সমুদ্রের মাঝে এক অপূর্ব পর্বত মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ছিল, তার শৃঙ্গসমূহ ঝকঝক করছে দ্যুতিময় সোনায়। সেই শৃঙ্গগুলিতে ছিল কিন্নর ও মহা নাগদের অলঙ্কার, যেন সূর্যোদয়ের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। জাম্বুনদ স্বর্ণের উজ্জ্বল চূড়া নিয়ে পর্বতটি আকাশকে এমনভাবে রাঙিয়ে তুলেছিল, যেন স্বর্ণালী অস্ত্রের এক বিশাল ক্ষেত্র। তার নির্মল স্বর্ণশিখর থেকে এমন জ্যোতি বিচ্ছুরিত হচ্ছিল, যেন শত শত সূর্য একত্রে দীপ্তিমান। হনুমান হঠাৎ দেখতে পেলেন, সেই মহৎ পর্বতটি তার সামনে সমুদ্রের মধ্যে উঠে এসেছে। তিনি মনে করলেন, ‘‘এটা নিশ্চয়ই আমার পথে এক প্রতিবন্ধক।’’ বায়ুসম দ্রুত সেই মহাবলী বানরটি বুকে আঘাত করে পর্বতটিকে ধাক্কা দিলেন, যেমন বায়ু বৃষ্টির মেঘকে উড়িয়ে দেয়। হনুমানের সেই স্পর্শে পর্বতটি তার শক্তি অনুভব করল, আনন্দে গর্জন তুলল। তখন সেই মহাপর্বত, মানবরূপ ধারণ করে নিজের শিখরে দাঁড়িয়ে, আনন্দিত চিত্তে হনুমানকে বললেন, ‘‘ওহে শ্রেষ্ঠ বানর, তুমি এক অসাধ্য কর্ম সম্পন্ন করেছ। আমার শিখরে নেমে বিশ্রাম নাও, তারপর যাত্রা করো; রঘুবংশীয়দের দ্বারা সমুদ্রের গৌরব বৃদ্ধি পেয়েছে।’’ পর্বত আবার বললেন, ‘‘সমুদ্র রামের জন্য কাজ করছে, সে তোমাকে সম্মানিত করছে; যেমন উপকার পেলে প্রতিদান করা চিরন্তন ধর্ম, সেজন্য সে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। আমি তার অনুরোধে, তোমার কল্যাণে, শ্রদ্ধাভরে তোমাকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তুমি আকাশপথে শত যোজন অতিক্রম করেছ, আমার ঢালে বিশ্রাম নাও, তারপর বাকি পথ যেও।’’ ‘‘এখানে অনেক সুগন্ধি মূলে, কন্দ, ফল রয়েছে—তুমি খেয়ে বিশ্রাম নাও। তুমি আমাদেরও আত্মীয়, তোমার মহৎ গুণত্রয় তিন জগতে প্রসিদ্ধ। দ্রুতগামী ও লম্ফকারী বানরদের মধ্যে, ওহে বায়ুপুত্র, আমি তোমাকেই শ্রেষ্ঠ মনে করি।’’ ‘‘একজন সাধারণ অতিথিরও যথার্থ সম্মান পাওয়া উচিত, ধর্মজ্ঞানীরা তা জানেন; আর তুমি তো মহাবীর, অতএব তোমার জন্য কত বেশি সম্মান। তুমি মহাত্মা বায়ুর পুত্র, তার সমান বেগবান। তোমাকে সম্মান দিলে বায়ুদেবতাও সম্মানিত হন, তাই তোমাকে আমি সাধ্যমতো সম্মান দিচ্ছি। শুনো, এর কারণও বলি।’’ ‘‘প্রাচীন কৃতযুগে, প্রিয়বানর, সব পর্বতের ডানা ছিল; তারা গরুড়ের মতো দ্রুতগামী হয়ে চারদিকে উড়ে বেড়াত। তখন দেবতা, ঋষি ও সব প্রাণী তাদের পতনের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তখন হাজারচক্ষু ইন্দ্র ক্রুদ্ধ হয়ে বজ্র দিয়ে শত সহস্র পর্বতের ডানা ছিন্ন করেন। যখন দেবরাজ ক্রুদ্ধ হয়ে আমার দিকে বজ্র নিয়ে এগিয়ে এলেন, তখন মহাত্মা বায়ু হঠাৎ আমাকে উড়িয়ে দিলেন। ফলে আমি আমার ডানা লুকিয়ে, অক্ষত শরীরে, এই লবণাক্ত সমুদ্রে এসে পড়ি—তোমার পিতার কৃপায়। তাই, বায়ুপুত্র, আমি তোমাকে সম্মান করি; আমাদের মধ্যে এক আত্মীয়তা গড়ে উঠেছে।’’ ‘‘আমার ও সমুদ্রের স্বার্থে, ওহে জ্ঞানী, তুমি আনন্দচিত্তে আমার অনুরোধ রাখো। তোমার ক্লান্তি দূর করো, আমার আতিথ্য গ্রহণ করো; তুমি সম্মানিত, আমি তোমার আগমনে পরিতৃপ্ত।’’ এভাবে পর্বত বললে, হনুমান বিনীতভাবে উত্তর দিলেন, ‘‘আমি সন্তুষ্ট; তোমার আতিথ্য যথেষ্ট হয়েছে। আমার মনে কোনো ক্ষোভ নেই। তবে কর্মের সময় এসে গেছে, দিন ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছি—এখানে আর বিলম্ব করা উচিত নয়।’’ এই বলে, শ্রেষ্ঠ বানরটি পর্বতকে স্পর্শ করে, আকাশে উঠে গেলেন, শক্তিশালী ও প্রসন্ন মুখে। তখন পর্বত ও সমুদ্র গভীর শ্রদ্ধায় তাকে দেখলেন এবং আশীর্বাদ করলেন। হনুমান তখন আরও উচ্চে উঠে, পর্বত ও বিশাল সমুদ্র ছেড়ে, পিতার পথ ধরে নির্মল আকাশে অগ্রসর হলেন। আবারও, সেই মহাশক্তিশালী বায়ুপুত্র আকাশে ভাসতে ভাসতে পেছনে পর্বতের দিকে তাকালেন। তার এই দ্বিতীয়, অতিশয় দুরূহ কর্ম দেখে দেবতা, সিদ্ধ ও ঋষিগণ সকলে প্রশংসা করলেন। তাঁর এই কর্মে দেবতারা, সোনালী নাভিযুক্ত সুনাভ পর্বত এবং হাজারচক্ষু ইন্দ্র আনন্দিত হলেন। শচীশ্বর ইন্দ্র নিজে সুনাভ পর্বতকে প্রশংসাসূচক কথা বললেন, ‘‘ওহে সুনাভ, সোনালী নাভিযুক্ত পর্বতের অধিপতি, আমি তোমায় অত্যন্ত সন্তুষ্ট। তোমায় অভয় দান করলাম—স্বেচ্ছায় বিচরণ করো।’’ ‘‘তুমি হনুমানকে বিশ্রাম দিয়েছ, তার পথ সুগম করেছ, যাতে সে শত যোজন পথ নির্ভয়ে অতিক্রম করতে পারে। এই বানরটি কেবল রাম, দশরথপুত্রের কল্যাণের জন্যই যাচ্ছে। তোমার এই আতিথ্য আমাকে অত্যন্ত সন্তুষ্ট করেছে।’’ ইন্দ্রের প্রশংসা ও বর পেয়ে সেই মহৎ পর্বত আনন্দে পূর্ণ হলেন। আর হনুমান, এক মুহূর্তেই, সমুদ্র পেরিয়ে গেলেন।