হনুমান তখন দৃঢ় সংকল্প নিয়ে, অপূর্ব বেগে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তাঁর মনে নিজেকে যেন গরুড়ের মতোই কল্পনা করলেন সেই বানরবীর। তিনি পাহাড়ের ওপর থেকে প্রবল শক্তিতে লাফ দিতেই, চারপাশের গাছগুলো সমস্ত শাখা-প্রশাখা গুটিয়ে নিয়ে যেন একসঙ্গে আকাশে লাফিয়ে উঠল। হনুমানের সঙ্গে সঙ্গে ফুলে-ফলে ভরা গাছ আর মধুপানে মত্ত পাখিরাও তাঁর সঙ্গে উড়ে চলল স্বচ্ছ আকাশে, দুর্বার গতিতে। তাঁর উরুর জোরে উপড়ে যাওয়া গাছগুলো মুহূর্তের জন্য হনুমানের পিছু নিল, ঠিক যেন দীর্ঘ যাত্রায় পা বাড়ানো আত্মীয়কে বিদায় জানাতে ছুটে আসা স্বজনেরা। সেই মহাবৃক্ষেরা, যেন রাজাকে অনুসরণ করা সৈন্যবাহিনী, হনুমানের পেছনে ছুটল। অসংখ্য ফুলে-ভরা গাছের সঙ্গে, পর্বতের মতো দেহধারী হনুমান এক অভূতপূর্ব দৃশ্য হয়ে উঠলেন। এরপর, যেসব গাছের শিকড় দৃঢ় ছিল, সেগুলো যেন ভয়ে নোনাজলে ডুবে গেল, ঠিক যেমন মহেন্দ্র পর্বত বরুণের গৃহে ডুবে যায়। হনুমান তখন নানা জাতের ফুল ও কুঁড়িতে আবৃত হয়ে মেঘের মতো আকাশে দীপ্তিমান হলেন, যেন জোনাকিতে সাজানো মেঘ। তাঁর বেগে ছিটকে পড়া গাছগুলো ফুল ফেলে দিল, সেগুলো জলে ছড়িয়ে পড়ল, যেন অতিথিরা বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে। গাছের ফুলের সেই বিচিত্র রাশি হনুমানের সৃষ্ট বাতাসে নাচতে নাচতে সাগরে পড়ল, আর সেই বিশাল সাগর যেন তারা-জ্বলানো আকাশের মতো দীপ্তিময় হয়ে উঠল। সুগন্ধি, রঙিন ফুলের বৃষ্টিতে স্নাত হনুমান তখন বিদ্যুৎ-খচিত মেঘের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। তাঁর শক্তিতে ছিটকে পড়া ফুলে ঢাকা জল যেন আকাশে জ্বলন্ত প্রদীপ কিংবা নক্ষত্রের মতো ঝলমল করছিল। হনুমানের দুই বাহু আকাশে প্রসারিত হয়ে যেন দুই পাঁচ-মুখো নাগ পর্বতশৃঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসেছে, এমন দেখাচ্ছিল। সেই মহাবীর বানর যেন বিশাল ঢেউ-তোলা সাগর পান করছেন, আবার মনে হচ্ছিল তিনি আকাশের জন্য তৃষ্ণার্ত। তাঁর চোখ, বাতাসের পথ ধরে বিদ্যুতের মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছিল, যেন পর্বতের চূড়ায় অগ্নিশিখা জ্বলছে। তাঁর বড় বড় গোলাকার কটকটে চোখ স্থির হয়ে জ্বলছিল, যেন চাঁদ ও সূর্য একসঙ্গে বিরাজ করছে। তাঁর মুখ, লালচে নাকসহ, সন্ধ্যায় সূর্যদয়ের মতো রক্তাভ হয়ে উঠেছিল। লাফানোর সময় উঁচু তোলা লেজ আকাশে যেন ইন্দ্রের পতাকা হয়ে জ্বলছিল। বায়ু-পুত্র