঙ্গে, স্তনের শীর্ষে, ঝলমলে অলংকারের সারি যেন রত্নের দীপ্তি ছড়াচ্ছে। কারও মুখের নিঃশ্বাসে কাপড়ের আঁচল বারবার উড়ছে, সেই উজ্জ্বল আঁচলগুলো মুখের গোড়ায় সোনালি রঙে পতাকার মতো জ্বলজ্বল করছে। কারও দুল মৃদু নিঃশ্বাসে কোমলভাবে কাঁপছে, অপূর্ব দীপ্তি ছড়াচ্ছে। তাঁদের মুখের নিঃশ্বাসে চিনি ও মদের মিষ্টি সুবাস বেরিয়ে আসছিল, যা রাবণকে তখন বিমোহিত করছিল। কিছু রাবণ-পত্নীর মুখ স্বয়ং রাবণের মুখের মতো, তারা বারবার প্রতিদ্বন্দ্বিনী নারীদের মুখের সুবাস গ্রহণ করছিল। এই অভিজাত নারীরা মনেপ্রাণে রাবণের প্রতি আকৃষ্ট, স্বতন্ত্র ইচ্ছা ছিল না, কেবল সহপত্নীদের ইচ্ছাতেই চলত। কিছু নারী অলংকৃত বাহু ও পোশাক একে অপরের উপর রেখে ঘুমাচ্ছিলেন। কেউ কারও বুকে, কেউ বাহুতে, কেউ কোলে, কেউ স্তনের উপর শুয়ে ছিলেন। কারও উরু, পাশে, নিতম্বে, পিঠে মাথা রেখে, একে অপরের অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে, মদ ও স্নেহে আচ্ছন্ন হয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। শরীরের স্পর্শে আনন্দিত হয়ে, সেই সরু কোমরের নারীরা বাহু একে অপরের গলায় জড়িয়ে একসাথে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। এই নারীদের মালা যেন একে অপরের বাহুতে গাঁথা ফুলের মালা, যার চারপাশে মাতাল মৌমাছি ঘুরছে। বসন্তের বাতাসে যেমন ফুলে ভরা লতা একে অপরের সাথে মিশে যায়, তেমনি এই নারীরা পরস্পরের ফুলে গাঁথা হয়ে, একে অপরের মাঝে মিশে গেছেন। এভাবেই হনুমান রাবণের অপূর্ব সভাগৃহে দেবতুল্য নারীদের সৌন্দর্য, অলংকার, ও নিদ্রার অপার দৃশ্য দেখলেন, তাঁর মন বিস্ময়ে ও ভাবনায় পূর্ণ হয়ে উঠল।