অঙ্গদ গভীর দুঃখে ক্লান্ত ও নিরুপায় হয়ে বলল, ‘‘আমার পরামর্শ কেউ মানল না, আমি ভুল করলাম, আমার শক্তিও ভাগ হয়ে গেছে। এখন আমি কিষ্কিন্ধ্যায় কীভাবে বাঁচব, যখন আমি এত দুর্বল ও নিরাশ্রয়?’’ সে আরও বলল, ‘‘সুগ্রীব নিষ্ঠুর, প্রতারক ও নির্দয়। রাজ্যের লোভে সে গোপনে আমায় শাস্তি ও বন্দিত্ব দেবে। আমার জন্য কারাবাস ও অপমান, উপবাসে মৃত্যুর চেয়েও কঠিন। তোমরা সবাই আমায় অনুমতি দাও, তোমরা ফিরে যাও ঘরে।’’ অঙ্গদ প্রতিজ্ঞা করে বলল, ‘‘আমি কখনও নগরে ফিরে যাব না। আমি এখানেই উপবাসে মরণ বরণ করব। মৃত্যুই আমার জন্য শ্রেয়।’’ সে সবাইকে বলল, ‘‘রাজা ও তাঁর মঙ্গল জানতে চেয়ো; দুই বীর রাঘবকেও আমার পক্ষ থেকে প্রণাম জানাবে। আমার ছোট ভাই, বানররাজ সুগ্রীবকে আমার প্রণাম জানাবে; আমার মা ও রুমাকেও আমার শুভেচ্ছা ও মঙ্গল জানাবে। আমার মা তারা-কে সান্ত্বনা দেবে; তিনি স্বভাবতই সন্তানপ্রেমী, করুণাময়ী ও তপস্যায় নিয়োজিত। তিনি যখন শুনবেন আমি হারিয়ে গেছি, তখন নিশ্চয়ই প্রাণ ত্যাগ করবেন।’’ এভাবে বলে অঙ্গদ প্রবীণদের প্রণাম করে কাঁদতে কাঁদতে কুশঘাসের উপর শুয়ে পড়ল। তাঁর এই অবস্থায় সেরা বানররাও অশ্রুপাত করল। কারও চোখ থেকে গরম জল ঝরল, কেউ সুগ্রীবকে দোষ দিল, কেউ বা বলির প্রশংসা করল। সবাই অঙ্গদকে ঘিরে উপবাসে মৃত্যুর সংকল্প করল। বলির পুত্রের কথা শুনে সবাই পূর্বদিকে মুখ করে নদীতীরে কুশঘাসের ওপর বসে জল স্পর্শ করল। মৃত্যুর ইচ্ছায় সেরা বানররা বলল, ‘‘এটাই সঠিক,’’ এবং স্মরণ করতে লাগল রামের বনবাস, দশরথের মৃত্যু, জনস্থানে হত্যাকাণ্ড, জটায়ুর মৃত্যু, সীতার অপহরণ, বলির মৃত্যু এবং রামের রোষে বানরদের মধ্যে যে ভয় জন্মেছিল। পাহাড়ের মতো বিশাল বানররা যখন মাটিতে শুয়ে পড়ল, তখন তাদের উচ্চস্বরে আর্তনাদে পাহাড়টি গর্জে উঠল, যেন মেঘে বজ্রধ্বনি হচ্ছে। এই সময়, পাহাড়ের ঢালে, যেখানে বানররা ও শকুনরাজ উপস্থিত ছিল, সেখানে এক শক্তিশালী ও বিখ্যাত শকুন এল। সে ছিল জটায়ুর ভাই, নাম সম্পাতি, দীর্ঘজীবী ও বীর। বিন্ধ্য পর্বতের এক গুহা থেকে বেরিয়ে এসে সে বানরদের দেখে আনন্দে বলল, ‘‘নিশ্চয়ই ভাগ্যের নিয়মে মানুষ নিজের পথ চলে; বহুদিন পর আমার জন্য এই খাদ্য নিজেই এসে গেছে।’’ সে বলল, ‘‘আমি একে একে এই মৃত বানরদের খেয়ে নেব।’’ পাখিটির এই কথা শুনে, খাদ্যের লোভে, অঙ্গদ অত্যন্ত কষ্টে হনুমানের কাছে বলল, ‘‘দেখো, সীতার ভাগ্যে, যেন যমরাজ নিজেই আমাদের ধ্বংস করতে এখানে চলে এসেছেন। রামের কাজ সম্পন্ন হয়নি, রাজার আদেশও পালন হয়নি; অথচ এই অপ্রত্যাশিত বিপদ আমাদের অজান্তেই এসে পড়েছে।’’ অঙ্গদ বলল, ‘‘রামের প্রিয়জনী সীতার জন্য জটায়ু প্রাণ দিয়েছিল; তার মুখে যা শোনা গিয়েছিল, তা সবই আমরা জানি। এভাবেই, পশুরূপে জন্ম নেওয়া সত্ত্বেও, সবাই রামের প্রিয় কাজের জন্য জীবন দেয়, যেমন আমরাও দিয়েছি। স্নেহ ও করুণাবশত মানুষ একে অপরকে সাহায্য করে; তাই সেবার জন্য কেউ কেউ স্বেচ্ছায় প্রাণ দেয়। ধর্মজ্ঞ জটায়ু রামের প্রিয় কাজ করেছিল; আমরাও রাঘবের জন্য ক্লান্ত হয়ে প্রাণ ত্যাগ করেছি।’’ ‘‘আমরা এই অরণ্যে এসে মৈথিলীকে দেখতে পাইনি; কিন্তু শকুনরাজ জটায়ু সৌভাগ্যবান, কারণ সে রাবণের হাতে যুদ্ধে নিহত হয়েছিল, সুগ্রীবের ভয় থেকে মুক্ত হয়ে শ্রেষ্ঠ গতি লাভ করেছে। জটায়ু ও রাজা দশরথের মৃত্যু, সীতার অপহরণ—এসব ঘটনার পরে আমরা সন্দেহে পড়েছি। রাম-লক্ষ্মণ ও সীতার বনবাস, রাঘবের হাতে বলির মৃত্যু, রামের রোষে রাক্ষসদের বিনাশ, এবং কৈকেয়ীর বরদানে এই বিপর্যয়—এসব স্মরণ করতে করতে বানররা মাটিতে পড়ে থাকে।’’ এভাবে কষ্টকর কথা বলার পরে, বানরদের এই অবস্থায় দেখে, শকুনরাজ সম্পাতি গভীর অস্থিরতায় করুণ স্বরে বলল, ‘‘কারা আমার ভাই জটায়ুর মৃত্যুর কথা বলছে? সে তো আমার প্রাণের থেকেও প্রিয়। কার কথা শুনে আমার হৃদয় কেঁপে উঠল? জনস্থানে রাক্ষস ও শকুনের মধ্যে কীভাবে যুদ্ধ হয়েছিল? এতদিন পরে আজই প্রথম ভাইয়ের নাম শুনলাম।’’ ‘‘তোমরা যারা বীর, সদ্গুণী ও কনিষ্ঠ, আমায় এই পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে যাও। অনেক বছর পর এই সংবাদে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি; ওহে শ্রেষ্ঠ বানরগণ, আমি আমার ভাইয়ের মৃত্যুর কথা শুনতে চাই। জনস্থানে বসবাসকারী আমার ভাই জটায়ু ও তার বন্ধু দশরথ—তাঁর কী খবর? যাঁর জন্য রাম, প্রবীণদের প্রিয় জ্যেষ্ঠপুত্র, এত প্রিয়—সূর্যের তাপে আমার ডানা পুড়ে গেছে, আমি উড়তে পারি না; হে শত্রুনাশী বানরগণ, তোমরা আমায় এই পাহাড় থেকে নামিয়ে দাও।