হনুমান, গোলাকার লেজ ও ঝকঝকে সাদা দাঁত নিয়ে, যেন মণ্ডলবেষ্টিত সূর্যের মতো ঝলমল করছিলেন। তাঁর লালচে পশ্চাৎদেশ যেন লাল গেরুয়ায় রঞ্জিত বিদীর্ণ পর্বতের মতো দেখাচ্ছিল। বানরদের মধ্যে সিংহসম হনুমান যখন সাগর পেরোচ্ছেন, তাঁর দেহের দু’পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস মেঘের গর্জনের মতো শব্দ করছিল। উত্তর আকাশ থেকে পতিত উল্কার মতো সেই মহাবীর বানর ছুটে চললেন। প্রসারিত, দীপ্তিমান দেহ নিয়ে তিনি যেন উড়ন্ত অগ্নিশলাকা, কিংবা দড়ি বাঁধা বিশাল হাতির মতো দেখালেন। তাঁর দেহ ও ছায়া উপরে পড়ে, তিনি যেন বায়ু-চালিত নৌকার মতো বিশাল সাগরে ভাসছেন। যে অঞ্চলেই তিনি পৌঁছচ্ছেন, সাগর যেন তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শক্তিতে উত্তাল হয়ে উঠছে। মহাবীর হনুমান প্রবল বেগে সাগরের পর্বতের মতো উঁচু ঢেউয়ের ওপর দিয়ে এক লাফে পার হচ্ছেন। বানরের বেগ আর মেঘের বাতাস মিলে সাগরকে প্রচণ্ডভাবে কাঁপিয়ে তুলল, গর্জনে মুখরিত করল। বীর হনুমান ঢেউয়ের বিশাল জাল টেনে নিয়ে, যেন আকাশ ও পৃথিবী ছড়িয়ে দিচ্ছেন, এমন দৃশ্য দেখালেন। মেরু ও মন্দর পর্বতের মতো উঁচু ঢেউগুলো গুনতে গুনতে তিনি সাগর পেরিয়ে চললেন। সেই সময়, হনুমানের শক্তিতে জল গর্জন করছিল, মেঘে ভরা হয়ে আকাশে শরতের মেঘের মতো ঝলমল করছিল। সাগরের ওপর তখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল হাঙর, কুমির, মাছ আর কচ্ছপ—তাদের দেহ যেন আবরণহীন হয়ে উঠেছে। হনুমানকে এগিয়ে আসতে দেখে, সাগরের বাসিন্দা সাপেরা তাঁকে গরুড় ভেবে ভুল করল। তাঁর সিংহসম ছায়া, দ্রুতগতিতে চলমান, দশ যোজন চওড়া আর ত্রিশ যোজন লম্বা হয়ে অপূর্ব দেখাচ্ছিল। বায়ু-পুত্র হনুমানের ছায়া, নোনাজলে সাদা ঘন মেঘের রেখার মতো ঝলমল করছিল। বিশাল দেহধারী, উজ্জ্বল হনুমান বায়ুর পথে, কোন ভর না নিয়েই, যেন ডানা-ওয়ালা পর্বত। সেই শক্তিশালী বানর-হাতি ছুটে চললেন, আর তাঁর চলার পথে সাগর যেন অগভীর খাতের মতো হয়ে পড়ল। মেঘের ঝাঁকের মধ্যে দিয়ে নামার সময়, হনুমান পাখিদের রাজাধিরাজের মতো মেঘের স্তর ছিন্ন করে এগিয়ে গেলেন, যেমন বাতাস মেঘ সরিয়ে দেয়। সাদা, লাল, নীল, মঞ্জিষ্ঠা বর্ণের বড় বড় মেঘ তাঁর টানে ঝলমল করছিল। কখনও মেঘের ভেতরে প্রবেশ করে, আবার কখনও বেরিয়ে এসে, তিনি কখনও গোপন, কখনও প্রকাশিত—চাঁদের মতোই দেখাচ্ছিলেন। তাঁর এই অভূতপূর্ব লম্ফন দেখে দেবতা, গন্ধর্ব, চরনরা আকাশে ফুলের বৃষ্টি করলেন।