রামচন্দ্র, সীতার বিচ্ছেদে ও তাঁর কোমল স্বভাবের কথা মনে করে গভীর বেদনায় ডুবে যান। তিনি ভাবেন, ‘‘হয়তো আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, শরতের অবিরাম হাওয়ার মতো আকাঙ্ক্ষায় পীড়িত হচ্ছে সেই দীপ্তিময়ী নারী, দূরে কোথাও।’’ এইভাবে, পুরুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ, রাজকুমার রাম, দেবরাজ ইন্দ্রের মতো জলকামনায় কাতর কোনো পাখি বা হরিণের মতো শোক প্রকাশ করতে থাকেন। তখন, সুন্দর পাহাড়ের ঢালে ফলের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে, সৌভাগ্যশালী লক্ষ্মণ দেখলেন—তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা রাম মুখ ফিরিয়ে আছেন, গভীর বিষণ্নতায় ডুবে। বনের মধ্যে একাকী, অসহনীয় দুঃখে অভিভূত মহাত্মা ভাইকে দেখে, সৌমিত্রি লক্ষ্মণ গভীর উদ্বেগে দ্রুত তাঁর কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘‘হে মহারাজ, আপনি কেন কামনায় নিজেকে সঁপে দিচ্ছেন? কেন নিজ শক্তির পরাজয় মেনে নিচ্ছেন? যখন লজ্জা আপনার মনকে সংযত রাখে, তখন শৃঙ্খলা কেন আপনাকে ফিরিয়ে আনে না?’’ লক্ষ্মণ আরও বলেন, ‘‘আপনি কর্মে, মানসিক স্থৈর্যে, সঠিক সময়ে, মিত্রশক্তিতে, অটল সাহসে এবং নিজের কর্তব্যে মনোনিবেশ করুন, প্রিয় ভ্রাতা। হে নরেশ, জনককন্যা সীতা আপনার সুরক্ষায় থাকায় সহজে অন্য কারও দ্বারা অপহৃত হতে পারে না; যেমন, কোনো সাহসী পুরুষ জ্বলন্ত অগ্নির কাছে এসে অক্ষত থাকতে পারে না।’’ লক্ষ্মণের এই দৃঢ়, অজেয় কথায় রাম উত্তরে বললেন, তাঁর বাক্য ছিল সদ্গুণে ভরা, কল্যাণময়, নীতিসম্মত ও ধর্মনিষ্ঠ—‘‘নিশ্চয়ই, যা করণীয় তা ভাবা উচিত এবং সঠিক পথে চলা উচিত; কিন্তু, রাজকুমার, মহৎ ও দুর্জয় বীর্যের ফল নিয়ে কখনো সন্দেহ করা উচিত নয়।’’ এরপর, পদ্মপাতার মতো চোখের মৈথিলীকে স্মরণ করে, রাম তৃষ্ণার্ত ঠোঁট নিয়ে লক্ষ্মণকে বললেন, ‘‘ইন্দ্র পৃথিবীকে জল দিয়ে তাঁর কাজ শেষ করে যেমন স্থির থাকেন, তেমনি মেঘেরা গুরুগম্ভীর বজ্রধ্বনিতে, পর্বত ও বৃক্ষের ন্যায়, তাদের জল বর্ষণ শেষ করে এখন বিশ্রামে আছে।’’ ‘‘শেফালিকা ফুলের মতো নীল পদ্মের মতো গাঢ় মেঘেরা দশ দিককে অন্ধকার করে তুলেছে; তাদের শক্তি ক্ষয় হয়ে গেছে, যেন গজরাজেরা মাতাল অবস্থা থেকে মুক্তি পেয়েছে। কুটজ ও অর্জুন ফুলের সুবাসে ভরা, জলপূর্ণ প্রবল বর্ষা শেষ হয়েছে, প্রিয় লক্ষ্মণ।’’ ‘‘এখন মেঘ, হাতি, ময়ূর ও ঝর্ণার গর্জন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেছে। ভারী বৃষ্টিতে ধুয়ে যাওয়া পাহাড়ের ঢাল চাঁদের কিরণে যেন সদ্য অভিষিক্ত হয়ে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।’’ ‘‘শরৎ ঋতু এসেছে, তার সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়েছে সপ্তচ্ছদ বৃক্ষের ডালে, নক্ষত্র, সূর্য ও চন্দ্রের দীপ্তিতে, আর মহারাজগণের খেলায়। ভাগ্য ও সৌন্দর্য শরতের গুণে সজ্জিত হয়ে বিচিত্র রূপে প্রকাশ পাচ্ছে—বিশেষত, সূর্যকিরণে জাগ্রত পদ্মপুকুরে তা অপরূপ।’’ ‘‘প্রশস্ত ডানার সুন্দর হংস, যমদেবের প্রিয়, পদ্মরেণুতে রঞ্জিত হয়ে, চক্রবাকদের সঙ্গে মহানদীর বালুচরে খেলছে।’’ ‘‘বিভিন্ন রূপে বিভা প্রকাশ পাচ্ছে—মাতাল গজদলের মধ্যে, গর্বিত গাভীর পাল ও স্বচ্ছ নদীর জলে।’’ ‘‘আকাশ এখন মেঘমুক্ত; বনভূমিতে ময়ূরের রঙিন পালক ঝরে পড়েছে; ময়ূরীরা, প্রিয় সুর হারিয়ে, পুরোনো সৌন্দর্য বিসর্জন দিয়ে, ধ্যানমগ্ন হয়ে উৎসব ত্যাগ করেছে।’’ ‘‘বনের বাগানগুলো সোনালি-হলুদ, চিত্তাকর্ষক বৃক্ষরাজিতে দীপ্তিমান, ডালে ডালে ফুলের ভারে নত হয়ে স্নিগ্ধ সুবাস ছড়াচ্ছে। আজ, শ্রেষ্ঠ হাতিরা, প্রিয় সঙ্গিনীদের পরিবেষ্টিত, পদ্মপুকুরে মগ্ন, ফুলের সৌরভে মাতাল, আনন্দে ধীর পদক্ষেপে বনে ঘুরছে।’’ ‘‘আকাশ স্বচ্ছ, যেন অস্ত্র দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে; নদীগুলোয় জল অল্প; শীতল, নীলপদ্মের সুবাসময় বাতাস বইছে; আর দিকগুলো, অন্ধকারমুক্ত হয়ে, উজ্জ্বল। সূর্যের উত্তাপে শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে ধুলোর স্তর স্থিত হয়ে গেছে—এখন রাজাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের উপযুক্ত সময়।’’ ‘‘শরৎকালের গুণে বলীয়ান ষাঁড়েরা, ধুলোয় আবৃত দেহে, আনন্দে গাভীদের মাঝে গম্ভীর গর্জনে যুদ্ধের জন্য উদ্গ্রীব। গর্জনরত গজপতিদের পিছনে, প্রেম ও আকাঙ্ক্ষায় পূর্ণ এক স্ত্রীহাতী, সঙ্গিনীদের নিয়ে ধীরে ধীরে বনভূমিতে তাকে ঘিরে চলে।’’ ‘‘ময়ূরেরা তাদের নিজস্ব রঙিন পালক নদীতীরে ফেলে, বিষণ্ন ও নিরুৎসাহ হয়ে, যেন সারি সারি বকের ভর্ৎসনায় কাতর, চলে যাচ্ছে। গজরাজেরা, ভাঙা দাঁত ও প্রবল গর্জনে, হাঁস ও চক্রবাককে ভীত করে, পদ্মফুলে সজ্জিত হ্রদের জল বারবার নেড়ে গভীরভাবে পান করছে।’’ ‘‘নদীগুলো, এখন কর্দমমুক্ত, বালুময়, স্বচ্ছ ও গরুর পালভরা, বকের ও জলপাখির ডাক মুখরিত; সেখানে আনন্দে হংসেরা অবতরণ করছে। এখন, নদী, ঝর্ণা, বাতাস, ময়ূর ও বানরের উৎসবের শব্দ নিশ্চয়ই স্তব্ধ।’’ ‘‘বহুবর্ণের সাপেরা, দীর্ঘদিন গর্তে লুকিয়ে থেকে, দেহ শীর্ণ, ভীষণ বিষে পূর্ণ হয়ে, নতুন মেঘ না থাকায় বাইরে বেরিয়ে এসেছে। আহা, সন্ধ্যা, চাঁদের কিরণের কাঁপা ছোঁয়ায় ও তারার আনন্দময় উদ্ভাসে সজ্জিত হয়ে, আকাশ থেকে বিদায় নিচ্ছে যেন প্রেয়সী নারী।’’ ‘‘রাত, যার মৃদু মুখ উন্মোচিত হয়েছে উদিত চাঁদে, সুন্দর চোখ তারার মণ্ডলীতে জাগ্রত, চন্দ্রালোকে আচ্ছাদিত, যেন শুভ্রবাস পরিহিতা নারী।’’ ‘‘পাকা ধানের শস্য খেয়ে, আনন্দে সারি সারি বক হাওয়ায় দুলে দ্রুত আকাশে উড়ে যাচ্ছে, যেন গাঁথা মালা। মহাসরোবরে, পদ্মফুলে সজ্জিত, একমাত্র নিদ্রিত রাজহংসে, জলের দীপ্তি যেন মেঘমুক্ত পূর্ণিমার চাঁদ ও তারাভরা রাত্রির মতো।’’ ‘‘চকাচকি ও পদ্মফুলে সজ্জিত, রাজহংসে ভরা পাড়ে ঘেরা দীপ্তিমান হ্রদগুলি অলঙ্কার পরিহিতা অভিজাত নারীর মতো বিভূষিত। ভোরে, বাতাসে বংশী ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের মৃদু ধ্বনি, ষাঁড়ের ডাকা ও বলদের গর্জন মিশে, আকাশকে সুরে ভরিয়ে তুলছে।’’ ‘‘নদীর তীরে, সদ্য ধোয়া কাপড়ের মতো উজ্জ্বল নতুন কাশফুলে দীপ্তি ছড়াচ্ছে; কোমল বাতাস নদীর ফুল ছড়িয়ে সৌন্দর্য বাড়াচ্ছে। বনে, মৌমাছিরা মধু পান করে সঙ্গিনীদের নিয়ে আনন্দে, পদ্মের রেণুতে গা রাঙিয়ে, বাতাসের সঙ্গে উল্লাসে ঘুরছে।’’ এইভাবে, শরতের সৌন্দর্য ও জীবনের বিচিত্র রূপের মাঝে রাম ও লক্ষ্মণ তাঁদের সংকল্প ও স্মৃতিকে দৃঢ় রেখে অরণ্যে অবস্থান করলেন।